প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা চারজন
jugantor
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড
প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা চারজন

  মুসতাক আহমদ ঢাকা, আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষার দুদিন আগে থানার ট্রেজারিতে চারজনের একটি দল প্রশ্নপত্র বাছাই (সর্টিং) করেন। তখনই প্রশ্নফাঁসের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এই চারজনের যোগসাজশে প্যাকেট প্রস্তুত করা হয়। সেই প্যাকেটে করেই প্রশ্ন ট্রেজারির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই চারজনই প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা। এদের সহযোগিতায় আছেন আরও অনেকে। তবে ফাঁস করা সব প্রশ্ন একদিন না একাধিক দিনে বের করা হয়েছে-সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে এই তথ্য জানা গেছে।

এদিকে কেন্দ্র সচিবের মাধ্যমে ফাঁসের ঘটনায় প্রশ্নের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রশ্নের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন ওই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মা। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বুধবারই তাকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শোকজ করেছেন। ডিসি মোহাম্মদ রেজাউল করিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে বিষয়টি শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের এই ঘটনা শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো সরেজমিন তদন্ত চালায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটি। এই দুই দিন তারা ইউএনও, সংশ্লিষ্ট দুই ট্যাগ (কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত) অফিসার, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছে। এছাড়া থানার ট্রেজারি এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্র নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে বলে জানা গেছে।

ভুরুঙ্গামারির এই ঘটনার পরে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে কেন্দ্রে নেওয়া পর্যন্ত ৬টি স্তর আছে। এগুলোর মধ্যে এতদিন ৫টি স্তর নিয়ে সংশয় ছিল। সেগুলো সুরক্ষার পদক্ষেপ নেওয়ায় ৪ বছর ধরে প্রশ্নফাঁসের কোনো অভিযোগ উঠেনি। ওই স্তরগুলো হচ্ছে-প্রশ্ন তৈরি, মডারেশন, বিজি প্রেসে মুদ্রণ, জেলায় পরিবহণ, ট্রেজারি থেকে কেন্দ্রে নেওয়া। ষষ্ঠটি হচ্ছে, ট্রেজারিতে বাছাই। সবচেয়ে সুরক্ষিত ছিল থানার এই ট্রেজারি। কিন্তু সেখান থেকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি পরীক্ষার কেন্দ্রসচিব ঘটালেন ভয়ানক ঘটনা। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা পরস্পর যোগসাজশে ঘটিয়েছেন নাকি তাদের অবহেলা ছিল-এখন সেটি জোর দিয়ে তদন্ত চলছে। পাশাপাশি চলছে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজ।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক তপন কুমার সরকার যুগান্তরকে বলেন, অনেক চেষ্টার পর বিভিন্ন পর্যায়ের ফাঁকফোকর বন্ধ করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে আস্থার জায়গাই এখন কাঠগড়ায়। তাই নিরাপত্তা নিয়ে এখন নতুন ভাবনা ভাবতে হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষার আগেই এ বিষয়ে নতুন পদক্ষেপ আসতে পারে।

প্রশ্নফাঁসের তিন সদস্যের ওই কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন দিনাজপুর বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ফারাজউদ্দিন তালুকদার। কমিটির সদস্য এবং বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. হারুনুর রশিদ মণ্ডল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তারা তখনও ভুরুঙ্গামারিতে অবস্থান করছেন। পরীক্ষার দুদিন আগে প্রশ্নপত্রের ফয়েল খাম পরীক্ষার বিষয় অনুযায়ী বাছাই করে অপর নিরাপত্তা খামে রাখা হয়। এ কাজে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তাদের উপস্থিতিতেই বাছাই কাজ হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে নেওয়ার কাজে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তারাই কাজটি সম্পন্ন করেছেন। যেহেতু তদন্ত কাজ শেষ হয়নি, তাই এখনই কোথা থেকে কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে তা বলা যাচ্ছে না।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র বাছাই করার সময়ে তিন শিক্ষক এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নাম আবদুর রহমান। আর তিন শিক্ষক হলেন, কেন্দ্র সচিব ও নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান এবং একই বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক সোহেল আল মামুন ও মো. জুবাইর হোসেন। প্রশ্নপত্র বাছাইয়ের সময়েই বাংলা প্রথমপত্রের সিকিউরিটি খামের ভেতরে আরও নয় বিষয়ের প্রশ্নের একটি করে খাম রাখা হয়, যা ফয়েল পেপারে মোড়ানো ছিল।

১৫ সেপ্টেম্বর ছিল বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষা। সেদিন ওই বিষয়ের প্রশ্নের খামে করে থানা থেকে বাকি বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রশ্নপত্র পরিবহণের দায়িত্বে ছিলেন তিনজন। তারা হলেন-সংশ্লিষ্ট ট্যাগ (দায়িত্বপ্রাপ্ত) অফিসার, নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সচিব এবং পুলিশের একজন সদস্য। এই কেন্দ্রে উপজেলা প্রশাসনের নিযুক্ত ট্যাগ অফিসার। এবারে প্রশাসন দুইজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে। তারা হলেন, মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রায়হান হক।

ভুরুঙ্গামারি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, প্রশ্নপত্র থানায় মহিলা হাজতখানার কাছে রাখা হয়েছিল। পুলিশের কাউকে প্রশ্ন বাছাই কমিটিতে রাখা হয়নি। তাই তাদের কেউ সেখানে ছিলেন না। কমিটির সদস্যরাই সব জানেন। আর ট্রেজারির ওই অংশে কোনো সিসিটিভি নেই। তাই সেখানে আসলে কী ঘটেছে তা বলা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, তাদের কাজ শুধু পরীক্ষার দিন প্রশ্ন পাহারা দিয়ে কমিটির সঙ্গে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া। তারা সেই কাজে যুক্ত ছিলেন।

জানা গেছে, আগে থেকেই ইউএনও উপজেলায় অবস্থিত ৬টি কেন্দ্রের জন্য ১২ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেন। আর প্রশ্নপত্র বাছাইয়ের কাজ দেন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র সচিবসহ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রহমানকে। ৬টির মধ্যে নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন বাছাইয়ের পর বিষয়ভিত্তিক সিকিউরিটি খামের ওপর ওই কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান এবং এ কাজে ইউএনওর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তা আব্দুর রহমান স্বাক্ষর দিয়েছেন। যেখানে প্রশ্নপত্রের খাম বাছাই করা হয় সেটি থানার ছোট গারদ।

সুতরাং শিক্ষা কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া ওই অল্প জায়গায় আগাম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বাংলা প্রথমপত্রের প্যাকেটে রাখা বা বের করে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত বাংলা প্রথমপত্রের প্যাকেটের মধ্যে বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ঢুকিয়ে বাইরে আনার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই প্যাকেটের ওপরই স্বাক্ষর আছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। বাকি ৬ বিষয়ের প্রশ্নপত্র কবে কোন প্যাকেটে বের করে নেওয়া হয়েছে সেটি অবশ্য এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি।

ভুরুঙ্গামারি প্রতিনিধি জানান, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা প্রথমে সাংবাদিকদের নজরে আসে ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষার দিন। মাইদুল ইসলাম মুকুল নামের স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষকের কাছে কয়েকজন পরীক্ষার্থী হাতে লেখা একটি সাজেশন সমাধানের জন্য যায়। পরে দেখেন সেই সাজেশনের প্রশ্নগুলো পরীক্ষায় এসেছে। এরপর একইভাবে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের কথিত সাজেশন নিয়েও আসে কয়েক পরীক্ষার্থী। সেটিও মিলে যায়। এরপরই বিষয়টি ওই শিক্ষক স্থানীয় প্রেস ক্লাবে আলাপ করলে সাংবাদিকরা সেটি প্রশাসনের নজরে দেন। একইসঙ্গে তারা বাংলা দ্বিতীয়পত্রের ব্যাপারেও খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, ওই শিক্ষার্থীরা একইভাবে সাজেশন পেয়েছে।

এই প্রতিনিধি আরও জানান, প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব কোনো কোচিং সেন্টার নেই। অর্থ উপার্জনের জন্যই প্রশ্নফাঁস করা হয়েছে। কেননা, নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার ৯৩ ছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে। তবে তাদের সবাইকে সাজেশনের নামে ফাঁস করা প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়নি। যারা ১৫-২০ হাজার টাকা করে দিতে রাজি হয়েছে শুধু তারাই সেটি পেয়েছে।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড

প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা চারজন

 মুসতাক আহমদ ঢাকা, আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষার দুদিন আগে থানার ট্রেজারিতে চারজনের একটি দল প্রশ্নপত্র বাছাই (সর্টিং) করেন। তখনই প্রশ্নফাঁসের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এই চারজনের যোগসাজশে প্যাকেট প্রস্তুত করা হয়। সেই প্যাকেটে করেই প্রশ্ন ট্রেজারির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই চারজনই প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা। এদের সহযোগিতায় আছেন আরও অনেকে। তবে ফাঁস করা সব প্রশ্ন একদিন না একাধিক দিনে বের করা হয়েছে-সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে এই তথ্য জানা গেছে।

এদিকে কেন্দ্র সচিবের মাধ্যমে ফাঁসের ঘটনায় প্রশ্নের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রশ্নের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন ওই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মা। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বুধবারই তাকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শোকজ করেছেন। ডিসি মোহাম্মদ রেজাউল করিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে বিষয়টি শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের এই ঘটনা শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো সরেজমিন তদন্ত চালায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটি। এই দুই দিন তারা ইউএনও, সংশ্লিষ্ট দুই ট্যাগ (কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত) অফিসার, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছে। এছাড়া থানার ট্রেজারি এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্র নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে বলে জানা গেছে।

ভুরুঙ্গামারির এই ঘটনার পরে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে কেন্দ্রে নেওয়া পর্যন্ত ৬টি স্তর আছে। এগুলোর মধ্যে এতদিন ৫টি স্তর নিয়ে সংশয় ছিল। সেগুলো সুরক্ষার পদক্ষেপ নেওয়ায় ৪ বছর ধরে প্রশ্নফাঁসের কোনো অভিযোগ উঠেনি। ওই স্তরগুলো হচ্ছে-প্রশ্ন তৈরি, মডারেশন, বিজি প্রেসে মুদ্রণ, জেলায় পরিবহণ, ট্রেজারি থেকে কেন্দ্রে নেওয়া। ষষ্ঠটি হচ্ছে, ট্রেজারিতে বাছাই। সবচেয়ে সুরক্ষিত ছিল থানার এই ট্রেজারি। কিন্তু সেখান থেকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি পরীক্ষার কেন্দ্রসচিব ঘটালেন ভয়ানক ঘটনা। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা পরস্পর যোগসাজশে ঘটিয়েছেন নাকি তাদের অবহেলা ছিল-এখন সেটি জোর দিয়ে তদন্ত চলছে। পাশাপাশি চলছে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজ।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক তপন কুমার সরকার যুগান্তরকে বলেন, অনেক চেষ্টার পর বিভিন্ন পর্যায়ের ফাঁকফোকর বন্ধ করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে আস্থার জায়গাই এখন কাঠগড়ায়। তাই নিরাপত্তা নিয়ে এখন নতুন ভাবনা ভাবতে হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষার আগেই এ বিষয়ে নতুন পদক্ষেপ আসতে পারে।

প্রশ্নফাঁসের তিন সদস্যের ওই কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন দিনাজপুর বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক ফারাজউদ্দিন তালুকদার। কমিটির সদস্য এবং বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. হারুনুর রশিদ মণ্ডল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তারা তখনও ভুরুঙ্গামারিতে অবস্থান করছেন। পরীক্ষার দুদিন আগে প্রশ্নপত্রের ফয়েল খাম পরীক্ষার বিষয় অনুযায়ী বাছাই করে অপর নিরাপত্তা খামে রাখা হয়। এ কাজে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তাদের উপস্থিতিতেই বাছাই কাজ হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে নেওয়ার কাজে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তারাই কাজটি সম্পন্ন করেছেন। যেহেতু তদন্ত কাজ শেষ হয়নি, তাই এখনই কোথা থেকে কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে তা বলা যাচ্ছে না।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র বাছাই করার সময়ে তিন শিক্ষক এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নাম আবদুর রহমান। আর তিন শিক্ষক হলেন, কেন্দ্র সচিব ও নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান এবং একই বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক সোহেল আল মামুন ও মো. জুবাইর হোসেন। প্রশ্নপত্র বাছাইয়ের সময়েই বাংলা প্রথমপত্রের সিকিউরিটি খামের ভেতরে আরও নয় বিষয়ের প্রশ্নের একটি করে খাম রাখা হয়, যা ফয়েল পেপারে মোড়ানো ছিল।

১৫ সেপ্টেম্বর ছিল বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষা। সেদিন ওই বিষয়ের প্রশ্নের খামে করে থানা থেকে বাকি বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রশ্নপত্র পরিবহণের দায়িত্বে ছিলেন তিনজন। তারা হলেন-সংশ্লিষ্ট ট্যাগ (দায়িত্বপ্রাপ্ত) অফিসার, নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সচিব এবং পুলিশের একজন সদস্য। এই কেন্দ্রে উপজেলা প্রশাসনের নিযুক্ত ট্যাগ অফিসার। এবারে প্রশাসন দুইজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে। তারা হলেন, মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা রায়হান হক।

ভুরুঙ্গামারি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, প্রশ্নপত্র থানায় মহিলা হাজতখানার কাছে রাখা হয়েছিল। পুলিশের কাউকে প্রশ্ন বাছাই কমিটিতে রাখা হয়নি। তাই তাদের কেউ সেখানে ছিলেন না। কমিটির সদস্যরাই সব জানেন। আর ট্রেজারির ওই অংশে কোনো সিসিটিভি নেই। তাই সেখানে আসলে কী ঘটেছে তা বলা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, তাদের কাজ শুধু পরীক্ষার দিন প্রশ্ন পাহারা দিয়ে কমিটির সঙ্গে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া। তারা সেই কাজে যুক্ত ছিলেন।

জানা গেছে, আগে থেকেই ইউএনও উপজেলায় অবস্থিত ৬টি কেন্দ্রের জন্য ১২ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেন। আর প্রশ্নপত্র বাছাইয়ের কাজ দেন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র সচিবসহ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রহমানকে। ৬টির মধ্যে নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন বাছাইয়ের পর বিষয়ভিত্তিক সিকিউরিটি খামের ওপর ওই কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান এবং এ কাজে ইউএনওর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তা আব্দুর রহমান স্বাক্ষর দিয়েছেন। যেখানে প্রশ্নপত্রের খাম বাছাই করা হয় সেটি থানার ছোট গারদ।

সুতরাং শিক্ষা কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া ওই অল্প জায়গায় আগাম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বাংলা প্রথমপত্রের প্যাকেটে রাখা বা বের করে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত বাংলা প্রথমপত্রের প্যাকেটের মধ্যে বাংলা দ্বিতীয় পত্র এবং ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ঢুকিয়ে বাইরে আনার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই প্যাকেটের ওপরই স্বাক্ষর আছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। বাকি ৬ বিষয়ের প্রশ্নপত্র কবে কোন প্যাকেটে বের করে নেওয়া হয়েছে সেটি অবশ্য এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি।

ভুরুঙ্গামারি প্রতিনিধি জানান, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা প্রথমে সাংবাদিকদের নজরে আসে ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষার দিন। মাইদুল ইসলাম মুকুল নামের স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষকের কাছে কয়েকজন পরীক্ষার্থী হাতে লেখা একটি সাজেশন সমাধানের জন্য যায়। পরে দেখেন সেই সাজেশনের প্রশ্নগুলো পরীক্ষায় এসেছে। এরপর একইভাবে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের কথিত সাজেশন নিয়েও আসে কয়েক পরীক্ষার্থী। সেটিও মিলে যায়। এরপরই বিষয়টি ওই শিক্ষক স্থানীয় প্রেস ক্লাবে আলাপ করলে সাংবাদিকরা সেটি প্রশাসনের নজরে দেন। একইসঙ্গে তারা বাংলা দ্বিতীয়পত্রের ব্যাপারেও খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, ওই শিক্ষার্থীরা একইভাবে সাজেশন পেয়েছে।

এই প্রতিনিধি আরও জানান, প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব কোনো কোচিং সেন্টার নেই। অর্থ উপার্জনের জন্যই প্রশ্নফাঁস করা হয়েছে। কেননা, নেহাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার ৯৩ ছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে। তবে তাদের সবাইকে সাজেশনের নামে ফাঁস করা প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়নি। যারা ১৫-২০ হাজার টাকা করে দিতে রাজি হয়েছে শুধু তারাই সেটি পেয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন