হে আল্লাহ রোজাগুলো কবুল করে নিন

  হাফেজ মুফতি তানজিল আমির ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হে আল্লাহ রোজাগুলো কবুল করে নিন

পারস্পরিক সমবেদনার মাস রমজান। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মাসে বেশি বেশি দান-সাদকা করতেন। সিয়াম সাধনা শেষে আসে ঈদুল ফিতর। ঈদের আনন্দ ধনী-গরিব সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং এ আনন্দে যেন মুসলিম জাতির প্রতিটি সদস্য শরিক হতে পারে এ জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে সাদকাতুল ফিতর।

ধর্ম হিসেবে ইসলামের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল ইসলাম মানবতার ধর্ম। সাদা-কালো, ধনী-গরিব, আরব-আজমের ব্যবধান ঘুচিয়ে ইসলামে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে মানবতাকে। আর্থিক সচ্ছলতার কারণে ধনীরা নিজেদের সম্পদ নিয়ে আরাম-আয়েশে থাকবে, আর অসচ্ছল পরিবারগুলো ভাগ্যবিড়ম্বনায় ভুগবে, সমাজের ভারসাম্যহীন এমন অবস্থা ইসলাম দেখতে চায় না।

আল্লাহতায়ালা রাসূল (সা.)-কে আদেশ দিয়ে বলছেন- ‘আপনি তাদের ধনসম্পদ থেকে সাদকা গ্রহণ করুন, যা দিয়ে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে দেবেন’। [সূরা তওবা : ১২৩]। সচ্ছল ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ করা হয়েছে। নেসাব পরিমাণ সম্পদের বর্ষপূর্তি হলে তার জাকাত আদায় করতে হয়। কিন্তু যাদের জাকাত ফরজ হয় না, তবে তারা অসচ্ছলও নয়, তাদের সম্পদ কীভাবে দরিদ্রদের উপকারে আসবে? তাই মোটামুটি সচ্ছল সবার ওপর সাদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে।

রমজানের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিপূর্ণতার জন্যই আবশ্যক করা হয়েছে এটি। ইমাম ওয়াকি ইবনুল জাররাহ বলেন, রমজান মাসের জাকাতুল ফিতর নামাজের সিজদায়ে সাহুর সমতুল্য। অর্থাৎ নামাজে ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে যেমন সিজদায়ে সাহু দিলে এটা পূর্ণ হয়ে যায় তেমনি রোজার মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে সাদকাতুল ফিতর দিয়ে এর প্রতিকার হয়। তাছাড়া ধনী-গরিব উভয়ে যেন অন্তত ঈদের দিন উত্তম পোশাক ও উন্নতমানের খাবার খেতে পারে এ জন্যই ফিতরার ব্যবস্থা।

আল্লাহ জানেন তার দুর্বল বান্দা পূর্ণভাবে রোজার হক আদায় করতে পারবে না। তাই তার রোজাগুলো সঠিক হিসেবে গণ্য করার জন্য সম্পূরক ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। আবার এতে উপকার হচ্ছে সমাজের অসচ্ছল পরিবারগুলোর। ঈদের দিন সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তিটির ঘরও যেন আনন্দে ভেসে যায়, ধনী-গরিব সবাই মিলেমিশে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার এক ইনসাফি পরিবেশ গড়ে ওঠে এটিই ফিতরার মূল প্রেরণা।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) ফিতরা আবশ্যক করেছেন। যা রোজাদারের জন্য অহেতুক কথাবার্তা এবং অশ্লীল কর্মকাণ্ডের পবিত্রতা স্বরূপ। আর এটা গরিব মিসকিনদের আহার। অতএব, যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করল, সেটা আল্লাহর কাছে গৃহীত সাদকা হিসেবে বিবেচিত হল। আর যে নামাজের পর আদায় করল সেটা অন্যান্য সাদকার মতোই হল [ইবনে মাজাহ]।

জাকাতের জন্য সম্পদের বর্ষপূর্তি শর্ত হলেও ফিতরায় এ শর্ত নেই। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নিজের পক্ষ থেকে, নিজের প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে এবং নিজের সেবক-সেবিকাদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে। সন্তান বা অধীনস্থরা অমুসলিম হলেও তাদের ফিতরা আদায় করা আবশ্যক।

রাসূল (সা.) বারবার বলেছেন- ‘যার সক্ষমতা রয়েছে, অথচ সে ফিতরা আদায় করল না; সে যেন ঈদগাহে না আসে। গরিবের জন্য যার দরজা সংকুচিত, সে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের ক্ষতি করল।’ গম বা আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনির- এ পাঁচটি জিনিস বা তার মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। সামর্থ্যানুসারে সবার উচিত উৎকৃষ্ট জিনিস সাদকা করা। রাসূল (সা.)-এর সময়ে সামর্থ্যানুযায়ী সবাই উত্তম পণ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমরা সাদকায়ে ফিতর আদায় করতাম এক ‘সা’ খাদ্য দিয়ে অথবা এক ‘সা’ যব অথবা এক ‘সা’ খেজুর, কিংবা পনির বা এক ‘সা’ কিশমিশ দিয়ে। আর এক ‘সা’-এর ওজন ছিল নবী করিম (সা.)-এর ‘সা’ অনুযায়ী। [মুয়াত্তা মালেক]।

সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, দাতার কাছে যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি। [বুখারি]। ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা অদ্ভুত মানসিকার পরিচয় দেই। আমাদের সমাজে কোটিপতি হতে নিুমধ্যবর্তী সবাই ৬০-৭০ টাকা দিয়েই দায়মুক্ত হতে চাই। সবচেয়ে কম মূল্যের গমের হিসাবে সবাই সাদকা করি। বিষয়টি রাসূল (সা.)-এর শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হিসাবমতে, সর্বনিু ৭০ থেকে ৫০০, ১৩২০, ১৯৮০, ২৩১০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা যাবে। তাই সামর্থ্যানুযায়ী বেশি মূল্যের পণ্য দিয়ে ফিতরা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।

রমজানের একবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি আমরা। এ মাসের সমাপনী আমল হল সাদকাতুল ফিতর। দৈহিক ও আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে অর্থনৈতিক এ আমলও পূর্ণ করতে হবে। তারপর আসবে ঈদের উৎসব। মুসলমানদের ঈদ নিছক একটি উৎসবই শুধু নয়, এটি ত্যাগে ভাস্বর, অংশীদারিত্ব ও সম্প্রীতির মহিমায় মহিমান্বিত। আল্লাহতায়ালা সব রোজাদারকে সাদকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে রোজার সব ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন। এ জীবনে বারবার ফিরে পেতে চাই রমজান। হে আল্লাহ আমাদের রোজাগুলো কবুল করে নিন।

লেখক : তরুণ আলেম ও গণমাধ্যমকর্মী

ই-মেইল : [email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter