ভোটের আগেই বাড়ছে মধ্যবিত্তের ব্যয়

৫টির মধ্যে ৩টি মৌলিক চাহিদার বিপরীতেই কর বেড়েছে * চাপে পড়বেন প্রায় ৩ কোটি মানুষ * অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সাম্যনীতির পরিপন্থী

  মনির হোসেন ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট,

প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আয় বৃদ্ধির জন্য নেয়া পদক্ষেপের কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণী চাপে পড়বে। ৫টি মৌলিক চাহিদার ৩টিতেই কোনো না কোনোভাবে কর বাড়ানো হয়েছে।

বাজেটে যেসব উদ্যোগ মধ্যবিত্তকে চাপে ফেলবে এর মধ্যে আছে- করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানো, ছোট ফ্ল্যাটে ভ্যাট বৃদ্ধি, ফার্নিচারের উৎপাদন ও বিপণন কর, পোশাকে ভ্যাট বাড়ানো এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় ভ্যাট বৃদ্ধি।

এছাড়া পুরো বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। যা ভোক্তা শ্রেণীর ব্যয় বাড়াবে। বাজেটে তুলনামূলকভাবে উচ্চ ও নিু আয়ের মানুষকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। এসব কারণে ভোটের আগেই প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-যাত্রার ব্যয় বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অর্থনীতির সাম্যনীতির পরিপন্থী।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রভাবে এবারের বাজেটে মধ্যবিত্তরা চাপে পড়বে। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা ভোটের কারণে নিুবিত্তদের গুরুত্ব দেন।

আবার নির্বাচনের টাকা সংগ্রহের জন্য সম্পদশালীদের গুরুত্ব দেন। কিন্তু বিকাশমান শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভূমিকাকে এখনও মূল্যায়ন করেন না। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে অর্থনীতির সুষ্ঠু বিকাশ এবং শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নসহ সমাজে কাক্সিক্ষত ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এবারের বাজেটে উচ্চবিত্তের লালন, মধ্যবিত্তের দমন এবং নিুবিত্তদের জন্য ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের দৈনিক আয় ১০ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যে, তারাই মধ্যবিত্ত। তবে আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক মর্যাদা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধাকেও মানদণ্ডে আনতে হবে। ওই বিবেচনায় বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৩ কোটির মতো।

স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিবছরের বাজেটেই আয় বাড়াতে হয়। আর এ আয়ের বড় অংশ দেশের ভেতর থেকেই সংগ্রহ করা হয়। ফলে বাজেটের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। এ বছরও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের টার্গেট করা হয়েছে। এ কারণে ব্যক্তি শ্রেণীর ন্যূনতম করসীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির বার্ষিক আয় এ টাকার (আড়াই লাখ) বেশি হলে তাকে কর দিতে হবে। এমনিতেই উচ্চ পণ্যমূল্যের কারণে মানুষের খরচ বাড়ছে। এ অবস্থা মধ্যবিত্তদের স্বস্তি দিতে এ সীমা কিছুটা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল অর্থনীতিবিদ এবং বিভিন্ন সংগঠন। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি।

দ্বিতীয়ত, ছোট ফ্লাটের ক্ষেত্রে মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়ানো হয়েছে। এখানে দুই স্তরের ভ্যাট ছিল। ১ থেকে ১১শ’ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ভ্যাট ছিল দেড় শতাংশ। আর ১১শ’ থেকে ১৬শ’ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের ভ্যাট ছিল আড়াই শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে এটি ১ থেকে ১৬শ’ পর্যন্ত সবার জন্য ২ শতাংশ করে দেয়া হয়েছে। ফলে ছোট ফ্ল্যাটের ভ্যাট দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়বে। এর মানে যে ফ্ল্যাটের দাম ৫০ লাখ টাকা, তার সঙ্গে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা ভ্যাট যুক্ত হবে। আর ১১শ’ থেকে ১৬শ’ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের ভ্যাট দশমিক ৫০ শতাংশ কমবে।

তৃতীয়ত, আমদানি পর্যায়ে সব পণ্যের ক্ষেত্রে আগাম ট্রেড ভ্যাট বা এটিভি ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও স্বাভাবিক নিয়মে পরে এটি মূল ভ্যাট থেকে সমন্ব^য়ের বিধান রয়েছে। কিন্তু সব পণ্যে সমন্বয় হয় না। ফলে এ সিদ্ধান্তে পোশাকসহ ফিনিশড গুডসের দাম বাড়বে। যেখানে খাদ্যপণ্য মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী। সেখানে এটিভি বাড়ানোর ফলে আগামী বছর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা কঠিন হবে।

চতুর্থত : যারা গাড়ি কিনতে পারেন না, এ ধরনের মধ্যবিত্তের জনপ্রিয় পরিবহন হল উবার, পাঠাওয়ের মতো অ্যাপসভিত্তিক সেবা। প্রস্তাবিত বাজেটে অ্যাপসভিত্তিক সেবার জন্য মালিকদের ৩ শতাংশ কর এবং ভোক্তা পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। আর শেষ পর্যন্ত পুরোটাই ভোক্তার ওপর বর্তাবে। যা মধ্যবিত্তের পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

পঞ্চমত, তথ্যপ্রযুক্তি আইটেমের ভ্যাট সাড়ে চার শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাজেটে মোট ২৪টি পণ্যে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি পণ্যে কাস্টমস শুল্ক, ৮টি পণ্যে সম্পূরক শুল্ক এবং ৬টি পণ্যে নিয়ন্ত্রণ শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে পণ্যগুলোর আমদানি ব্যয় বাড়বে। এছাড়াও ভ্যাটের স্তর ৯ থেকে কমিয়ে ৫ করা হয়েছে। এতেও বেশ কিছু পণ্যের ভ্যাট বাড়বে। মোট কথা চাপগুলো ঘুরেফিরে মধ্যবিত্তের ওপর পড়ছে।

ষষ্ঠত, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের মাধ্যমে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। আর সরাসরি আয়করের মাধ্যমে আসবে ১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা এবং আমদানি শুল্ক ৮৩ হাজার কোটি টাকা।

সপ্তম, ফার্নিচারের ওপর উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বাড়িয়ে ৬ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ এবং বিক্রির পর্যায়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যটির দাম বাড়বে।

অষ্টম, ব্র্যান্ডের পোশাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আগে এ পণ্যটির ওপর ৪ শতাংশ ভ্যাট ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

এছাড়াও বাজেটে ভ্যাট ও শুল্ক বাড়ানোর কারণে আরও যেসব পণ্যের দাম বাড়বে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- রিকন্ডিশন গাড়ি, ফলের জুস, এনার্জি ড্রিংক, বডি স্প্রে, চকলেট, ফিলামেন্ট বাল্ব, আইপিএস-ইউপিএস, কফি, মোবাইল চার্জার, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার, গ্রিন-টি, টমেটো কেচাপ, টমেটো সস, শেভিং ব্লেড, শেভিং জেল, চশমার ফ্রেম, সানগ্লাস, লুব্রিকেটিং ওয়েল, সিরামিক বাথটব, সব ধরনের বাদাম, ক্যালেন্ডার, জার্সি, শীতের কার্ডিগান, কাশ্মীরি শাল, চুলের ক্রিম, হেয়ার রিমুভার, সিআর কয়েল, জিপি শিট, সিআই শিট, আমদানিকৃত মধু, প্লাস্টিক ব্যাগ এবং বিভিন্ন ধরনের পেপার। এর সবই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ ব্যবহার করেন। ফলে এসব পণ্য কেনার ক্ষেত্রে তাদের ব্যয় বাড়বে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ। বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি তেল, খাদ্যসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতির দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ডলারের দাম বেড়েছে। যা আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। ফলে মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব ফেলবে।

সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, বাড়তি কর যা আসবে তার ২৯ শতাংশ আসবে প্রত্যক্ষ কর থেকে। ভ্যাট বা পরোক্ষ কর থেকে আসবে ৩৫ শতাংশ। এর মানে মধ্যবিত্ত, নিুবিত্ত ও সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়াবে। আমদানি ও ব্যবসা পর্যায়ে অগ্রিম ভ্যাট ৪ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের ফলে বাজারে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে।

মূল্যম্ফীতি থাকলেও করমুক্ত আয়সীমা না বাড়িয়ে চাকরিজীবীদের আনুতোষিকের ওপর কর আরোপের নিুসীমা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৫ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এ সুযোগ পাবেন উচ্চ আয়ের লোকেরা। এ ব্যাপারে সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে প্রত্যক্ষ করের (আয়কর) তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। পরোক্ষ করের চাপ নিু-মধ্যবিত্তের ওপর বেশি পড়ে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ায়। ফলে সাম্যভিত্তিক করের দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×