মহালয়ার আনন্দে বিষাদের সুর
jugantor
পঞ্চগড়ে দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে নৌকাডুবি : ২৫ জনের প্রাণহানি
মহালয়ার আনন্দে বিষাদের সুর
বিকল হয়ে পড়ে শ্যালোচালিত নৌকার ইঞ্জিন; প্রচণ্ড স্রোতে হারায় ভারসাম্য; তলিয়ে যায় করতোয়া নদীতে * আলো স্বল্পতায় বিঘ্নিত উদ্ধারকাজ, নিখোঁজ অর্ধশতাধিক, আউলিয়ার ঘাটে শোকের মাতম

  যুগান্তর প্রতিবেদন, রংপুর ব্যুরো ও পঞ্চগড় প্রতিনিধি  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীর শরতের আকাশে ছিল মেঘের ঘনঘটা। তবুও মা দুর্গার আগমনি বার্তায় চারদিকে আনন্দধ্বনি। এসেছে মহালয়া। শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন যাচ্ছেন বদেশ্বরী মন্দিরে। মহালয়ায় প্রতিবছর সেখানে অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়। বড়শশী ইউনিয়নের ওই মন্দিরে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে করতোয়া নদী। এজন্য সবাই জড়ো হয়েছেন আউলিয়ার ঘাটে। নতুন পোশাক আর রঙিন সাজ নিয়ে শতাধিক মানুষ ওঠেন শ্যালোচালিত নৌকায়। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘাট
থেকে ছেড়ে কিছু দূরে যেতেই বিকল হয়ে যায় নৌকার মেশিন। নদীর তীব্র স্রোতের মধ্যে দুলতে শুরু করে নৌকা। একজন কিনারা থেকে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন, ‘মাঝি...সাবধান’। এর তিন সেকেন্ডের মধ্যেই ভারসাম্য হারায় ছোট্ট নৌযান। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী নেওয়া নৌকাটি নিমিষেই তলিয়ে যায় পানিতে। মুহূর্তেই আনন্দ রূপ নেয় বিষাদে। শুরু হয় মানুষের গগনবিদারী চিৎকার। কিনারা থেকে অন্য মাঝিরাও ছুটে যান পুণ্যার্থীদের উদ্ধারে। এর আগেই পানিতে ডুবে যান অনেকে। একে একে ২৫টি তাজা প্রাণ হয়ে যায় লাশ। নিখোঁজ হন আরও অর্ধশতাধিক। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে মর্মান্তিক এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ৯টায় এ খবর লেখা পর্যন্ত যে ২৫ জনের লাশ উদ্ধার হয় তার মধ্যে ৮ জন শিশু, ১২ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। মরদেহগুলো নৌকাডুবির ঘটনাস্থল থেকে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার ভাটিতে পাওয়া যায়। রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও বোদা উপজেলার ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল তখনও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখে। সন্ধ্যার পর আলোর স্বল্পতার কারণে উদ্ধারকাজ পরিচালনায় বেগ পেতে হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক জসিম উদ্দিন। এর মধ্যেও রংপুর বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে বলে জানায় স্থানীয়রা।
এদিকে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও যুক্তরাষ্ট্রে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের বিদেহী আত্মার চির শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে মরদেহ সৎকারের জন্য ২০ হাজার করে টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালু করা হয়েছে একটি তথ্যকেন্দ্র। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে চারপাশ। সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয় মানুষের মৃতদেহ খুঁজতে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন স্বজনরা।
দুর্ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী ও নৌকা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, বদেশ্বরী মন্দিরে প্রতিবছরই মহালয়া উপলক্ষ্যে অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়। আশপাশের প্রায় সব জেলা থেকে প্রচুর পুণ্যার্থী সেখানে যান। সেকারণে নৌকাটিতে মাড়েয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ছাড়াও অন্যান্য এলাকা থেকেও কিছু মানুষ উঠেছিল। শ্যালোচালিত নৌকাটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো। কিন্তু সেখানে শতাধিক যাত্রী নিয়ে নৌকাটি যাত্রা শুরু করে। নদীতে পানির স্রোত ছিল অনেক বেশি। ফলে বিকট শব্দে নৌকার মেশিনের ফিতা ছিঁড়ে যায়। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যাত্রীরা। এরই মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে নদীর মাঝ পথে ডুবে যায় নৌকাটি।
স্থানীয় রফিকুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকাটি নদীর মাঝে ডুবে গেলে যাত্রীরা চিৎকার শুরু করে। তখন নদীর পাড়ের লোকজন গিয়ে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। অপর প্রত্যক্ষদর্শী আ. হান্নান জানান, ডুবে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই সাঁতরে তীরে উঠে আসে। অনেকে আবার তলিয়ে যায়। তলিয়ে যাওয়া কয়েকজনকেও স্থানীয়রা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে উদ্ধার অভিযানের পরও অর্ধশতাধিক নৌকাযাত্রী নিখোঁজ আছেন বলে জানিয়েছেন মাড়েয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল ইসলাম।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত দুদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে গেছে। এ কারণে প্রচণ্ড সে াতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। নৌকাডুবির পর পুরুষরা অনেকেই সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। কিন্তু নারী ও শিশুরা ডুবে যায়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ দুর্ঘটনায় শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। আর যেগুলোর পরিচয় মেলেনি, তাদের পরিচয় নিশ্চিতের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথৈ আদিত্যকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিহত ও নিখোঁজদের সিংহভাগই বোদা, ছত্র শিকারপুর, হাতিডোবা, মদনহার, আলোকপাড়া, কমলাপুকুরি, কুমারপাড়া, পাঁচপীর, মাড়েয়া, ব্যাঙহারি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। উদ্ধারের পর মরদেহগুলো শনাক্তের জন্য নদীর পাড়ে রাখা হয়। কিছু মরদেহ নেওয়া হয় বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পঞ্চগড় পুলিশ সুপার এসএম সিরাজুল হুদা জানান, কতজন নিখোঁজ আছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদে জরুরি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। যে কোনো প্রয়োজনে ০১৭০৮-৩৯৭৭১৮ ও ০১৭১৯-৩৪৭১৭৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছে জেলা প্রশাসন।
মারা গেছেন যারা : মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ফুটকিবাড়ি গ্রামের হেমন্ত কুমারের মেয়ে শ্যামলী রানী কলি (১৪), মাড়েয়া বামনপাড়ার নির্মল চন্দ্রের স্ত্রী শোভা রানী (২৭), সনজীব রায়ের আড়াই বছরের ছেলে প্রীয়ন্ত রায়, বামনহাট গ্রামের রমেশ চন্দ্র রায়ের স্ত্রী শিমলী রানী (৩৫), শিকারপুর ফুটকি বাড়ির বাসু দেবের স্ত্রী রুপালী রানী (৩৫), তেলীপাড়া শালডাঙ্গার কালী চন্দ্রনাথ বর্মণের স্ত্রী ধন বালা (৬০), বংশীধর পুজারী গ্রামের রমেশ চন্দ্রের স্ত্রী সুনিতা রানী (৬০), একই গ্রামের চুড়া মোহনের স্ত্রী সনেকা রানী (৬০), ময়দান দিঘি চকপাড়া গ্রামের বিলাশ চন্দ্রের স্ত্রী সফলতা রানী (৪০), সাকোয়া শকিরপুর প্রধানপাড়া গ্রামের মধু চন্দ্র বর্মণের স্ত্রী ফালগুনী বর্মণ (৪৫), জয় নন্দা বারুয়াপাড়া গ্রামের মহোনী মোহন রায়ের স্ত্রী প্রমিলা দেবী (৭০), চন্দনবাড়ি হিন্দু প্রধানপাড়া গ্রামের সতেন্দ্রনাথের ছেলে যতীশ চন্দ্র (৫৫), বড়শশি কুমারপাড়া গ্রামের আহমদ আলীর ছেলে হাসেম আলী (৭০), কমলা পুকুরী মাড়েয়া গ্রামের অবিরাম চন্দ্রের ছেলে বিলাশ চন্দ্র (৪৫), বোদা আলোকপাড়া গ্রামের রমেশ চন্দ্রের মেয়ে উর্বশী (৮), মদনহার গ্রামের শ্রী রতন চন্দ্রের মেয়ে শ্রেয়শ্রী (৩), দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা হাতিডোবা শ্রী কার্তিকের মেয়ে লক্ষ্মী রানী (২৫), একই গ্রামের বাবুল চন্দ্র রায়ের ছেলে দিপংকর রায় (৩), লক্ষ্মীরপুর ডাঙ্গাপাড়ার চণ্ডী প্রসাদের স্ত্রী প্রমিলা রানী (৫৫), একই উপজেলার মধ্য শিকারপুর গ্রামের বানী কান্ত রায়ের ছেলে অমল চন্দ্র (৩৫), ছত্র শিকারপুর হাতিডোবা গ্রামের শ্রী রবিন চন্দ্রের স্ত্রী তারা রানী (২৪), একই গ্রামের নারায়ণ চন্দ্রের মেয়ে প্রিয়ন্ত্রী (৮) হাতিডোবা গ্রামের নারায়ণ চন্দ্রের মেয়ে তনশ্রী (৫), হাতিডোবা গ্রামের রবিন চন্দ্রের সাড়ে তিন বছরের ছেলে বিষ্ণু।

পঞ্চগড়ে দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে নৌকাডুবি : ২৫ জনের প্রাণহানি

মহালয়ার আনন্দে বিষাদের সুর

বিকল হয়ে পড়ে শ্যালোচালিত নৌকার ইঞ্জিন; প্রচণ্ড স্রোতে হারায় ভারসাম্য; তলিয়ে যায় করতোয়া নদীতে * আলো স্বল্পতায় বিঘ্নিত উদ্ধারকাজ, নিখোঁজ অর্ধশতাধিক, আউলিয়ার ঘাটে শোকের মাতম
 যুগান্তর প্রতিবেদন, রংপুর ব্যুরো ও পঞ্চগড় প্রতিনিধি 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীর শরতের আকাশে ছিল মেঘের ঘনঘটা। তবুও মা দুর্গার আগমনি বার্তায় চারদিকে আনন্দধ্বনি। এসেছে মহালয়া। শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন যাচ্ছেন বদেশ্বরী মন্দিরে। মহালয়ায় প্রতিবছর সেখানে অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়। বড়শশী ইউনিয়নের ওই মন্দিরে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে করতোয়া নদী। এজন্য সবাই জড়ো হয়েছেন আউলিয়ার ঘাটে। নতুন পোশাক আর রঙিন সাজ নিয়ে শতাধিক মানুষ ওঠেন শ্যালোচালিত নৌকায়। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘাট
থেকে ছেড়ে কিছু দূরে যেতেই বিকল হয়ে যায় নৌকার মেশিন। নদীর তীব্র স্রোতের মধ্যে দুলতে শুরু করে নৌকা। একজন কিনারা থেকে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন, ‘মাঝি...সাবধান’। এর তিন সেকেন্ডের মধ্যেই ভারসাম্য হারায় ছোট্ট নৌযান। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী নেওয়া নৌকাটি নিমিষেই তলিয়ে যায় পানিতে। মুহূর্তেই আনন্দ রূপ নেয় বিষাদে। শুরু হয় মানুষের গগনবিদারী চিৎকার। কিনারা থেকে অন্য মাঝিরাও ছুটে যান পুণ্যার্থীদের উদ্ধারে। এর আগেই পানিতে ডুবে যান অনেকে। একে একে ২৫টি তাজা প্রাণ হয়ে যায় লাশ। নিখোঁজ হন আরও অর্ধশতাধিক। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে মর্মান্তিক এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ৯টায় এ খবর লেখা পর্যন্ত যে ২৫ জনের লাশ উদ্ধার হয় তার মধ্যে ৮ জন শিশু, ১২ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। মরদেহগুলো নৌকাডুবির ঘটনাস্থল থেকে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার ভাটিতে পাওয়া যায়। রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও বোদা উপজেলার ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল তখনও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখে। সন্ধ্যার পর আলোর স্বল্পতার কারণে উদ্ধারকাজ পরিচালনায় বেগ পেতে হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক জসিম উদ্দিন। এর মধ্যেও রংপুর বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে বলে জানায় স্থানীয়রা।
এদিকে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও যুক্তরাষ্ট্রে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের বিদেহী আত্মার চির শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে মরদেহ সৎকারের জন্য ২০ হাজার করে টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালু করা হয়েছে একটি তথ্যকেন্দ্র। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে চারপাশ। সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয় মানুষের মৃতদেহ খুঁজতে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন স্বজনরা।
দুর্ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী ও নৌকা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, বদেশ্বরী মন্দিরে প্রতিবছরই মহালয়া উপলক্ষ্যে অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়। আশপাশের প্রায় সব জেলা থেকে প্রচুর পুণ্যার্থী সেখানে যান। সেকারণে নৌকাটিতে মাড়েয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ছাড়াও অন্যান্য এলাকা থেকেও কিছু মানুষ উঠেছিল। শ্যালোচালিত নৌকাটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো। কিন্তু সেখানে শতাধিক যাত্রী নিয়ে নৌকাটি যাত্রা শুরু করে। নদীতে পানির স্রোত ছিল অনেক বেশি। ফলে বিকট শব্দে নৌকার মেশিনের ফিতা ছিঁড়ে যায়। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যাত্রীরা। এরই মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে নদীর মাঝ পথে ডুবে যায় নৌকাটি। 
স্থানীয় রফিকুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকাটি নদীর মাঝে ডুবে গেলে যাত্রীরা চিৎকার শুরু করে। তখন নদীর পাড়ের লোকজন গিয়ে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। অপর প্রত্যক্ষদর্শী আ. হান্নান জানান, ডুবে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই সাঁতরে তীরে উঠে আসে। অনেকে আবার তলিয়ে যায়। তলিয়ে যাওয়া কয়েকজনকেও স্থানীয়রা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে উদ্ধার অভিযানের পরও অর্ধশতাধিক নৌকাযাত্রী নিখোঁজ আছেন বলে জানিয়েছেন মাড়েয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল ইসলাম।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত দুদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে গেছে। এ কারণে প্রচণ্ড সে াতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। নৌকাডুবির পর পুরুষরা অনেকেই সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। কিন্তু নারী ও শিশুরা ডুবে যায়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ দুর্ঘটনায় শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। আর যেগুলোর পরিচয় মেলেনি, তাদের পরিচয় নিশ্চিতের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথৈ আদিত্যকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিহত ও নিখোঁজদের সিংহভাগই বোদা, ছত্র শিকারপুর, হাতিডোবা, মদনহার, আলোকপাড়া, কমলাপুকুরি, কুমারপাড়া, পাঁচপীর, মাড়েয়া, ব্যাঙহারি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। উদ্ধারের পর মরদেহগুলো শনাক্তের জন্য নদীর পাড়ে রাখা হয়। কিছু মরদেহ নেওয়া হয় বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পঞ্চগড় পুলিশ সুপার এসএম সিরাজুল হুদা জানান, কতজন নিখোঁজ আছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদে জরুরি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। যে কোনো প্রয়োজনে ০১৭০৮-৩৯৭৭১৮ ও ০১৭১৯-৩৪৭১৭৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছে জেলা প্রশাসন।
মারা গেছেন যারা : মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ফুটকিবাড়ি গ্রামের হেমন্ত কুমারের মেয়ে শ্যামলী রানী কলি (১৪), মাড়েয়া বামনপাড়ার নির্মল চন্দ্রের স্ত্রী শোভা রানী (২৭), সনজীব রায়ের আড়াই বছরের ছেলে প্রীয়ন্ত রায়, বামনহাট গ্রামের রমেশ চন্দ্র রায়ের স্ত্রী শিমলী রানী (৩৫), শিকারপুর ফুটকি বাড়ির বাসু দেবের স্ত্রী রুপালী রানী (৩৫), তেলীপাড়া শালডাঙ্গার কালী চন্দ্রনাথ বর্মণের স্ত্রী ধন বালা (৬০), বংশীধর পুজারী গ্রামের রমেশ চন্দ্রের স্ত্রী সুনিতা রানী (৬০), একই গ্রামের চুড়া মোহনের স্ত্রী সনেকা রানী (৬০), ময়দান দিঘি চকপাড়া গ্রামের বিলাশ চন্দ্রের স্ত্রী সফলতা রানী (৪০), সাকোয়া শকিরপুর প্রধানপাড়া গ্রামের মধু চন্দ্র বর্মণের স্ত্রী ফালগুনী বর্মণ (৪৫), জয় নন্দা বারুয়াপাড়া গ্রামের মহোনী মোহন রায়ের স্ত্রী প্রমিলা দেবী (৭০), চন্দনবাড়ি হিন্দু প্রধানপাড়া গ্রামের সতেন্দ্রনাথের ছেলে যতীশ চন্দ্র (৫৫), বড়শশি কুমারপাড়া গ্রামের আহমদ আলীর ছেলে হাসেম আলী (৭০), কমলা পুকুরী মাড়েয়া গ্রামের অবিরাম চন্দ্রের ছেলে বিলাশ চন্দ্র (৪৫), বোদা আলোকপাড়া গ্রামের রমেশ চন্দ্রের মেয়ে উর্বশী (৮), মদনহার গ্রামের শ্রী রতন চন্দ্রের মেয়ে শ্রেয়শ্রী (৩), দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা হাতিডোবা শ্রী কার্তিকের মেয়ে লক্ষ্মী রানী (২৫), একই গ্রামের বাবুল চন্দ্র রায়ের ছেলে দিপংকর রায় (৩), লক্ষ্মীরপুর ডাঙ্গাপাড়ার চণ্ডী প্রসাদের স্ত্রী প্রমিলা রানী (৫৫), একই উপজেলার মধ্য শিকারপুর গ্রামের বানী কান্ত রায়ের ছেলে অমল চন্দ্র (৩৫), ছত্র শিকারপুর হাতিডোবা গ্রামের শ্রী রবিন চন্দ্রের স্ত্রী তারা রানী (২৪), একই গ্রামের নারায়ণ চন্দ্রের মেয়ে প্রিয়ন্ত্রী (৮) হাতিডোবা গ্রামের নারায়ণ চন্দ্রের মেয়ে তনশ্রী (৫), হাতিডোবা গ্রামের রবিন চন্দ্রের সাড়ে তিন বছরের ছেলে বিষ্ণু।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন