খালেদা জিয়াকে সিএমএইচে নেয়ার প্রস্তাব

নিজ খরচে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিতে পরিবারের চিঠি * একই দাবি বিএনপিরও * অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন না খালেদা জিয়া

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ছবি: যুগান্তর

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পরিবর্তে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়ার প্রস্তাব দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) যদি সেখানে (সিএমএইচ) যেতে চান, আমরা সেখান থেকেও তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে দিতে পারি। আমরা তার চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়েছি।’

তবে খালেদা জিয়াকে নিজ খরচে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানিয়েছে তার পরিবার। এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ওই আবেদন জানান খালেদা জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দার।

মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতর চিঠিটি গ্রহণ করেছে বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার, তার ভাতিজা ডা. মো. আল মামুন ও আমি সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠিটি পৌঁছে দিই।’

ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপিও। দলটি খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যয় বহন করার কথাও জানিয়েছে। আর খালেদা জিয়া অন্য কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চান না।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনকে মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) নেয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু তার অনীহার কারণে নেয়া যায়নি। কারাবিধিতে বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার সুযোগ না থাকায় তা পেতে হলে খালেদা জিয়াকে আবেদন করতে হবে।

এরপর দুপুরে খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিজ খরচে চিকিৎসা নেয়ার আবেদন নিয়ে বিএনপির প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যায়। সেই আবেদন পাওয়ার পর ইউনাইটেডের বদলে সিএমএইচ নেয়ার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল।

ইউনাইটেডকে বাদ দিয়ে কেন সিএমএইচ? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতালটির চেয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিএমএইচ অনেক সমৃদ্ধ। সেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও রয়েছেন। তাছাড়া সিএমএইচ অনেক ক্রাইসিস মোমেন্টে ভূমিকা রেখেছে। সেই বিবেচনায় আমরা সিএমএইচের প্রস্তাব দেব।’

কারা মহাপরিদর্শকের বক্তব্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া ইউনাইটেড ছাড়া অন্য কোথাও চিকিৎসা নিতে চান না, সেক্ষেত্রে কী হবে? আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আমরা মনে করি, তার সিএমএইচে যাওয়া উচিত। আমরা এখন তাকে প্রপোজালটা দেব। তিনি কী রিঅ্যাকশন দেন, সেটা আমরা দেখব।’

ইউনাইটেডে চিকিৎসার আবেদন বিবেচনার কোনো সুযোগ রয়েছে কি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটার কোনো যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। সিএমএইচে না যাওয়ার মতো যুক্তি আমার মনে হয় থাকতে পারে না।’ খালেদা জিয়া বা তার পরিবার সিএমএইচের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ‘সিচুয়েশন বুঝে’ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর চার মাস ধরে পুরান ঢাকার কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে রয়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে এপ্রিলের শুরুতে তাকে বিএসএমএমইউতে নিয়ে এক্সরে করানো হয়েছিল। ৫ জুন তিনি হঠাৎ করে কারাগারে ‘মাথা ঘুরে’ পড়ে যান।

এরপর তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে বিএনপি। তাকে দেখতে শনিবার কারাগারে যান ব্যক্তিগত চার চিকিৎসক। খালেদা জিয়ার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছে ধারণা করে তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়ার সুপারিশ করেন তারা।

শামীম ইস্কান্দার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখেছেন, ‘বর্তমানে আমার বড় বোন খালেদা জিয়াকে ঢাকাস্থ নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত।

কারা অভ্যন্তরে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে দীর্ঘ কারাবাসে তার শরীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছে। গত ৯ জুন কারাকর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কারা অভ্যন্তরে তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া ৫ জুন ‘মাইন্ড স্ট্রোকে’ আক্রান্ত হন।

ফলে ভবিষ্যতের জন্য এ ধরনের বিষয়ে বড় রকমের ঝুঁকির পূর্বাভাস বহন করছে। তাকে অনতিবিলম্বে ঢাকাস্থ বিশেষায়িত ‘ইউনাইটেড হাসপাতালে’ ভর্তিপূর্বক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রদান করা অতীব জরুরি।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘আমি (শামীম) এই মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করছি যে, তার এ ধরনের সব চিকিৎসা ব্যয় আমরা নিজ/পারিবারিকভাবে বহন করব। অতএব খালেদা জিয়াকে ঢাকাস্থ ‘ইউনাইটেড হাসপাতালে’ ভর্তিপূর্বক প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা প্রদানের অনুমতি প্রদানের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’ চিঠির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রত্যয়নপত্রও সংযুক্ত করা হয়।

অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা না নেয়ার সিদ্ধান্তে অনঢ় খালেদা জিয়া : কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন মঙ্গলবার সকালে পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি নিজে সোমবার তাকে কনভেন্স করার চেষ্টা করেছি।

আজ (মঙ্গলবার) অন্যরা গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে যাবেন বলে মত দিয়েছেন। তিনি যদি মত পরিবর্তন করেন, তাহলে বিএসএমএমইউতে নিয়ে যাওয়া হবে।’

বিএসএমএমইউ’র প্রতি খালেদা জিয়ার কোনো অনাস্থা আছে কি না, কেন যেতে চাচ্ছেন না? এমন প্রশ্নে আইজি প্রিজন্স বলেন, এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি। কারাবিধি অনুযায়ী হাই ইস্ট রেফারেল মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতাল হচ্ছে বিএসএমএমইউ। আমরা তাকে প্রথমে বিএসএমএমইউতে পাঠাতে পারি।

একই দাবি বিএনপির : মঙ্গলবার সকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যয় বহন করবে বিএনপি। তাই কালবিলম্ব না করে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির দাবি জানাচ্ছি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ।

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘৭৩ বছর বয়স্কা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে, তা যে কোনো সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলার মতো। খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপে ভুগছেন। তার দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে।

ফলে তাকে সবসময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

এ বিএনপি নেতা বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দু’বার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা এবং এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর দাবি করা হয়েছে। সে সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও আশ্বাস দেন। অথচ বাস্তবে কিছুই করা হয়নি।’

এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা আরও বেড়েছে দাবি করে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়ার কারণে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি তার অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তার উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে। সরকারকে এটা জানানোর পরও তার সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।’ তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হলে তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না।

সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের উদ্বেগ : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিয়ে সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের আচরণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ-বিএসপিপি।

সংগঠনটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান ও সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন যৌথ বিবৃতিতে অনতিবিলম্বে খালেদা জিয়াকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে সুচিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন বিএফইউজে সভাপতি সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজী, মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, সাবেক সভাপতি সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হক, ডিইউজের সভাপতি কাদের গণি চৌধুরী প্রমুখ।