চীনকে মোকাবিলায় তাইপের রণতরি মোতায়েন
jugantor
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সামরিক যোগাযোগ স্থগিত
চীনকে মোকাবিলায় তাইপের রণতরি মোতায়েন
তাইওয়ানগামী ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তন

  যুগান্তর ডেস্ক  

০৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রণতরী

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর কেন্দ্র করে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। চাপের মুখে রাখতে দেশটি ঘিরে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র (মিসাইল) বহনকারী বিমান টহল দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে বেইজিং। অপরদিকে, তাইওয়ানও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যবস্থা ও রণতরি মোতায়েন করেছে দেশটি। এছাড়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিমান ও জাহাজও মোতায়েন করেছে। এদিকে, চীনের মহড়ায় তাইওয়ানে সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। খবর বিবিসি, এপি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট ও আলজাজিরা।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে সামরিক মহড়া শুরু করে চীন। স্বশাসিত দ্বীপটিকে ঘিরে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে চীন। শুক্রবার তাইওয়ানের উপকূল থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে চীনের পিংটান দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী বিমানকে টহল দিতে দেখা যায়।

এ সামরিক মহড়া স্থানীয় সময় শনিবার দুপুরে শেষ হবে। শুক্রবার তাইওয়ানের চারদিকে সাগরে চীনের নৌ এবং আকাশে বিমানবাহিনী দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাপক মহড়া দিয়েছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তাইওয়ান প্রণালিতে একাধিক চীনা যুদ্ধ জাহাজ এবং যুদ্ধ বিমান তাদের সীমানা লঙ্ঘন করেছে। ১০টি চীনা যুদ্ধ জাহাজ তাইওয়ানের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এছাড়া, ২০টি চীনা যুদ্ধ বিমান ওই এলাকায় তাইওয়ানের আকাশ সীমা লঙ্ঘন করে।

এদিকে, তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ বলছে, চীনের এ মহড়া জাতিসংঘের নিয়মবহির্ভূত এবং সরাসরি আকাশ ও সমুদ্রসীমায় প্রবেশ স্বাধীনতার জন্য হুমকি। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে-তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিমান ও জাহাজও মোতায়েন করা হয়েছে।

একাধিক চীনা জাহাজ এবং বিমান তাইওয়ান প্রণালি মধ্যরেখা অতিক্রম করার পর মিসাইল ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়। চীনের সামরিক মহড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শুক্রবার তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী সু সেং-চ্যাং জানিয়েছেন, ‘দুষ্ট প্রতিবেশী’ আমাদের দরজায় এসে শক্তি প্রদর্শন করছে। চীনের মিসাইল নিক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, চীন সামরিক মহড়ার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জলপথকে নির্বিচারে ধ্বংস করছে।

প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্বও চীনের এ কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছে। তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) বলেছে, চীন আন্তর্জাতিক জলপথের সবচেয়ে বড় ব্যস্ত অংশে মহড়া পরিচালনা করছে, যা দায়িত্বহীনতা, অবৈধ আচরণ।

তাইওয়ানের মাধ্যমেই চীনের সম্প্রসারণবাদের স্বপ্ন শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ উ। শুক্রবার তিনি বলেন, তাইওয়ান চীনের সম্প্রসারণবাদের স্বপ্নের শেষ টুকরো নয়।

চীন কী করার চেষ্টা করছে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর নজর রাখা উচিত। এ সময় পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাইওয়ান ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখতে চায়।

অর্থাৎ নিজস্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশটি একটি স্বশাসিত দ্বীপ থাকবে। তবে নিজেদের একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করবে না দ্বীপটি। যদিও চীন স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।

রাজধানী তাইপে সফর করায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ উ বলেন, পেলোসির সফরের জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে কৌশলগত সামরিক মহড়া শুরু করেছে চীনা সামরিক বাহিনী।

তাইওয়ানের চারপাশে অবরোধ সৃষ্টি করায় চীনের নিন্দা করে তিনি বলেন, পেলোসির মতো নেতাদের তাইওয়ান সফর খুবই গুরত্বপূর্ণ। এতে তাইওয়ানের সুনাম বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বুঝতে পারে যে তাইওয়ান একটি গণতান্ত্রিক দেশ।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চীনের যোগাযোগ স্থগিত : পেলোসির তাইওয়ান সফরে ক্ষুব্ধ চীন মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ও সংলাপ স্থগিত করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুদেশের সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডার পর্যায়ে নিয়মিত যে সংলাপ চলে তা স্থগিত করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং অবৈধ অভিবাসী প্রত্যর্পণসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সহযোগিতাও স্থগিত করার কথা ঘোষণা করেছে চীন।

স্পিকার পেলোসির তাইওয়ান সফরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে চীন। কারণ তাইওয়ানকে তারা অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে গণ্য করে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা স্থগিত করার পাশাপাশি পেলোসি এবং তার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বেইজিং।

পেলোসির ওপর নিষেধাজ্ঞা চীনের : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে চীনের সরকার। কয়েকবার নিষেধ করার পরও বিরোধপূর্ণ তাইওয়ান দ্বীপে সফর করায় পেলোসি ও তার কাছের আত্মীয়দের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা জানিয়েছে চীন। তবে তার ওপর ঠিক কি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে সেটি পরিষ্কার করে জানানো হয়নি।

নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চীনের কঠোর বাধা ও আপত্তি সত্ত্বেও তাইওয়ানে যাওয়ায়, চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায়, এক চীন নীতিকে পদদলিত করায় এবং তাইওয়ান প্রণালির শান্তি এবং স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলায়-ন্যান্সি পেলোসির উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য চীনের আইন অনুযায়ী পেলোসি ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। শুক্রবার এ নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত জানানোর পর চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, পেলোসি চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলিয়েছেন।

চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা খর্ব করেছেন, আমেরিকার ‘এক চীন নীতি’ পায়ে দলেছেন এবং তাইওয়ান প্রণালির শান্তি এবং স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলেছেন।

এদিকে, তাইওয়ানের চারদিকে চীনের নজিরবিহীন সামরিক মহড়ার নিন্দা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। তিনি বলেন, চীনের এ প্রতিক্রিয়া মাত্রাতিরিক্ত ও অযৌক্তিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের এক বৈঠকে ব্লিনকেন বলেন, চীন যা করছে তার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

‘অনুমতি’ দেওয়া হবে না : তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে চীনকে ‘অনুমতি’ দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন পেলোসি। শুক্রবার জাপান সফরকালে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। তবে চীনের সামরিক মহড়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। মার্কিন রাজনীতিবিদদের অবাধে তাইওয়ানে ভ্রমণ করতে সক্ষম হওয়া উচিত বলে যুক্তি দিয়েছেন তিনি।

এ সময় তিনি বলেন, তারা (চীন) তাইওয়ানকে অন্য জায়গায় যাওয়া বা অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তারা আমাদের সেখানে ভ্রমণে বাধা দিয়ে তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। এ সময় তিনি বলেন, তাইওয়ান বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে একটি এবং দেশটির একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে শক্তিশালী গণতন্ত্রও রয়েছে।

তাইওয়ানগামী ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তন : তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক মহড়ার কারণে বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ সংস্থা তাইপেগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। পাশাপাশি ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য দেশগামী ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে।

চীনের সামরিক মহড়ার কারণে ওই অঞ্চলের আকাশসীমা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চীনের সামরিক মহড়ায় কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান অংশ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

এতে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ভ্রমণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া সামরিক মহড়া তাইওয়ানের ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিলোমিটার) আঞ্চলিক জলসীমাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। বিষয়টিকে তাইওয়ানের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ এবং দেশটির সমুদ্র ও আকাশসীমা অবরোধ করার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন।

মহড়ার কারণে কোরিয়ান এয়ারলাইনস ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস শুক্রবার তাইপে যাওয়া-আসার ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোরিয়ান এয়ারলাইনস শনিবারের ফ্লাইটও বাতিল করতে যাচ্ছে আর বিলম্বিত করতে যাচ্ছে রোববারের ফ্লাইটগুলোও।

হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজ ও ফিলিপাইন এয়ারলাইনস জানায়, তাদের ফ্লাইটগুলো তাইওয়ানের চারপাশে নির্ধারিত আকাশসীমা এড়িয়ে চলছে। এতে কিছু ফ্লাইটের গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে। ভিয়েতনামের বেসামরিক বিমান পরিবহণ সংস্থা ওই আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে দেশটির উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সামরিক যোগাযোগ স্থগিত

চীনকে মোকাবিলায় তাইপের রণতরি মোতায়েন

তাইওয়ানগামী ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তন
 যুগান্তর ডেস্ক 
০৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
রণতরী
তাইওয়ানের সিনচু বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গারে ফ্রান্সের তৈরি মিরেজ-২০০০ যুদ্ধবিমান। চীনের সামরিক মহড়ার প্রেক্ষাপটে সতর্ক দেশটি। শুক্রবারের ছবি -এএফপি

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর কেন্দ্র করে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। চাপের মুখে রাখতে দেশটি ঘিরে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র (মিসাইল) বহনকারী বিমান টহল দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে বেইজিং। অপরদিকে, তাইওয়ানও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যবস্থা ও রণতরি মোতায়েন করেছে দেশটি। এছাড়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিমান ও জাহাজও মোতায়েন করেছে। এদিকে, চীনের মহড়ায় তাইওয়ানে সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। খবর বিবিসি, এপি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট ও আলজাজিরা।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে সামরিক মহড়া শুরু করে চীন। স্বশাসিত দ্বীপটিকে ঘিরে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে চীন। শুক্রবার তাইওয়ানের উপকূল থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে চীনের পিংটান দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী বিমানকে টহল দিতে দেখা যায়।

এ সামরিক মহড়া স্থানীয় সময় শনিবার দুপুরে শেষ হবে। শুক্রবার তাইওয়ানের চারদিকে সাগরে চীনের নৌ এবং আকাশে বিমানবাহিনী দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাপক মহড়া দিয়েছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তাইওয়ান প্রণালিতে একাধিক চীনা যুদ্ধ জাহাজ এবং যুদ্ধ বিমান তাদের সীমানা লঙ্ঘন করেছে। ১০টি চীনা যুদ্ধ জাহাজ তাইওয়ানের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এছাড়া, ২০টি চীনা যুদ্ধ বিমান ওই এলাকায় তাইওয়ানের আকাশ সীমা লঙ্ঘন করে।

এদিকে, তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ বলছে, চীনের এ মহড়া জাতিসংঘের নিয়মবহির্ভূত এবং সরাসরি আকাশ ও সমুদ্রসীমায় প্রবেশ স্বাধীনতার জন্য হুমকি। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে-তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিমান ও জাহাজও মোতায়েন করা হয়েছে।

একাধিক চীনা জাহাজ এবং বিমান তাইওয়ান প্রণালি মধ্যরেখা অতিক্রম করার পর মিসাইল ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়। চীনের সামরিক মহড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শুক্রবার তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী সু সেং-চ্যাং জানিয়েছেন, ‘দুষ্ট প্রতিবেশী’ আমাদের দরজায় এসে শক্তি প্রদর্শন করছে। চীনের মিসাইল নিক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, চীন সামরিক মহড়ার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জলপথকে নির্বিচারে ধ্বংস করছে।

প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্বও চীনের এ কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছে। তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) বলেছে, চীন আন্তর্জাতিক জলপথের সবচেয়ে বড় ব্যস্ত অংশে মহড়া পরিচালনা করছে, যা দায়িত্বহীনতা, অবৈধ আচরণ।

তাইওয়ানের মাধ্যমেই চীনের সম্প্রসারণবাদের স্বপ্ন শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ উ। শুক্রবার তিনি বলেন, তাইওয়ান চীনের সম্প্রসারণবাদের স্বপ্নের শেষ টুকরো নয়।

চীন কী করার চেষ্টা করছে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর নজর রাখা উচিত। এ সময় পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাইওয়ান ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখতে চায়।

অর্থাৎ নিজস্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশটি একটি স্বশাসিত দ্বীপ থাকবে। তবে নিজেদের একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করবে না দ্বীপটি। যদিও চীন স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। 

রাজধানী তাইপে সফর করায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ উ বলেন, পেলোসির সফরের জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে কৌশলগত সামরিক মহড়া শুরু করেছে চীনা সামরিক বাহিনী।

তাইওয়ানের চারপাশে অবরোধ সৃষ্টি করায় চীনের নিন্দা করে তিনি বলেন, পেলোসির মতো নেতাদের তাইওয়ান সফর খুবই গুরত্বপূর্ণ। এতে তাইওয়ানের সুনাম বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বুঝতে পারে যে তাইওয়ান একটি গণতান্ত্রিক দেশ। 

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চীনের যোগাযোগ স্থগিত : পেলোসির তাইওয়ান সফরে ক্ষুব্ধ চীন মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ও সংলাপ স্থগিত করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুদেশের সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডার পর্যায়ে নিয়মিত যে সংলাপ চলে তা স্থগিত করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং অবৈধ অভিবাসী প্রত্যর্পণসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সহযোগিতাও স্থগিত করার কথা ঘোষণা করেছে চীন।

স্পিকার পেলোসির তাইওয়ান সফরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে চীন। কারণ তাইওয়ানকে তারা অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে গণ্য করে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা স্থগিত করার পাশাপাশি পেলোসি এবং তার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বেইজিং।

পেলোসির ওপর নিষেধাজ্ঞা চীনের : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে চীনের সরকার। কয়েকবার নিষেধ করার পরও বিরোধপূর্ণ তাইওয়ান দ্বীপে সফর করায় পেলোসি ও তার কাছের আত্মীয়দের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা জানিয়েছে চীন। তবে তার ওপর ঠিক কি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে সেটি পরিষ্কার করে জানানো হয়নি। 

নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চীনের কঠোর বাধা ও আপত্তি সত্ত্বেও তাইওয়ানে যাওয়ায়, চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায়, এক চীন নীতিকে পদদলিত করায় এবং তাইওয়ান প্রণালির শান্তি এবং স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলায়-ন্যান্সি পেলোসির উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য চীনের আইন অনুযায়ী পেলোসি ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। শুক্রবার এ নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত জানানোর পর চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, পেলোসি চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলিয়েছেন।

চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা খর্ব করেছেন, আমেরিকার ‘এক চীন নীতি’ পায়ে দলেছেন এবং তাইওয়ান প্রণালির শান্তি এবং স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলেছেন। 

এদিকে, তাইওয়ানের চারদিকে চীনের নজিরবিহীন সামরিক মহড়ার নিন্দা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। তিনি বলেন, চীনের এ প্রতিক্রিয়া মাত্রাতিরিক্ত ও অযৌক্তিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের এক বৈঠকে ব্লিনকেন বলেন, চীন যা করছে তার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

‘অনুমতি’ দেওয়া হবে না : তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে চীনকে ‘অনুমতি’ দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন পেলোসি। শুক্রবার জাপান সফরকালে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। তবে চীনের সামরিক মহড়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। মার্কিন রাজনীতিবিদদের অবাধে তাইওয়ানে ভ্রমণ করতে সক্ষম হওয়া উচিত বলে যুক্তি দিয়েছেন তিনি।

এ সময় তিনি বলেন, তারা (চীন) তাইওয়ানকে অন্য জায়গায় যাওয়া বা অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তারা আমাদের সেখানে ভ্রমণে বাধা দিয়ে তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। এ সময় তিনি বলেন, তাইওয়ান বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে একটি এবং দেশটির একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে শক্তিশালী গণতন্ত্রও রয়েছে। 

তাইওয়ানগামী ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তন : তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক মহড়ার কারণে বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ সংস্থা তাইপেগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। পাশাপাশি ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য দেশগামী ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে।

চীনের সামরিক মহড়ার কারণে ওই অঞ্চলের আকাশসীমা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চীনের সামরিক মহড়ায় কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান অংশ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

এতে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ভ্রমণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া সামরিক মহড়া তাইওয়ানের ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিলোমিটার) আঞ্চলিক জলসীমাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। বিষয়টিকে তাইওয়ানের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ এবং দেশটির সমুদ্র ও আকাশসীমা অবরোধ করার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন।

মহড়ার কারণে কোরিয়ান এয়ারলাইনস ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস শুক্রবার তাইপে যাওয়া-আসার ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোরিয়ান এয়ারলাইনস শনিবারের ফ্লাইটও বাতিল করতে যাচ্ছে আর বিলম্বিত করতে যাচ্ছে রোববারের ফ্লাইটগুলোও।

হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজ ও ফিলিপাইন এয়ারলাইনস জানায়, তাদের ফ্লাইটগুলো তাইওয়ানের চারপাশে নির্ধারিত আকাশসীমা এড়িয়ে চলছে। এতে কিছু ফ্লাইটের গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে। ভিয়েতনামের বেসামরিক বিমান পরিবহণ সংস্থা ওই আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে দেশটির উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন