ছোট আগুনেও বড় ভয়
jugantor
ঝুঁকিতে পুরান ঢাকা
ছোট আগুনেও বড় ভয়

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ছোট আগুনেও বড় ভয়

সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং নানাভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ধরনের কারখানা পুরান ঢাকাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এতে সেখানে ছোট অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের ঘটনাও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই এলাকার অলিগলিতে গড়ে ওঠা রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো যেন একেকটি ‘সুপ্ত বোমা’। অসাবধান হলেই এগুলো ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করছে। বছরের পর বছর রাসায়নিক গুদাম ঘিরে অগ্নিদুর্ঘটনায় শত শত মানুষের প্রাণ গেছে। অথচ কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি আজও। বড় দুর্ঘটনার পর অবৈধ রাসায়নিক গুদামে লোক-দেখানো অভিযান চললেও কিছুদিন বাদেই তা আগের অবস্থায় ফিরছে। গুদামগুলো সরানোর বিষয়ে নানা উদ্যোগ সামনে এলেও তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এই অবস্থার মধ্যেই সোমবার চকবাজারের দেবী ঘাটে পলিথিন ও প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লেগে ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

পুরান ঢাকায় সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে। ওই বছর নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। তখন ওই এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরাতে নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কিছুদিন যেতেই সেই তৎপরতা থমকে যায়। এরপর থেকে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করতে থাকেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যেকোনো সময় ফের বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অবশেষে তাদের আশঙ্কাই সত্য হয়। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনার পরও পুরান ঢাকায় আগের মতোই চলছে রাসায়নিকের ব্যবসা। নানা সংস্থার অভিযানে বন্ধ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চুড়িহাট্টার ঘটনার পর এই ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। এজন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে অস্থায়ী গুদাম তৈরি করার কথা বলা হয়। অথচ এখন পর্যন্ত সেই অস্থায়ী গুদাম তৈরির কাজ শেষ হয়নি। আর রাসায়নিক শিল্পপল্লির মাটি ভরাটের কাজও শেষ হয়নি।

এদিকে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কর্তৃক ছয়টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এসব কমিটির সুপারিশের মধ্যে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়া এবং অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। জানা গেছে, কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা। নানা যুক্তি দেখিয়ে তারা সেখান থেকে কারখানা সরাতে চাচ্ছেন না। অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পকেট ভারী করার অভিযোগ রয়েছে তদারক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও।

নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশকিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, পরিকল্পিতভাবে কেমিক্যাল শিল্পজোন গড়ে তোলা। সেখানে পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়া। এর পাশাপাশি দাহ্য কেমিক্যাল আনা-নেওয়া বন্ধসহ সেখানে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা। কিন্তু এত বছরেও প্রধানমন্ত্রীর সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি।

চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিকের ব্যবসা সরিয়ে নিতে শিল্প মন্ত্রণালয় দুটি জায়গায় অস্থায়ী গুদাম তৈরির উদ্যোগ নেয়। জায়গা দুটি হলো শ্যামপুরের উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জমি ও টঙ্গীর কাঁঠালদিয়ায় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) জমি। এর মধ্যে ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে অস্থায়ী গুদাম তৈরির কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। অথচ কাজ এখনো চলছে। অন্যদিকে টঙ্গীতে বিএসইসির কাজের বড় অংশই এখনো শেষ হয়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল যুগান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে না বসে সারা বছর অব্যবস্থাগুলোর তদারকি প্রয়োজন। তাহলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। পুরান ঢাকায় বড় দুটি দুর্ঘটনার পর যেসব সুপারিশ এসেছে সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরি। যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করতে হবে। আর এখন যেসব অবৈধ গোডাউন ও কারখানা সেখানে রয়েছে সেগুলো কঠোর অভিযানের মাধ্যমে বন্ধ ও অপসারণ করতে হবে।

ঝুঁকিতে পুরান ঢাকা

ছোট আগুনেও বড় ভয়

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ছোট আগুনেও বড় ভয়
প্রতীকী ছবি

সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং নানাভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ধরনের কারখানা পুরান ঢাকাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এতে সেখানে ছোট অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের ঘটনাও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই এলাকার অলিগলিতে গড়ে ওঠা রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো যেন একেকটি ‘সুপ্ত বোমা’। অসাবধান হলেই এগুলো ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করছে। বছরের পর বছর রাসায়নিক গুদাম ঘিরে অগ্নিদুর্ঘটনায় শত শত মানুষের প্রাণ গেছে। অথচ কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি আজও। বড় দুর্ঘটনার পর অবৈধ রাসায়নিক গুদামে লোক-দেখানো অভিযান চললেও কিছুদিন বাদেই তা আগের অবস্থায় ফিরছে। গুদামগুলো সরানোর বিষয়ে নানা উদ্যোগ সামনে এলেও তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এই অবস্থার মধ্যেই সোমবার চকবাজারের দেবী ঘাটে পলিথিন ও প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লেগে ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

পুরান ঢাকায় সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে। ওই বছর নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। তখন ওই এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরাতে নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কিছুদিন যেতেই সেই তৎপরতা থমকে যায়। এরপর থেকে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করতে থাকেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যেকোনো সময় ফের বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অবশেষে তাদের আশঙ্কাই সত্য হয়। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনার পরও পুরান ঢাকায় আগের মতোই চলছে রাসায়নিকের ব্যবসা। নানা সংস্থার অভিযানে বন্ধ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চুড়িহাট্টার ঘটনার পর এই ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। এজন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে অস্থায়ী গুদাম তৈরি করার কথা বলা হয়। অথচ এখন পর্যন্ত সেই অস্থায়ী গুদাম তৈরির কাজ শেষ হয়নি। আর রাসায়নিক শিল্পপল্লির মাটি ভরাটের কাজও শেষ হয়নি।

এদিকে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কর্তৃক ছয়টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এসব কমিটির সুপারিশের মধ্যে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়া এবং অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। জানা গেছে, কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা। নানা যুক্তি দেখিয়ে তারা সেখান থেকে কারখানা সরাতে চাচ্ছেন না। অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পকেট ভারী করার অভিযোগ রয়েছে তদারক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও।

নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশকিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, পরিকল্পিতভাবে কেমিক্যাল শিল্পজোন গড়ে তোলা। সেখানে পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়া। এর পাশাপাশি দাহ্য কেমিক্যাল আনা-নেওয়া বন্ধসহ সেখানে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা। কিন্তু এত বছরেও প্রধানমন্ত্রীর সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি।

চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিকের ব্যবসা সরিয়ে নিতে শিল্প মন্ত্রণালয় দুটি জায়গায় অস্থায়ী গুদাম তৈরির উদ্যোগ নেয়। জায়গা দুটি হলো শ্যামপুরের উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জমি ও টঙ্গীর কাঁঠালদিয়ায় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) জমি। এর মধ্যে ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে অস্থায়ী গুদাম তৈরির কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। অথচ কাজ এখনো চলছে। অন্যদিকে টঙ্গীতে বিএসইসির কাজের বড় অংশই এখনো শেষ হয়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল যুগান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে না বসে সারা বছর অব্যবস্থাগুলোর তদারকি প্রয়োজন। তাহলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। পুরান ঢাকায় বড় দুটি দুর্ঘটনার পর যেসব সুপারিশ এসেছে সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরি। যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করতে হবে। আর এখন যেসব অবৈধ গোডাউন ও কারখানা সেখানে রয়েছে সেগুলো কঠোর অভিযানের মাধ্যমে বন্ধ ও অপসারণ করতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন