প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পেছনে আস্তানা

র‌্যাবের অভিযানে তিন জঙ্গি নিহত

চুলায় গ্রেনেড রেখে বিস্ফোরণের চেষ্টা * র‌্যাবের দুই সদস্য আহত * আগেও ওই বাড়িতে তিনবার অভিযান চালানো হয়

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ার একটি বাড়িতে র‌্যাবের অভিযানে তিন জঙ্গি নিহত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পেছনে নাখালপাড়ার ৩১/১ ‘রুবি ভিলা’ নামের বাড়িতে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এ অভিযান চলে। এ সময় র‌্যাবের দুই সদস্য আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেনেড, সুইসাইড ভেস্ট, ডেটোনেটর, পাওয়ার জেল, পিস্তল ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের স্টুয়ার্ড (ফ্লাইট পার্সার) শাহ মো. সাব্বির হোসেনের মালিকানাধীন ওই বাড়িতে এর আগেও তিনবার অভিযান চালানো হয়। জঙ্গিদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শুক্রবার বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। শনিবার তাদের ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের জানান, নাখালপাড়ার পুরাতন এমপি হোস্টেলের পাশের ওই বাড়িতে দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা অবস্থান করে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছে তাদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য ছিল। ওই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। অত্যন্ত সুরক্ষিত বাড়িটিতে অভিযানের সময় বাড়ির মালিক বা কেয়ারটেকার তাদের সহযোগিতা করেননি। এ কারণে গ্রিলের গেট ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। তিনি জানান, ওই বাড়িতে ২০১৩ ও ২০১৬ সালেও অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই সময় সেখান থেকে জঙ্গি সন্দেহে বেশ কয়েকজকে গ্রেফতার করা হয়। মুফতি মাহমুদ খান জানান, ছয়তলা বাড়িটির পঞ্চমতলায় ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে মূল অভিযান শুরু হয়। এ সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করে জঙ্গিরা। গ্যাসের চুলায় গ্রেনেড রেখে বিস্ফোরণের চেষ্টা করে জঙ্গিরা। তবে র‌্যাব সদস্যরা খুব দ্রুত ও অত্যন্ত দক্ষতায় চুলার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এটি করা না গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। অভিযান শুরুর পর জঙ্গিরা গুলি চালায় ও বিস্ফোরণ ঘটায়। র‌্যাবের সঙ্গে টানা প্রায় ৪০ মিনিট গোলাগুলি হয়। গোলাগুলিতে জঙ্গিরা নিহত হয়। তাদের বয়স ২৫ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতের অভিযানে নিহতরা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য। তবে তাদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি আরও জানান, অভিযানে র‌্যাবের আহত দু’জনের মধ্যে একজনের শরীরে গ্রেনেডের স্পি­ন্টার বিদ্ধ হয়েছে। দু’জনকেই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

র‌্যাব পরিচালক মুফতি মাহমুদ বলেন, দুই ইউনিটের ওই ভবনের পাঁচতলা ও ছয়তলার তিনটি ফ্ল্যাটে ব্যাচেলররা ভাড়া থাকেন। তাদের সংখ্যা ২১-২২ জন। অন্য ফ্ল্যাটগুলোর বাসিন্দারা পরিবারসহ থাকেন। নিরাপদে অভিযান চালানোর জন্য বাড়ির সব বাসিন্দাকে দোতলার একটি ফ্ল্যাটে নেয়া হয়। বাড়ির বাসিন্দারা নিরাপদে আছেন। তিনি বলেন, জঙ্গিদের বিষয়ে আরও তথ্য পেতে ওই বাড়ির মালিক সাব্বির ও মেস ম্যানেজার রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকেও জঙ্গিদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে। র‌্যাব জানায়, আগে জঙ্গিরা পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া করত। এখন নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে তারা কক্ষ ভাড়া নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। শুক্রবার বিকালে ওই ফ্ল্যাটের কক্ষটিতে রক্ত ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। জঙ্গিদের কক্ষে কোনো আসবাবপত্র ছিল না। রুমে দুটি পিস্তল ও সুইসাইড ভেস্ট পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বাড়ির মেস ম্যানেজার ও কেয়ারটেকার রুবেল র‌্যাবকে জানান, জাহিদ নামের এক যুবক ২৯ ডিসেম্বর পাঁচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেয়। তেজগাঁওয়ের একটি সিরামিক কারখানায় চাকরি করে জানিয়ে জাহিদ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় কক্ষটি ভাড়া নেয়। এর মধ্যে সে আড়াই হাজার টাকা অগ্রীম দেয়। সে আরও জানায়, তার সঙ্গে তার দুই ভাই থাকবে। অবশ্য ৪ জানুয়ারি জাহিদ একা বাসায় উঠে। ৮ জানুয়ারি বাকি দু’জন আসে। জাহিদ খুব সকালে বাসা থেকে বের হতো ও আসত রাতে। তবে অন্য দু’জনকে কেউ কখনও বাড়ি থেকে বের হতে দেখেনি। রুবেল জানায়, বাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাট তিন কক্ষের। পঞ্চমতলার ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে তারা তিনজন থাকত। বাকি দুটি কক্ষে আগে থেকেই চারজন থাকতেন। বাড়িওয়ালা সাব্বির র‌্যাবকে জানান, বাসা ভাড়া নেয়ার সময় ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ করেনি। এমনকি তাদের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্যও দেয়নি।

শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, চুলার মধ্যে গ্রেনেড রেখে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছিল জঙ্গিরা। সম্ভবত জঙ্গিরা গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনটি আইইডি, ১৪টি ডেটোনেটর, চারটি পাওয়ার জেল, তিনটি সুইসাইড ভেস্ট ও দুটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে জাহিদ ও সজীব নামে দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। তবে সে দুটি পরিচয়পত্রের ছবি একই ব্যক্তির। ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুটি পরিচয়পত্র জাহিদের (একটি জাল ও একটি আসল)। বাকিদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। তিনি বলেন, বাড়ির মালিক ও কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, গত বছর ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবিরের তিন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা ছিল।

এলাকাবাসীর বক্তব্য : রুবি ভিলার পেছনের বাড়ির বাসিন্দা বদরুল বলেন, ভোর রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। ওই সময় বাইরে দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া যায়। প্রায় ১৫ বছর আগে ময়মনসিংহের সাব্বির ভবনটি নির্মাণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা বিলকিস আক্তার ধারা বলেন, রাত ১২টার দিকে প্রথমে একটি গুলির শব্দ শুনি। পরে রাত ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে গুলির শব্দ শুনতে পাই। এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রথমে একটা শব্দ পাই। এর কিছুক্ষণ পর আবার শব্দ। শীতের কারণে বাসার দরজা-জানালা সব বন্ধ ছিল। তাই শব্দ খুব আস্তে শোনা গেছে। আমরা প্রথমে ভেবেছি আতশবাজি হচ্ছে। পশ্চিম নাখালপাড়ার ৭৪ নম্বর বাড়ির মালিক ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন বলেন, ১৪ আগস্ট ওই বাড়ি থেকে ৮-৯ জনকে ধরে র‌্যাবের কাছে সোপর্দ করেছি। ২-৩ বছর আগে ওই বাড়ি থেকে ১০-১২ জনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশের বাড়িওয়ালা অটল বলেন, গত বছরের শেষের দিকে ওই বাড়ি থেকে তিনজনকে ধরে নিয়ে যায় র‌্যাব। পরে দু’জনকে ছেড়ে দেয়। অপরজনের কী হয়েছে তা জানি না।

পশ্চিম নাখালপাড়ার বাসিন্দা সারোয়ার বলেন, একবার পুলিশ বাড়িওয়ালা সাব্বিরকে গ্রেফতার করেছিল। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। ছেলে স্ত্রী নিয়ে বাড়িটির দোতলায় থাকেন। পশ্চিম নাখালপাড়ার মাংস বিক্রেতা আবদুল বারেক জানান, রুবি ভিলার মালিক সাব্বির ও তার পরিবারের সদস্যরা এলাকার মানুষের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করেন না। সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাদের তেমন দেখা যায় না। বাড়ির দেখভাল করেন একজন কেয়ারটেকার। মেস চালায় অন্য একজন।

স্বজনদের খোঁজে : শুক্রবার দুপুরে রুবি ভিলার কাছে র‌্যাবের নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে দাঁড়িয়ে সুতা কারখানার কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, তার ছেলে পারভেজ হোসেন পরাগ ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী। পরাগ ওই বাসার ছয়তলার একটি মেসে থাকে। ভোর ৪টার দিকে পরাগ তার মাকে ফোন করে জানায়, বাসার দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বাইরে প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছে। ওই খবর পেয়ে গাজীপুর থেকে রওনা হয়ে সকালে নাখালপাড়ায় এলেও ছেলের দেখা পাননি কামাল। তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ওর সঙ্গে কথা হয়েছে। বলেছে ভালো আছে। কিন্তু এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাচ্ছি। কুমিল্লার চান্দিনা থেকে আসা রুহুল মাস্টার বেলা ৩টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, ওই ভবনের পাঁচতলার মেসে থেকে তার ছেলে রাশেদ রনি ঢাকা কলেজে পড়ে। রনির কাছে বৃহস্পতিবার বেড়াতে আসে তার মা ও বোন। রাতে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সকাল থেকে তাদের সবার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে এখানে এসেছি। এখনও তাদের খোঁজ পাইনি। তিনি জানান, তার মেয়ে সানজিদা এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×