আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য চায়নি বাংলাদেশ
jugantor
সুইস ব্যাংকের কাছে ৬৭ জনের নামে চিঠি
আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য চায়নি বাংলাদেশ
ব্যক্তির নাম, হিসাব নম্বর ও ব্যাংকের নাম ছাড়া তথ্য দেওয়া হয় না

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১২ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুইজারল্যান্ডের কোন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে সে বিষয়ে কোন তথ্য নেই সরকারের হাতে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কত টাকা পাচার হয়েছে বা কোন দেশ থেকে কি পরিমাণ অর্থ সে দেশে গেছে-সে তথ্যও নেই। ফলে বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ডের কাছে তাদের আইন অনুযায়ী তথ্য চাইতে পারছে না। এদিকে সুনির্দিষ্ট নামোল্লেখ করে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সুইস ব্যাংক সাড়া দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট নাম ছাড়া যেসব তথ্য চেয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে কোনো সাড়া দেয়নি।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে জুলাই পর্যন্ত ৬৭ জনের নামোল্লেখ করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ সুইজারল্যান্ড আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (সুইস এফআইইউ) কাছে তথ্য চেয়েছে। এর মধ্যে ৬৬ জনের নামেই সুইজারল্যান্ডের এফআইইউর তথ্য ভান্ডারে কোনো তথ্য নেই বলে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। বাকি একজনের নামে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার তথ্য আছে বলে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে (বিএফআইইউ) জানানো হয়েছে। সে তথ্য বিএফআইইউ দুর্নীতি দমন কমিশনকে দিয়েছে মামলার তদন্ত কাজে। যে ৬৭ জনের নামে তথ্য চেয়েছে সেগুলোতে কোন ব্যাংকে অর্থ জমা ও অ্যাকাউন্ট নাম্বার উল্লেখ করা হয়নি। সুইজারল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, তাদের দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক (সুইস ব্যাংক) থেকে তথ্য চাইতে হলে ব্যক্তির নাম, ব্যাংকের নাম ও অ্যাকাউন্ট নাম্বার উল্লেখ করতে হয়। এগুলো উল্লেখ ছাড়া কোনো তথ্য চাইলে তারা দেয় না। কেন না সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সুরক্ষা দিয়ে থাকে। তারা কোন দেশের তথ্য চাওয়ার বিপরীতে সব ব্যাংকে অনুসন্ধান করে না। শুধু সুনির্দিষ্ট ব্যাংকের হিসাবেই অনুসন্ধান করে।

এদিকে যে ৬৭ জনের নামে তথ্য চাওয়া হয়েছে সেইসব ব্যক্তির কোন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে এবং অ্যাকাউন্ট নাম্বার বিএফআইইউর হাতে নেই। যে কারণে সুইজারল্যান্ডের আইন মেনে তথ্য চাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে বিএফআইইউ। এজন্য তারা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা নিয়েছে। সবকিছু পাওয়া গেলে আবার নতুন করে তথ্য চাওয়া হবে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০১৪ সাল থেকে সে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নামে মোট কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে সে তথ্য প্রকাশ করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। তবে কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করছে না। শুধু মোট অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করছে।

২০১৪ সালের জুনে এ তথ্য প্রকাশের পর বাংলাদেশ প্রথম সুইস ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশি কোন নাগরিকের কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে সে তথ্য চেয়েছিল। কিন্তু সুইস কর্তৃপক্ষ এতে কোনো সাড়া দেয়নি। ওই বছরেই সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এতেও কোনো সাড়া দেয়নি। ২০১৫ সালের জুনেও সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বিএফআইইউ থেকে আবার একই চিঠি দেওয়া হয়। এতেও সাড়া মেলেনি।

পরে আবারও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক করার চিঠি দেওয়া হয়। এতেও সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ ১৬ জুন সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হয়। ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্টটি তৈরি হয়। এতে দেখা গেছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ৮৩৯০ কোটি টাকা। এরপর ১৭ জুলাই বিএফআইউ থেকে আবার চিঠি দিয়ে তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু এখনও এর কোনো জবাব মেলেনি।

এদিকে বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন সুইস ব্যাংকে অর্থ জমাদানকারীদের তথ্য চাওয়া হয়েছিল কিনা। রোববারের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে এ তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। এর আগে বুধবার সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় বলেছেন, বাংলাদেশ অর্থ জমাকারীদের ব্যাপারে সুইজারল্যান্ডের কাছে কোনো তথ্য চায়নি। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন যুগান্তরকে বলেছেন, সুইস রাষ্ট্রদূত যে কথা বলেছেন-সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ কোনো তথ্য চায়নি, তা সঠিক নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিকবার তথ্য চেয়েছে। কিন্তু সুইস কর্তৃপক্ষ সেসব তথ্য দেয়নি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সুইস ব্যাংক হোক আর বিশ্বের অন্য কোনো ব্যাংকে গচ্ছিত টাকাই হোক-এগুলোর বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে গেছে, আরেকটি অংশ বিভিন্ন দেশ বা ওই দেশ থেকে অর্জিত অর্থ। এছাড়া দেশ থেকে প্রতিবছর টাকা পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশ থেকে বছরে গড়ে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।

গত বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। পাচার করা এসব টাকা ফেরত আনার বিষয়ে চলতি বাজেটে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার করা টাকা ফেরত আনলে কোনো সংস্থা থেকে প্রশ্ন করা হবে না। জানা গেছে, সুইস ব্যাংকে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের আলোকে সুইজারল্যান্ডের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অথরিটির কাছে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এখনো কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পাচারের টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আগে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা হবে কিনা। এ সিদ্ধান্ত হলে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে আইনি কাঠামো আছে, তাতে টাকা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন কিছু নয়। তবে একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কারও টাকা ফিরিয়ে আনা হলে পরে আর কেউ টাকা পাচার করতে সাহস দেখাবে না। তিনি আরও বলেন, সুইস ব্যাংক এখন বিভিন্ন দেশকে তথ্য দিচ্ছে। এজন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তথ্য চাইতে হবে। তা না হলে তথ্য পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তাদের দেশের আইন অনুসরণ করে কোনো তথ্য চায়নি। ফলে তারা তথ্য দিচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সুইজারল্যান্ড থেকে পাচার করা টাকা ফেরাতে সেই দেশের ব্যাংকের আইনকানুন সম্পর্কে জানতে হবে। ওই আইনের ভিত্তিতে তাদের কাছে তথ্য চাইতে হবে। তথ্য পেতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো পরিপালন করতে হবে। তাহলেই শুধু তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কেননা সুইস ব্যাংক তাদের ব্যাংকিং আইনকানুন অনেক শিথিল করেছে। অনেক দেশকে তারা সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা উল্লেখযোগ্য। তারা আরও বলেছেন, সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলে ওইসব দেশ যে প্রক্রিয়ায় সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য পেয়েছে, সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ওইসব দেশে প্রতিনিধি দল পাঠাতে পারে।

সূত্র জানায়, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ১২ জুন লাটভিয়ার রিগায় বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্সের একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিএফআইইউর পরিচালক রফিকুল ইসলাম। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুইস ব্যাংকে জমা করা অর্থের মালিকদের তথ্য পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এগমন্ট গ্রুপের (বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী সংস্থা) বৈঠক চলাকালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ওই বৈঠকটি করেছিল বাংলাদেশ।
ওই বৈঠকের পর বাংলাদেশ এখন সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে মাঠে নেমেছে। ওইসব বিষয় পাওয়া গেলে আবার সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউর একজন কর্মকর্তা জানান, এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। এজন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে। যেসব ব্যক্তি সম্পর্কে বিএফআইইউ তথ্য পেয়েছে, এখন তাদের বিষয়ে উল্লিখিত তিনটি তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, সুইস ব্যাংক তাদের ব্যাংকের আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। আগে তারা কোনো তথ্যই দিত না। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে মানি লন্ডারিং আইন প্রয়োগ কঠোর হওয়ায় এবং বিশ্বব্যাপী কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ সুইস ব্যাংকে রাখা হচ্ছে-এমন প্রচারণার পর সুইস ব্যাংক তাদের দেশে ব্যাংকিং আইন শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কোস ও তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের পাচার করা অর্থ ছিল সুইস ব্যাংকে। মার্কোস সরকারের পতন হলে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। পরে ১৮ বছর মামলা চলার পর ফিলিপাইন ওইসব পাচার করা অর্থ ফেরত পায়। সূত্র জানায়, বিএফআইউ এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয় ২০১৩ সালের জুনে।

এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ৮ বছরে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট ৭৯টি দেশের সঙ্গে অর্থ পাচার, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নবিষয়ক তথ্য আদান-প্রদান করার জন্য দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ যেমন তথ্য দিচ্ছে, তেমনি তথ্য পাচ্ছেও। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে ২০১৪ সালের জুনে প্রথম চিঠি দেওয়া হয়। এরপর এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেনি। অথচ সুইজারল্যান্ড অনেক দেশের সঙ্গে তথ্য প্রদানের চুক্তি করেছে। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের অনেক সূচকের উন্নতি দেখা হয়। এর মধ্যে মানবাধিকারসহ আরও অনেক বিষয় আছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি কম। যে কারণে তারা চুক্তি করতে আগ্রহ দেখায়নি। তবে চুক্তি হলেও এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড দুটি দেশই ওই গ্রুপের সদস্য। এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে বিএফআইইউ সুইস এফআইইউর কাছে তথ্য চাইতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় এখন কিছু তথ্য পেয়েছে। চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায়ই তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

সুইস ব্যাংকের কাছে ৬৭ জনের নামে চিঠি

আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য চায়নি বাংলাদেশ

ব্যক্তির নাম, হিসাব নম্বর ও ব্যাংকের নাম ছাড়া তথ্য দেওয়া হয় না
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১২ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুইজারল্যান্ডের কোন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে সে বিষয়ে কোন তথ্য নেই সরকারের হাতে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কত টাকা পাচার হয়েছে বা কোন দেশ থেকে কি পরিমাণ অর্থ সে দেশে গেছে-সে তথ্যও নেই। ফলে বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ডের কাছে তাদের আইন অনুযায়ী তথ্য চাইতে পারছে না। এদিকে সুনির্দিষ্ট নামোল্লেখ করে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সুইস ব্যাংক সাড়া দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট নাম ছাড়া যেসব তথ্য চেয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে কোনো সাড়া দেয়নি। 

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে জুলাই পর্যন্ত ৬৭ জনের নামোল্লেখ করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ সুইজারল্যান্ড আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (সুইস এফআইইউ) কাছে তথ্য চেয়েছে। এর মধ্যে ৬৬ জনের নামেই সুইজারল্যান্ডের এফআইইউর তথ্য ভান্ডারে কোনো তথ্য নেই বলে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। বাকি একজনের নামে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার তথ্য আছে বলে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে (বিএফআইইউ) জানানো হয়েছে। সে তথ্য বিএফআইইউ দুর্নীতি দমন কমিশনকে দিয়েছে মামলার তদন্ত কাজে। যে ৬৭ জনের নামে তথ্য চেয়েছে সেগুলোতে কোন ব্যাংকে অর্থ জমা ও অ্যাকাউন্ট নাম্বার উল্লেখ করা হয়নি। সুইজারল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, তাদের দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক (সুইস ব্যাংক) থেকে তথ্য চাইতে হলে ব্যক্তির নাম, ব্যাংকের নাম ও অ্যাকাউন্ট নাম্বার উল্লেখ করতে হয়। এগুলো উল্লেখ ছাড়া কোনো তথ্য চাইলে তারা দেয় না। কেন না সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সুরক্ষা দিয়ে থাকে। তারা কোন দেশের তথ্য চাওয়ার বিপরীতে সব ব্যাংকে অনুসন্ধান করে না। শুধু সুনির্দিষ্ট ব্যাংকের হিসাবেই অনুসন্ধান করে। 

এদিকে যে ৬৭ জনের নামে তথ্য চাওয়া হয়েছে সেইসব ব্যক্তির কোন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে এবং অ্যাকাউন্ট নাম্বার বিএফআইইউর হাতে নেই। যে কারণে সুইজারল্যান্ডের আইন মেনে তথ্য চাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে বিএফআইইউ। এজন্য তারা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা নিয়েছে। সবকিছু পাওয়া গেলে আবার নতুন করে তথ্য চাওয়া হবে। 

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০১৪ সাল থেকে সে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নামে মোট কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে সে তথ্য প্রকাশ করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। তবে কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করছে না। শুধু মোট অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করছে।

২০১৪ সালের জুনে এ তথ্য প্রকাশের পর বাংলাদেশ প্রথম সুইস ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশি কোন নাগরিকের কী পরিমাণ অর্থ জমা আছে সে তথ্য চেয়েছিল। কিন্তু সুইস কর্তৃপক্ষ এতে কোনো সাড়া দেয়নি। ওই বছরেই সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এতেও কোনো সাড়া দেয়নি। ২০১৫ সালের জুনেও সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বিএফআইইউ থেকে আবার একই চিঠি দেওয়া হয়। এতেও সাড়া মেলেনি।

পরে আবারও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক করার চিঠি দেওয়া হয়। এতেও সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ ১৬ জুন সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হয়। ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্টটি তৈরি হয়। এতে দেখা গেছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ৮৩৯০ কোটি টাকা। এরপর ১৭ জুলাই বিএফআইউ থেকে আবার চিঠি দিয়ে তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু এখনও এর কোনো জবাব মেলেনি। 

এদিকে বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন সুইস ব্যাংকে অর্থ জমাদানকারীদের তথ্য চাওয়া হয়েছিল কিনা। রোববারের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে এ তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। এর আগে বুধবার সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় বলেছেন, বাংলাদেশ অর্থ জমাকারীদের ব্যাপারে সুইজারল্যান্ডের কাছে কোনো তথ্য চায়নি। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন যুগান্তরকে বলেছেন, সুইস রাষ্ট্রদূত যে কথা বলেছেন-সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ কোনো তথ্য চায়নি, তা সঠিক নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিকবার তথ্য চেয়েছে। কিন্তু সুইস কর্তৃপক্ষ সেসব তথ্য দেয়নি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সুইস ব্যাংক হোক আর বিশ্বের অন্য কোনো ব্যাংকে গচ্ছিত টাকাই হোক-এগুলোর বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে গেছে, আরেকটি অংশ বিভিন্ন দেশ বা ওই দেশ থেকে অর্জিত অর্থ। এছাড়া দেশ থেকে প্রতিবছর টাকা পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশ থেকে বছরে গড়ে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।

গত বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। পাচার করা এসব টাকা ফেরত আনার বিষয়ে চলতি বাজেটে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার করা টাকা ফেরত আনলে কোনো সংস্থা থেকে প্রশ্ন করা হবে না। জানা গেছে, সুইস ব্যাংকে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের আলোকে সুইজারল্যান্ডের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অথরিটির কাছে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এখনো কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি। 

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পাচারের টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আগে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা হবে কিনা। এ সিদ্ধান্ত হলে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে আইনি কাঠামো আছে, তাতে টাকা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন কিছু নয়। তবে একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কারও টাকা ফিরিয়ে আনা হলে পরে আর কেউ টাকা পাচার করতে সাহস দেখাবে না। তিনি আরও বলেন, সুইস ব্যাংক এখন বিভিন্ন দেশকে তথ্য দিচ্ছে। এজন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তথ্য চাইতে হবে। তা না হলে তথ্য পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তাদের দেশের আইন অনুসরণ করে কোনো তথ্য চায়নি। ফলে তারা তথ্য দিচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সুইজারল্যান্ড থেকে পাচার করা টাকা ফেরাতে সেই দেশের ব্যাংকের আইনকানুন সম্পর্কে জানতে হবে। ওই আইনের ভিত্তিতে তাদের কাছে তথ্য চাইতে হবে। তথ্য পেতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো পরিপালন করতে হবে। তাহলেই শুধু তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কেননা সুইস ব্যাংক তাদের ব্যাংকিং আইনকানুন অনেক শিথিল করেছে। অনেক দেশকে তারা সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা উল্লেখযোগ্য। তারা আরও বলেছেন, সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলে ওইসব দেশ যে প্রক্রিয়ায় সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য পেয়েছে, সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ওইসব দেশে প্রতিনিধি দল পাঠাতে পারে।

সূত্র জানায়, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ১২ জুন লাটভিয়ার রিগায় বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্সের একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিএফআইইউর পরিচালক রফিকুল ইসলাম। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুইস ব্যাংকে জমা করা অর্থের মালিকদের তথ্য পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এগমন্ট গ্রুপের (বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী সংস্থা) বৈঠক চলাকালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ওই বৈঠকটি করেছিল বাংলাদেশ।
ওই বৈঠকের পর বাংলাদেশ এখন সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে মাঠে নেমেছে। ওইসব বিষয় পাওয়া গেলে আবার সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউর একজন কর্মকর্তা জানান, এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। এজন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে। যেসব ব্যক্তি সম্পর্কে বিএফআইইউ তথ্য পেয়েছে, এখন তাদের বিষয়ে উল্লিখিত তিনটি তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, সুইস ব্যাংক তাদের ব্যাংকের আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। আগে তারা কোনো তথ্যই দিত না। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে মানি লন্ডারিং আইন প্রয়োগ কঠোর হওয়ায় এবং বিশ্বব্যাপী কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ সুইস ব্যাংকে রাখা হচ্ছে-এমন প্রচারণার পর সুইস ব্যাংক তাদের দেশে ব্যাংকিং আইন শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কোস ও তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের পাচার করা অর্থ ছিল সুইস ব্যাংকে। মার্কোস সরকারের পতন হলে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। পরে ১৮ বছর মামলা চলার পর ফিলিপাইন ওইসব পাচার করা অর্থ ফেরত পায়। সূত্র জানায়, বিএফআইউ এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয় ২০১৩ সালের জুনে।

এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ৮ বছরে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট ৭৯টি দেশের সঙ্গে অর্থ পাচার, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নবিষয়ক তথ্য আদান-প্রদান করার জন্য দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ যেমন তথ্য দিচ্ছে, তেমনি তথ্য পাচ্ছেও। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে ২০১৪ সালের জুনে প্রথম চিঠি দেওয়া হয়। এরপর এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেনি। অথচ সুইজারল্যান্ড অনেক দেশের সঙ্গে তথ্য প্রদানের চুক্তি করেছে। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের অনেক সূচকের উন্নতি দেখা হয়। এর মধ্যে মানবাধিকারসহ আরও অনেক বিষয় আছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি কম। যে কারণে তারা চুক্তি করতে আগ্রহ দেখায়নি। তবে চুক্তি হলেও এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড দুটি দেশই ওই গ্রুপের সদস্য। এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে বিএফআইইউ সুইস এফআইইউর কাছে তথ্য চাইতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় এখন কিছু তথ্য পেয়েছে। চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায়ই তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন