সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

প্রতি বছরের বাজেটই নির্বাচনমুখী

ব্যাংকিং কমিশন গঠন হচ্ছে না * এটা গরিব মারার বাজেট না * ভ্যাট থাকছে না অনলাইনে কেনাকাটায় * সঞ্চয়পত্রের সুদহার পর্যালোচনা করা হবে * প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই ব্যাংকের কর্পোরেট কর কমানো হয়েছে * নির্বাচন হলেও বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হবে না

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি বছরের বাজেটই নির্বাচনমুখী

আমার প্রত্যেক বাজেটই নির্বাচনীয় বাজেট। একটি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আমি। আমার বাজেট মানুষ পছন্দ করবে একদিন বা এক বছরের জন্য নয়। প্রত্যেক বছরই তা করবে। তবে এটি গরিব মারার বাজেট নয়। তেলে মাথায় তেল দেয়ার বাজেট নয়। শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত সংস্কারে কমিশন করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হচ্ছে না। সঞ্চয়পত্র সুদ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী মাসে বৈঠক হবে। জুলাইয়ের বৈঠকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার পর্যালোচনা করা হবে।

ব্যাংকের কর্পোরেট করহার কমানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আলাপ-আলোচনা করেই করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে অনলাইনে কেনাটাকায় ভ্যাট থাকছে না।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ডিসেম্বরে নির্বাচন হলেও বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হবে না। আর বিশাল রাজস্ব আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় কৌশল অনেক উন্নত। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনই প্রমাণ করে রাজস্ব আদায় সম্ভব।

শুক্রবার বেলা ৩টায় রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট পেশ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন তিনি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ব্যাংক মালিকদের ওপর কর কমিয়ে আপনি কি তেলের মাথায় আরও তেল ঢালছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কর্পোরেট করের উৎসে করহার ৪০ থেকে সাড়ে ৩৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। এর কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে কর্পোরেট রেট মোটামুটি তুলনীয়।

কিন্তু এ হার ৪০ বা তার বেশি খুব কম দেশে আছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। তিনি আরও বলেন, সিগারেট ও মোবাইল কোম্পানিসহ কিছু পণ্যে সাড়ে ৩৭ শতাংশের বেশি কর্পোরেট কর। সেটি ঠিকই থাকবে।

তিনি বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেছি। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা করেই তা করা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটা করা হয়নি। এটা করা হয়েছে ব্যাংকের ঋণে সুদের হার কমানোসহ এ খাতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বার্থে। এখানে তেলে মাথায় তেল ঢালার মতো কিছু নেই। সবাই দেশের নাগরিক।

অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন কর না দেয়ার কথা বলেছিলাম। সে কথা রাখতে সক্ষম হয়েছি। এ সময় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গণমাধ্যমে ভুয়া বাজেট বলে শিরোনাম প্রকাশ করা হয়েছে। তারা হয়তো বাংলা জানে না। ভুয়া অর্থ কী। এটি নির্বোধের কাগজ হতে পারে।

ব্যাংক কমিশন গঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক সংস্কারে কোনো কমিশন হচ্ছে না। পরবর্তী সরকারের কাছে এসংক্রান্ত কাগজপত্র দেয়া হবে। এর আগে ব্যাংক কমিশন করার কথা তিনি একাধিকবার বলেছেন।

বাজেটের পরই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন। বিষয়টি তুলে ধরলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংক সংস্কারে কোনো কমিশন করছি না। সব কাগজপত্র তৈরি করছিলাম। এটা পরবর্তী সরকারের কাছে দিয়ে যাব। তারা এটা করবে।’

ভার্চুয়াল মিডিয়া বা অনলাইন কেনাকাটার ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনলাইন মাধ্যম এখন বেশ জনপ্রিয়। বেশ সহজলভ্যও। তাই তাদের এখন সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকতে হবে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী এনবিআর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে উত্তর দিতে বলেন। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা ইউটিউব, ফেসবুকসহ অন্যান্য ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্যবহারে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ওপর করারোপে যাব। সেটা করা হয়েছে। তবে অনলাইন কেনাকাটার ওপর যে ৫ শতাংশ হারে করারোপের কথা বলা হচ্ছে সেটি সঠিক নয়। এর ওপর কোনো কর নেয়া হবে না।

নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের কোনো ধরনের সুখবর আছে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, চাকরিজীবীরা জীবনে তা পায়নি। ৪০ হাজার টাকা বেতন বেড়ে ৮২ হাজার টাকা হয়েছে। তাদের পেনশন ব্যবস্থা সংস্কার করা হয়েছে। এমন কোনো চাকরিজীবী আছে বলে মনে হয় না যে তিনি আরও কোনো সুযোগ চান।

প্রস্তাবিত বাজেটে ছোট ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশনের ওপর বাড়তি ভ্যাট আরোপ, মাঝারি ফ্ল্যাটে হ্রাস এবং বড় ফ্ল্যাটে কোনো পদক্ষেপ রাখা হয়নি। স্বল্প আয়ের মানুষই সাধারণত ছোট আয়তনের ফ্ল্যাট কিনে থাকেন। এ ধরনের পদক্ষেপ ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়াচ্ছে। এটা কি গরিব মারা বাজেট? এমন প্রশ্নে সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে কে বলতে পারবেন, বলেন। ক্ষিপ্ত সুরে বলেন, ‘এ দেশের দারিদ্র্য বাড়ছে না। যে বলে বাড়ছে, ‘ইটস লাই’। বৈষম্য বাড়েনি। আপনারা এমন সব প্রশ্ন করছেন, বলতেও লজ্জাবোধ করি।

এটি কেমন ধরনের সাংবাদিক, যারা দেশের পরিবর্তনকে স্বীকার করে না। বাংলাদেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। আপনাদের জন্মের আগে সেটি ছিল ৭০ শতাংশ। কোথায় ছিল বাংলাদেশ, কোথায় আসছে। কিছু দিন আগেও এ হার ৩০ শতাংশ ছিল।

চূড়ান্ত গরিবের সংখ্যা ১৮ শতাংশ থেকে নেমে ১১ শতাংশ হয়েছে। কোন মুখে আপনারা বলেন, এ দেশে গরিব মারার বাজেট হচ্ছে। ধনীদের তেল দেয়ার বাজেট হচ্ছে। দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে। অথচ বোঝাতে চাচ্ছেন কিছুই হয়নি। ‘সরি টু স্টেটমেন্ট’।

সঞ্চয়পত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান সুদহার সমন্বয় করতে বাজেটের পর বৈঠক করা হবে। এটি নিয়ম প্রতি ২ থেকে ৩ বছর পর সুদের হার সমন্বয় করা। এবার করতে একটু দেরি হয়েছে।

নির্বাচনের কারণে বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হবে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বরে নির্বাচন হলে এপ্রিলেই এর হাওয়া লাগে। কিন্তু এখনও নির্বাচনী হাওয়া লাগেনি। এবার একটু দেড়িতেই লাগছে। এটি একটি দেশের জন্য ভালো।

কারণ নির্বাচনী হাওয়া যত কম সময় চলবে, কাজের ডিস্টার্ব তত কম হবে। ফলে এবারও বাজেট বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হচ্ছে না। এটি একটি সুখবর।

বিনিয়োগ কম, কর্মসংস্থান সে ধরনের হচ্ছে না। এরপরও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে- এর নেপথ্যে জাদু কী, এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ কম হচ্ছে। জিডিপিতে রাজস্বের অনুপাত কম হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে যে সম্পদ আহরণ করছি সে সম্পদের ব্যবহার অনেক ভালো হয়।

এত উন্নত কৌশলে হয়, যা দিয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি করেছি। তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশ হচ্ছে। আগামী বছরে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে। স্বল্প বিনিয়োগ ও রাজস্ব দিয়ে বিগত সময়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। আগামী দিনেও অর্জন করতে পারব।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আরও দরকার প্রশাসনিক সংস্কার। জনসংখ্যা অনেক বেশি, পাশাপাশি আয়তন কম। বিশ্বের অর্ধেক দেশ আছে জনসংখ্যা ও আয়তন আমাদের চেয়ে কম। ফলে আমাদের এত বড় জেলা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে কঠিন হয়।

এজন্য প্রয়োজন স্থানীয় সরকারের একটি পরিপূর্ণ বিবর্তন। কবে হবে জানি না। তবে আমি আশা করি, এটি হওয়া দরকার। এদেশের লোকজনের সক্ষমতা অনেক বেশি। সামান্য বিনিয়োগ করে ফল বেশি পাচ্ছে। এ ধারা বজায় রাখতে সরকারকে একটু তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া দরকার।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিশাল রাজস্ব অর্জন কীভাবে সম্ভব, এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে তা অর্জন হবে। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে এখন পর্যন্ত উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনই হচ্ছে। সেটি কী করে সম্ভব হয়েছে। ঘাটতি বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫ শতাংশের নিচে এটি রাখা হয়েছে। তা অতিক্রম করা হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৪ দশমিক ৯ শতাংশে রাখা হয়েছে।

একসময় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বিশ্বভিক্ষুক ছিলেন। এখন সে অবস্থায় নেই। এর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, একসময় বাংলাদেশের বাজেটের চেয়ে বেশি আনতে হতো বিদেশি সাহায্য। বাংলাদেশ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছে- এখন কেউ আর বলেন না। এখন বলছে বাংলাদেশ উন্নয়নের মডেল।

বিদেশি ঋণে বেশি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, কয়েকটি প্রকল্পের জন্য ঋণ নেয়া হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের জন্য নেয়া হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণ আসবে। এটি কোনো ধরনের বোঝা বা চাপ সৃষ্টি করছে না। ঋণ পরিশোধের জবাবে বলেন, কোনো দিন ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হয়নি। এ ধরনের রেকর্ড অন্য কোনো দেশে নেই।

বিদেশে শ্রম অফিস খোলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করছে এমন দেশগুলোয় শ্রম অফিস খোলা হবে। এটি আমাদের দায়িত্ব।

মুহিত বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও পুরো টাকা খরচ করতে হবে না। সামান্য কিছু টাকা ব্যয় হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় করা অর্থ এ পর্যন্ত বিদেশি অনুদান থেকে পাওয়া গেছে। এটি আগামী বছরও পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter