অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা জরুরি
jugantor
সংকট উত্তরণে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ
অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা জরুরি

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১২ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার মন খারাপ করে হলেও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করছে, অর্থনীতি নিচের দিকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দায়ী করা হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকে। কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়। অনেক দেশ দক্ষতার সঙ্গে ভিন্নভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলেও বাংলাদেশ পারছে না। কারণ বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২ থেকে ৩ বছর মেয়াদি ‘অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা’ জরুরি। এখানে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা থাকবেন। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এসডিজিবিষয়ক নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বৃহস্পতিবার এসব কথা বলেন। ভার্চুয়ালি আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

তার মতে, কোনো সরকার যখন বলে, পরিস্থিতি কারণে আমরা তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি, এর মানে হলো একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে দরিদ্র সরকার বিরাজ করছে। জনগণের প্রয়োজনে সংকট মোকাবিলায় যার কোনো আর্থিক সংস্থান নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা চারদিকে সম্পদ খুঁজছে। গত এক দশকেও আর্থিক সংস্থান গড়ে তুলতে পারেনি। তিনি আজকের এ সংকটের আসল খলনায়ক ব্যাংক ও আর্থিক খাত। বহু আগে থেকেই আমরা সেটি বলে আসছি। এ খাতে সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এখন ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হলেও ২০২৪ সালের আগে এ সংকট কাটবে না। কিন্তু নীতি সমঝোতা তৈরি হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের অনেক বেশি শক্তি, সাহস ও দক্ষতা বাড়বে। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, সংকট উত্তরণে মোটাদাগে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো হলো-সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত বাড়ানো এবং অসুবিধাগ্রস্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সুরক্ষা দেওয়া।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজেটের আগে আমরা অর্থনীতির তিনটি দুর্বলতার কথা বলেছিলাম। এগুলো হলো-করোনা উত্তরণের কথা বলা হলেও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলো এখনও আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের চাপ। জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তৃতীয়ত বিশ্ব অর্থনীতি আগের অবস্থানে নেই। অর্থাৎ এখনও করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এরমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকট, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। এ সমস্যাগুলো বর্তমানে আরও তীব্র হয়েছে।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ৬টি চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। এগুলো হলো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু দুই মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। দ্বিতীয়ত ভর্তুকির জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের জন্য ভর্তুকি ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। এটা দিয়েও সামাল দেওয়া কঠিন। তৃতীয়ত, বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার বাড়ানো ও অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা। কিন্তু বৈদেশিক সহায়তার ব্যবহার বাড়েনি। অন্যদিকে ৮ মেগা প্রকল্পের কাজ ৫০ শতাংশ হয়নি। বাস্তবে এগুলো ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। চতুর্থ, শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ আনুপাতিক হারে কম। ব্যয়ও কম। দেশের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোতে জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০টি মেগা প্রকল্পে ব্যয় করা হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ। এছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মুদ্রা বিনিময়ের হারের চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ২ মাসে রিজার্ভ সাড়ে ৫ শতাংশ কমেছে। বতর্মানে কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার ১২০ টাকা পৌঁছেছে। অর্থাৎ বাজেট ঘোষণার পর গত ২ মাসে ৬টি চ্যালেঞ্জের ৫টি আরও বড় আকার ধারণ করেছে। প্রতিবছরই বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ৬০ শতাংশ বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে হয় উলটো। বছর শেষে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকার যে ঋণ নেয়, তা বেসরকারি খাতের চেয়ে বেশি।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, সরকার মনঃক্ষুণ্ন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত স্বীকার করছে, অর্থনীতি নিচের দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বলছে, করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বৈশ্বিক কারণে বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। এটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা। কারণ ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা অর্থনীতির ছিল না। ফুসফুসে সমস্যা ছিল। অনেক দেশ সংকট ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু যার ডায়বেটিস, কিডনি, ফুসফুস বা হার্টে সমস্যা ছিল, তিনি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে মারা গেছেন। অন্যদিকে যিনি সুস্থ-সবল ছিলেন, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি ছিল। যে কারণে তার কোনো সমস্যা হয়নি। বৈশ্বিক সংকটের বিষয়টি এ রকমই। যেসব দেশের সক্ষমতা ছিল, তাদের সমস্যা হয়নি। কিন্তু ধাক্কা সামলানোর মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির ছিল না। যে কারণে আমরা সংকটে পড়েছি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামলেও বাংলাদেশের সংকট ২০২৪ সালের আগে যাবে না। এ কারণে ২ থেকে ৩ বছরের পরিকল্পনা করতে হবে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমন উৎপাদনে বিশেষ নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের অবকাঠামো উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত নয়। ফলে এবার প্রবৃদ্ধি কমবে সেটি মেনে নিতে হবে। তবে সরকারের নির্দেশে আদিষ্ট হয়ে বিবিএস যদি ভিন্ন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করে সেটি আলাদা বিষয়।

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলছেন, বর্তমানে যে সংকট চলছে, এজন্য আসল খলনায়ক আর্থিক খাত। এরমধ্যে রয়েছে ব্যাংক এবং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দুই খাতে দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার না হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতায় যেতে হবে। এই সমঝোতা অংশগ্রহণ ও পরামর্শমূলক হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতের প্রতিনিধিরা থাকবেন। যারা পরিস্থিতি উত্তরণে কাজ করবেন। প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে দুর্যোগকালীন সময়ে এ ধরনের সমঝোতা হয়।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আগামীতে কোনো কোনো পণ্য আমদানি বন্ধ করা লাগতে পারে। এজন্য প্রস্তুত থাকবে হবে। শ্রমিকদের আয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য মহার্ঘ ভাতা চালু করা জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষিত বেকার যুবকদের নিবন্ধনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, এত টাকা কোথা থেকে আসবে। কিন্তু বিদেশি সহায়তা এবং কর আদায় বাড়লে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তিনি বলেন, যে সরকার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে পারে। মওকুফ করে দিতে পারে খেলাপি ঋণ। পুঁজিবাজার লুণ্ঠনকারীদের মাফ দিতে পারে, ওই সরকারের জন্য বেকারদের ভাতা দেওয়া কঠিন নয়। তার মতে, দেশে সরকার থাকলেই হবে না, দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর যে সব দেশে সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা আছে, ওই দেশে মানুষ কর দিতে আগ্রহী হন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে সংকট ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নীতিনির্ধারকরা বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছে। এর কারণ হলো, অনেক সিদ্ধান্তই উনারা জানেন না। সরকার নিজেদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করে না। ভালো কিংবা খারাপ যাই হোক বর্তমানে একটি সংসদ আছে। সেই সংসদে অনেক কিছু আলোচনা হয় না। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র আমলানির্ভর হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সরকারের ভেতরে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তারমতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত এবং অনভিপ্রেত। এক্ষেত্রে যদি আইএমএফ সাক্ষী গোপাল মেনে এ কাজ করা হয়, অর্থাৎ আইএমএফের অজুহাত সামনে আনা হয়, তবে তা সরকারের জন্য সম্মানজনক অবস্থান নয়।

সংকট উত্তরণে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ

অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা জরুরি

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১২ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার মন খারাপ করে হলেও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করছে, অর্থনীতি নিচের দিকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দায়ী করা হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকে। কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়। অনেক দেশ দক্ষতার সঙ্গে ভিন্নভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলেও বাংলাদেশ পারছে না। কারণ বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২ থেকে ৩ বছর মেয়াদি ‘অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা’ জরুরি। এখানে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা থাকবেন। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এসডিজিবিষয়ক নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বৃহস্পতিবার এসব কথা বলেন। ভার্চুয়ালি আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

তার মতে, কোনো সরকার যখন বলে, পরিস্থিতি কারণে আমরা তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি, এর মানে হলো একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে দরিদ্র সরকার বিরাজ করছে। জনগণের প্রয়োজনে সংকট মোকাবিলায় যার কোনো আর্থিক সংস্থান নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা চারদিকে সম্পদ খুঁজছে। গত এক দশকেও আর্থিক সংস্থান গড়ে তুলতে পারেনি। তিনি আজকের এ সংকটের আসল খলনায়ক ব্যাংক ও আর্থিক খাত। বহু আগে থেকেই আমরা সেটি বলে আসছি। এ খাতে সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এখন ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হলেও ২০২৪ সালের আগে এ সংকট কাটবে না। কিন্তু নীতি সমঝোতা তৈরি হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের অনেক বেশি শক্তি, সাহস ও দক্ষতা বাড়বে। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, সংকট উত্তরণে মোটাদাগে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো হলো-সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত বাড়ানো এবং অসুবিধাগ্রস্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সুরক্ষা দেওয়া।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজেটের আগে আমরা অর্থনীতির তিনটি দুর্বলতার কথা বলেছিলাম। এগুলো হলো-করোনা উত্তরণের কথা বলা হলেও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলো এখনও আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের চাপ। জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তৃতীয়ত বিশ্ব অর্থনীতি আগের অবস্থানে নেই। অর্থাৎ এখনও করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এরমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকট, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। এ সমস্যাগুলো বর্তমানে আরও তীব্র হয়েছে।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ৬টি চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। এগুলো হলো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু দুই মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। দ্বিতীয়ত ভর্তুকির জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের জন্য ভর্তুকি ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। এটা দিয়েও সামাল দেওয়া কঠিন। তৃতীয়ত, বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার বাড়ানো ও অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা। কিন্তু বৈদেশিক সহায়তার ব্যবহার বাড়েনি। অন্যদিকে ৮ মেগা প্রকল্পের কাজ ৫০ শতাংশ হয়নি। বাস্তবে এগুলো ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। চতুর্থ, শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ আনুপাতিক হারে কম। ব্যয়ও কম। দেশের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোতে জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০টি মেগা প্রকল্পে ব্যয় করা হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ। এছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মুদ্রা বিনিময়ের হারের চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ২ মাসে রিজার্ভ সাড়ে ৫ শতাংশ কমেছে। বতর্মানে কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার ১২০ টাকা পৌঁছেছে। অর্থাৎ বাজেট ঘোষণার পর গত ২ মাসে ৬টি চ্যালেঞ্জের ৫টি আরও বড় আকার ধারণ করেছে। প্রতিবছরই বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ৬০ শতাংশ বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে হয় উলটো। বছর শেষে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকার যে ঋণ নেয়, তা বেসরকারি খাতের চেয়ে বেশি।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, সরকার মনঃক্ষুণ্ন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত স্বীকার করছে, অর্থনীতি নিচের দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বলছে, করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বৈশ্বিক কারণে বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। এটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা। কারণ ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা অর্থনীতির ছিল না। ফুসফুসে সমস্যা ছিল। অনেক দেশ সংকট ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু যার ডায়বেটিস, কিডনি, ফুসফুস বা হার্টে সমস্যা ছিল, তিনি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে মারা গেছেন। অন্যদিকে যিনি সুস্থ-সবল ছিলেন, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি ছিল। যে কারণে তার কোনো সমস্যা হয়নি। বৈশ্বিক সংকটের বিষয়টি এ রকমই। যেসব দেশের সক্ষমতা ছিল, তাদের সমস্যা হয়নি। কিন্তু ধাক্কা সামলানোর মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির ছিল না। যে কারণে আমরা সংকটে পড়েছি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামলেও বাংলাদেশের সংকট ২০২৪ সালের আগে যাবে না। এ কারণে ২ থেকে ৩ বছরের পরিকল্পনা করতে হবে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমন উৎপাদনে বিশেষ নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের অবকাঠামো উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত নয়। ফলে এবার প্রবৃদ্ধি কমবে সেটি মেনে নিতে হবে। তবে সরকারের নির্দেশে আদিষ্ট হয়ে বিবিএস যদি ভিন্ন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করে সেটি আলাদা বিষয়।

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলছেন, বর্তমানে যে সংকট চলছে, এজন্য আসল খলনায়ক আর্থিক খাত। এরমধ্যে রয়েছে ব্যাংক এবং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দুই খাতে দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার না হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতায় যেতে হবে। এই সমঝোতা অংশগ্রহণ ও পরামর্শমূলক হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতের প্রতিনিধিরা থাকবেন। যারা পরিস্থিতি উত্তরণে কাজ করবেন। প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে দুর্যোগকালীন সময়ে এ ধরনের সমঝোতা হয়।

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আগামীতে কোনো কোনো পণ্য আমদানি বন্ধ করা লাগতে পারে। এজন্য প্রস্তুত থাকবে হবে। শ্রমিকদের আয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য মহার্ঘ ভাতা চালু করা জরুরি। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষিত বেকার যুবকদের নিবন্ধনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, এত টাকা কোথা থেকে আসবে। কিন্তু বিদেশি সহায়তা এবং কর আদায় বাড়লে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তিনি বলেন, যে সরকার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে পারে। মওকুফ করে দিতে পারে খেলাপি ঋণ। পুঁজিবাজার লুণ্ঠনকারীদের মাফ দিতে পারে, ওই সরকারের জন্য বেকারদের ভাতা দেওয়া কঠিন নয়। তার মতে, দেশে সরকার থাকলেই হবে না, দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর যে সব দেশে সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা আছে, ওই দেশে মানুষ কর দিতে আগ্রহী হন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে সংকট ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নীতিনির্ধারকরা বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছে। এর কারণ হলো, অনেক সিদ্ধান্তই উনারা জানেন না। সরকার নিজেদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করে না। ভালো কিংবা খারাপ যাই হোক বর্তমানে একটি সংসদ আছে। সেই সংসদে অনেক কিছু আলোচনা হয় না। নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র আমলানির্ভর হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সরকারের ভেতরে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তারমতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত এবং অনভিপ্রেত। এক্ষেত্রে যদি আইএমএফ সাক্ষী গোপাল মেনে এ কাজ করা হয়, অর্থাৎ আইএমএফের অজুহাত সামনে আনা হয়, তবে তা সরকারের জন্য সম্মানজনক অবস্থান নয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন