অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে কেঁদে ওঠে খন্দকিয়া
jugantor
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে কেঁদে ওঠে খন্দকিয়া

  হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি  

৩১ জুলাই ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিদায়

শুক্রবার রাত ১১টা। অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের আমানবাজার থেকে দেড় কিলোমিটার পূর্বে খন্দকিয়া গ্রামে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ যেন আর্তনাদের মতো কানে বাজে। সড়কের দুপাশে পাথরের মতো নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত মানুষ। শোকে স্তব্ধ সবাই। অনেকের চোখের কোণে পানি টলমল করছে। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় নিহত ১১ তরুণের লাশ আনা হয় এসব অ্যাম্বুলেন্সে। নিহতদের বাড়ির উঠানে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেই স্বজনদের আর্তচিৎকার, আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিটি বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। এসব বাড়িতে আগে থেকেই ভিড় করেন পাড়া-প্রতিবেশীরা। নিহতদের শেষবারের মতো দেখতে আসা লোকজনের চোখেও পানি। একসঙ্গে এত মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তারা। নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও তাদের নেই।

স্থানীয়রা জানান, খন্দকিয়া গ্রামজুড়ে বিষাদের ছায়া। বিগত ৫০ বছরেও একসঙ্গে এত লাশ দেখেননি কেউ। রাতেই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে জানাজা শেষে পারিবারিক ও স্থানীয় কবরস্থানে পাঁচ তরুণের লাশ দাফন সম্পন্ন হয়। বাকি পাঁচজনের জানাজা ও একজনের শেষকৃত্য হয় শনিবার সকালে। রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন জানান, নিহতদের স্বজনদের আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই শুক্রবার রাতে নগরীর রেলওয়ে থানায় লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে লাশগুলো হাটহাজারীর খন্দকিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিহতরা হলেন-খন্দকিয়া গ্রামের আজিম সাবরেজিস্ট্রার বাড়ির মাইক্রোবাসচালক হাজী মো. ইউসুফের ছেলে গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬), ২ নম্বর ওয়ার্ডের আবু মুসা খানের বাড়ির মোতাহের হোসেনের ছেলে মোস্তফা মাসুদ রাকিব (১৯), ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মো. ইলিয়াছ ভুট্টোর ছেলে মোহাম্মদ হাসান (১৭), একই ওয়ার্ডের খোন্দকার পাড়ার আবদুল হামিদের ছেলে জিয়াউল হক সজীব (২২), মোজাফফর আহমেদের ছেলে মোসহাব আহমেদ হিশাম (১৬), ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজ মেম্বার বাড়ির জানে আলমের ছেলে ওয়াহিদুল আলম জিসান (২৩), একই এলাকার আবদুল ওয়াদুদ মাস্টার বাড়ির আবদুল মাবুদের ছেলে ইকবাল হোসেন মারুফ (১৭) ও মজিদ আব্বাস চৌধুরী বাড়ির বাদশা চৌধুরীর ছেলে শিক্ষক রিদুয়ান চৌধুরী (২২), আব্দুল আজিজ বাড়ির মৃত পারভেজের ছেলে তাসমির হাসান (১৭), মনসুর আলমের ছেলে মো. মাহিম (১৭) ও একই এলাকার রনি শীলের ছেলে শান্ত শীল (১৮)।শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাটহাজারীর খন্দকিয়া ছমদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে পাঁচজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানুষের ঢল নামে। জানাজার আগে খন্দকিয়া গ্রামের যুগীর হাট এলাকায় ঢুকতেই দেখা যায়, রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ, কেউ একা দাঁড়িয়ে, কেউবা জটলা করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। সবাই বিষাদগ্রস্ত। এর মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে জানাজার জন্য খাটিয়ায় তোলা হচ্ছিল মাইক্রোবাসের চালক নিহত গোলাম মোস্তফার লাশ। এ সময় দূরে এক স্বজনের কোলে বসে কাঁদছিল মোস্তফার ৩ বছরের ছোট্ট মেয়ে রুজি আক্তার। ডাকছিল ‘বাবা বাবা’ বলে। জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ প্রশাসক এমএ সালাম, মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসএম রাশেদুল আলম, হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা মো. শাহিদুল আলম, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইউনুস গণি চৌধুরী, হাটহাজারী মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রুহুল আমীন, স্থানীয় চিকনদণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাসান জামান বাচ্চু প্রমুখ।

শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে মাইক্রোবাসে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমিনবাজার এলাকার আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টারের চার শিক্ষক ও ১৪ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী মীরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যান। ফেরার পথে মীরসরাই উপজেলার বারতাকিয়া রেলস্টেশনে ট্রেনের ধাক্কায় তাদের মাইক্রোবাস দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১১ জন। আহত হন ৭ জন। তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে কেঁদে ওঠে খন্দকিয়া

 হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 
৩১ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বিদায়
আহাজারি থামছেই না চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত মারুফের মা ও দাদির। শনিবার হাটহাজারীর খন্দকিয়া গ্রামে -যুগান্তর

শুক্রবার রাত ১১টা। অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের আমানবাজার থেকে দেড় কিলোমিটার পূর্বে খন্দকিয়া গ্রামে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ যেন আর্তনাদের মতো কানে বাজে। সড়কের দুপাশে পাথরের মতো নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত মানুষ। শোকে স্তব্ধ সবাই। অনেকের চোখের কোণে পানি টলমল করছে। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় নিহত ১১ তরুণের লাশ আনা হয় এসব অ্যাম্বুলেন্সে। নিহতদের বাড়ির উঠানে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেই স্বজনদের আর্তচিৎকার, আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিটি বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। এসব বাড়িতে আগে থেকেই ভিড় করেন পাড়া-প্রতিবেশীরা। নিহতদের শেষবারের মতো দেখতে আসা লোকজনের চোখেও পানি। একসঙ্গে এত মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তারা। নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও তাদের নেই।

স্থানীয়রা জানান, খন্দকিয়া গ্রামজুড়ে বিষাদের ছায়া। বিগত ৫০ বছরেও একসঙ্গে এত লাশ দেখেননি কেউ। রাতেই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে জানাজা শেষে পারিবারিক ও স্থানীয় কবরস্থানে পাঁচ তরুণের লাশ দাফন সম্পন্ন হয়। বাকি পাঁচজনের জানাজা ও একজনের শেষকৃত্য হয় শনিবার সকালে। রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন জানান, নিহতদের স্বজনদের আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই শুক্রবার রাতে নগরীর রেলওয়ে থানায় লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে লাশগুলো হাটহাজারীর খন্দকিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিহতরা হলেন-খন্দকিয়া গ্রামের আজিম সাবরেজিস্ট্রার বাড়ির মাইক্রোবাসচালক হাজী মো. ইউসুফের ছেলে গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬), ২ নম্বর ওয়ার্ডের আবু মুসা খানের বাড়ির মোতাহের হোসেনের ছেলে মোস্তফা মাসুদ রাকিব (১৯), ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মো. ইলিয়াছ ভুট্টোর ছেলে মোহাম্মদ হাসান (১৭), একই ওয়ার্ডের খোন্দকার পাড়ার আবদুল হামিদের ছেলে জিয়াউল হক সজীব (২২), মোজাফফর আহমেদের ছেলে মোসহাব আহমেদ হিশাম (১৬), ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজ মেম্বার বাড়ির জানে আলমের ছেলে ওয়াহিদুল আলম জিসান (২৩), একই এলাকার আবদুল ওয়াদুদ মাস্টার বাড়ির আবদুল মাবুদের ছেলে ইকবাল হোসেন মারুফ (১৭) ও মজিদ আব্বাস চৌধুরী বাড়ির বাদশা চৌধুরীর ছেলে শিক্ষক রিদুয়ান চৌধুরী (২২), আব্দুল আজিজ বাড়ির মৃত পারভেজের ছেলে তাসমির হাসান (১৭), মনসুর আলমের ছেলে মো. মাহিম (১৭) ও একই এলাকার রনি শীলের ছেলে শান্ত শীল (১৮)।শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাটহাজারীর খন্দকিয়া ছমদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে পাঁচজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানুষের ঢল নামে। জানাজার আগে খন্দকিয়া গ্রামের যুগীর হাট এলাকায় ঢুকতেই দেখা যায়, রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ, কেউ একা দাঁড়িয়ে, কেউবা জটলা করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। সবাই বিষাদগ্রস্ত। এর মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে জানাজার জন্য খাটিয়ায় তোলা হচ্ছিল মাইক্রোবাসের চালক নিহত গোলাম মোস্তফার লাশ। এ সময় দূরে এক স্বজনের কোলে বসে কাঁদছিল মোস্তফার ৩ বছরের ছোট্ট মেয়ে রুজি আক্তার। ডাকছিল ‘বাবা বাবা’ বলে। জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ প্রশাসক এমএ সালাম, মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসএম রাশেদুল আলম, হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা মো. শাহিদুল আলম, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইউনুস গণি চৌধুরী, হাটহাজারী মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রুহুল আমীন, স্থানীয় চিকনদণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাসান জামান বাচ্চু প্রমুখ।

শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে মাইক্রোবাসে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমিনবাজার এলাকার আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টারের চার শিক্ষক ও ১৪ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী মীরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যান। ফেরার পথে মীরসরাই উপজেলার বারতাকিয়া রেলস্টেশনে ট্রেনের ধাক্কায় তাদের মাইক্রোবাস দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১১ জন। আহত হন ৭ জন। তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন