দেশের মানুষ আর ভাঙা নৌকায় উঠবে না
jugantor
দেশের মানুষ আর ভাঙা নৌকায় উঠবে না
কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে মির্জা ফখরুল

  হাবিবুর রহমান খান ও আবুল খায়ের, কুমিল্লা থেকে  

২৭ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মানুষ আর ভাঙা নৌকায় উঠতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার বিকালে কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশে তিনি আরও বলেন, উনি (শেখ হাসিনা) আবার নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে নৌকায় ভোট চেয়েছেন। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের একটা গান ছিল-আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় উঠতাম না। বাংলাদেশের সব মানুষ এখন এই গান গাইতে শুরু করেছে। ভুলে যান ওই নৌকার কথা, ভুলে যান। মানুষ এখন আপনাদের বিদায় দেখতে চায়। দয়া করে সময় থাকতেই মানে মানে কেটে পড়ুন। তা না হলে এই বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের বিদায় করবে, কীভাবে করবে, সেটা আপনারা জানেন। অতীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে।

১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশ হবেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমাবেশ যাতে না হতে পারে, সেজন্য গায়েবি মামলা দেওয়া শুরু করেছে। আমাদের কথা খুব পরিষ্কার-আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। সেখানে আপনারা বিভিন্ন রকম কথা বলবেন, ধোঁয়া তুলবেন, এটা হয় না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত দেশে কোনো নির্বাচন নয়। নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ করে দ্রুত সাজা দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে চায় সরকার। গোমতী নামে বিভাগ কুমিল্লার মানুষ মেনে নেবে না বলেও জানান তিনি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, নেতাকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে বিভাগীয় গণসমাবেশ করছে বিএনপি। কুমিল্লার টাউন হল মাঠে বেলা ১১টায় এ গণসমাবেশ শুরু হয়। পরিবহণ ধর্মঘট না থাকায় কোনো ভোগান্তি ছিল না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা উত্তর, কুমিল্লা দক্ষিণ এবং মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থক সকাল থেকেই মিছিল নিয়ে বিভাগীয় গণসমাবেশে যোগদান করেন। কাকডাকা ভোর থেকেই নগরীর টাউন হল মাঠের দিকে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। সকাল ১০টার মধ্যেই পূবালী চত্বর এবং আশপাশের সড়কগুলো সমাগত নেতাকর্মীদের পদভারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু সমাবেশ ততটা শৃঙ্খল ছিল না। মঞ্চে অনেকেই উঠে পড়েন। রোদের কারণে অনেক নেতাকর্র্মী মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। এতে মাঠের অনেক অংশ ফাঁকা ছিল। যদিও বিকালে তা পূর্ণ হয়ে যায়। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই সমাবেশস্থলে এসে জায়গা দখল করে নেয় কুমিল্লা বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অনুসারীরা। গানে গানে আর আনন্দ-উল্লাসে মাঠে দিন-রাত অতিবাহিত করেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। সমাবেশে নিজ নিজ সংসদসীয় এলাকার সমর্থিত নেতাদের পক্ষে শোডাউন করেন কর্মী-সমর্থকরা। মাঠে ব্যাপক শোডাউন করেন সিটি নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার। তিনি নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড থেকে কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে সমাবেশে যোগদান করেন। তাছাড়া আরেক বহিষ্কৃত নেতা মনিরুল হক সাক্কুও সস্ত্রীক তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মাঠে শোডাউন করেন। মাঠের পূর্বপাশের একটি অংশে সাক্কু সমর্থকরা আর পশ্চিম ও মধ্য অংশজুড়ে নিজাম উদ্দিন কায়সারের সমর্থকরা শোডাউন করেন। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় জনপ্রিয় এ দুই নেতাই মঞ্চে উঠতে পারেননি।

বক্তব্যের শুরুতে মির্জা ফখরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহত বিএনপিকর্মী নয়নকে স্মরণ করেন। তার প্রতি শ্রদ্ধাসহ বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে এবং আওয়ামী লীগের নির্যাতনে নিহত নেতাকর্মীদের স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর যশোর সমাবেশের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, উনি সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে, রাষ্ট্রের সব যন্ত্র ব্যবহার করে, হাজার হাজার বাস-ট্রাক নিয়ে যশোরে সভা করেছেন। এই সভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন-আওয়ামী লীগ এলে জনগণ শান্তি পায়। কিন্তু দেশের মানুষ শান্তিতে নেই।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না, এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই দানবীয় সরকার আমাদের সব অর্জন কেড়ে নিয়েছে। এই সরকার আমাদের ভাতে মারছে, পানিতে মারছে, সব পর্যায়ে কর্মসংস্থান শেষ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের যন্ত্রণায় গোটা দেশ আজ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, আজ মানুষ মুক্তি চায়, মুক্তির জন্যই আজ এখানে আপনারা সমবেত হয়েছেন।

মির্জা ফখরুল সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ১৫ বছরে সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি ধংস করে দিয়েছে, বিচার বিভাগ ধ্বংস করে দিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ করে দিয়েছে, কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে, প্রশাসন শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দেশ চলতে পারে না।

তিনি বলেন, সরকার জোর করে দুইবার নির্বাচন করেছে। ২০১৪ সালে কেউ ভোট দিতে যাননি, ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন, আর ২০১৮ সালে তো আগের রাতেই ভোট শেষ। আবার পুরোনো খেলা শুরু করেছে। সরাসরি তো ভোট দিতে সাহস নেই। কারণ তারা জানে ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, ভোট যদি সবাই দিতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগের জামানত থাকবে না। সেজন্য ওরা ফন্দিফিকির বের করেছে। বলছে, আগের মতো ভোট হবে। অর্থাৎ ওরা থাকবে ক্ষমতায়, শেখ হাসিনা থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, এমপিরা থাকবেন এমপি, মন্ত্রীরা থাকবেন মন্ত্রী। আর আমরা ভোট দেব। আবার নাকি ইভিএমে ভোট হবে। যেমন খুশি তেমন চুরি করবে। এটার জন্য তারা আবার গায়েবি মামলা দেওয়া শুরু করেছে। রাজশাহীতে গত ১১ দিনে ৩৫টি গায়েবি মামলা করেছে আর সারা দেশে ১০৪টার মতো মামলা দিয়েছে।

নেতাদের দ্রুত সাজা দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবার নামে অসংখ্য মামলা রয়েছে। শুধু তাই নয়, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের দ্রুত বিচার করতে চাচ্ছে। অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে যেভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে সাজা দিয়ে আটক করে রেখেছে, তাদেরও কারাগারে নিক্ষেপ করে সহজেই নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে চায়। ওইভাবে ওদের নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে দেশের মানুষ দেবে না। এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না-যতক্ষণ না শেখ হাসিনা পদত্যাগ করছে, যতক্ষণ না সংসদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে, যতক্ষণ না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়। পরিষ্কার কথা-তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিনের সভাপতিত্বে এবং কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ইউসুফ মোল্লা টিপু ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. জসিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় গণসমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, বিএনপি চেয়ারপারসন উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী, উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, রাশেদা বেগম হীরা, লায়ন হারুন রশিদ, জেড খান মো. রিয়াজ উদ্দীন নসু, খালেদ মাহবুব শ্যামল, আবুল কালাম আজাদ, জাকারিয়া তাহের সুমন, ড. শাহিদা রফিক, বোরহান উদ্দিন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, কুমিল্লা বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক উৎবাতুল বারী আবু, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আক্তারুজ্জান, সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান জিল্লু, সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সলিমুল্লাহ সেলিম প্রমুখ।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাদের সমাবেশে বাধা দিয়েছে; কিন্তু বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা সব বাধা উপেক্ষা করে কুমিল্লার সমাবেশ সফল করেছে। তিনি বলেন, মানুষ এই সরকারের ভোট ডাকাতির জবাব দিতে এসেছে, মানুষ গণতন্ত্র রক্ষা করতে এসেছে, ব্যাংকে টাকা নেই, কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে, অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, দেশের বিচার বিভাগ, অর্থনীতিসহ সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই আগামী দিনে এই সরকারের পতনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আপনারা প্রস্তুত হোন, এই সরকারের সময় শেষ। আগামী দিনের বাংলাদেশ, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বাংলাদেশ।

মোশাররফ বলেন, সরকার গোমতী নামে কুমিল্লা বিভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কুমিল্লাবাসী তা মানবে না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে গোমতী নয়, বিভাগের নাম হবে কুমিল্লা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপি কর্মী হত্যার তিব্র নিন্দা জানাই। এই সরকার গুলি করে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। মানুষ সরকারের সব ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে প্রস্তুত। খুন এখন ভয় পায় না। তিনি বলেন, কোটি কোটি ডলার পাচার করা হয়েছে, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই অবস্থা দূর করতে হলে এই সরকারকে সরাতে হবে। সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।

নজরুল ইসলাম খান সরকারের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচন দেন, মানুষ ভোট দিতে পারলে আপনাদের জামানত থাকবে না। আজ কুমিল্লার জসসমুদ্র প্রমাণ করে এই অবৈধ সরকারের পতন-ঘণ্টা বেজে গেছে।

বরকত উল্লাহ বুলু সমাবেশ সফল করায় সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশ ধ্বংসের পেছনে এ সরকার। তারা দেশকে ফোকলা করেছে। এ দানবীয় সরকারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশ শুরুর আগেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায় : কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ শুরুর আগেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল একেবারেই বিচ্ছিন্ন। এতে অনেকটাই ভোগান্তিতে পড়েন গণমাধ্যমকর্মীরা। সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটে। তাছাড়া বিএনপির সমাবেশে আগতরা ফেসবুক মেসেঞ্জার ব্যবহার করতে পারেননি।

রুমিন ফারহানার মোবাইলসহ চার শতাধিক মোবাইল ফোন চুরি : কুমিল্লায় বিভাগীয় গণসমাবেশস্থল থেকে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা এমপির মোবাইল ফোনসহ চার শতাধিক নেতাকর্মীর মোবাইল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রুমিন ফারহানা নিজেই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, শুক্রবার রাতে জনস্রোত দেখতে টাউন হলে আসি। এরপরই আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে যায়। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চারশতাধিক নেতাকর্মীর মোবাইল ফোন চুরি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দেশের মানুষ আর ভাঙা নৌকায় উঠবে না

কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে মির্জা ফখরুল
 হাবিবুর রহমান খান ও আবুল খায়ের, কুমিল্লা থেকে 
২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মানুষ আর ভাঙা নৌকায় উঠতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার বিকালে কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশে তিনি আরও বলেন, উনি (শেখ হাসিনা) আবার নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে নৌকায় ভোট চেয়েছেন। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের একটা গান ছিল-আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় উঠতাম না। বাংলাদেশের সব মানুষ এখন এই গান গাইতে শুরু করেছে। ভুলে যান ওই নৌকার কথা, ভুলে যান। মানুষ এখন আপনাদের বিদায় দেখতে চায়। দয়া করে সময় থাকতেই মানে মানে কেটে পড়ুন। তা না হলে এই বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের বিদায় করবে, কীভাবে করবে, সেটা আপনারা জানেন। অতীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে।

১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশ হবেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমাবেশ যাতে না হতে পারে, সেজন্য গায়েবি মামলা দেওয়া শুরু করেছে। আমাদের কথা খুব পরিষ্কার-আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। সেখানে আপনারা বিভিন্ন রকম কথা বলবেন, ধোঁয়া তুলবেন, এটা হয় না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত দেশে কোনো নির্বাচন নয়। নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ করে দ্রুত সাজা দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে চায় সরকার। গোমতী নামে বিভাগ কুমিল্লার মানুষ মেনে নেবে না বলেও জানান তিনি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, নেতাকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে বিভাগীয় গণসমাবেশ করছে বিএনপি। কুমিল্লার টাউন হল মাঠে বেলা ১১টায় এ গণসমাবেশ শুরু হয়। পরিবহণ ধর্মঘট না থাকায় কোনো ভোগান্তি ছিল না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা উত্তর, কুমিল্লা দক্ষিণ এবং মহানগর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থক সকাল থেকেই মিছিল নিয়ে বিভাগীয় গণসমাবেশে যোগদান করেন। কাকডাকা ভোর থেকেই নগরীর টাউন হল মাঠের দিকে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। সকাল ১০টার মধ্যেই পূবালী চত্বর এবং আশপাশের সড়কগুলো সমাগত নেতাকর্মীদের পদভারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু সমাবেশ ততটা শৃঙ্খল ছিল না। মঞ্চে অনেকেই উঠে পড়েন। রোদের কারণে অনেক নেতাকর্র্মী মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। এতে মাঠের অনেক অংশ ফাঁকা ছিল। যদিও বিকালে তা পূর্ণ হয়ে যায়। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই সমাবেশস্থলে এসে জায়গা দখল করে নেয় কুমিল্লা বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অনুসারীরা। গানে গানে আর আনন্দ-উল্লাসে মাঠে দিন-রাত অতিবাহিত করেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। সমাবেশে নিজ নিজ সংসদসীয় এলাকার সমর্থিত নেতাদের পক্ষে শোডাউন করেন কর্মী-সমর্থকরা। মাঠে ব্যাপক শোডাউন করেন সিটি নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার। তিনি নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড থেকে কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে সমাবেশে যোগদান করেন। তাছাড়া আরেক বহিষ্কৃত নেতা মনিরুল হক সাক্কুও সস্ত্রীক তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মাঠে শোডাউন করেন। মাঠের পূর্বপাশের একটি অংশে সাক্কু সমর্থকরা আর পশ্চিম ও মধ্য অংশজুড়ে নিজাম উদ্দিন কায়সারের সমর্থকরা শোডাউন করেন। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় জনপ্রিয় এ দুই নেতাই মঞ্চে উঠতে পারেননি।

বক্তব্যের শুরুতে মির্জা ফখরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহত বিএনপিকর্মী নয়নকে স্মরণ করেন। তার প্রতি শ্রদ্ধাসহ বিভিন্ন সময়ে পুলিশের হাতে এবং আওয়ামী লীগের নির্যাতনে নিহত নেতাকর্মীদের স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর যশোর সমাবেশের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, উনি সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে, রাষ্ট্রের সব যন্ত্র ব্যবহার করে, হাজার হাজার বাস-ট্রাক নিয়ে যশোরে সভা করেছেন। এই সভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন-আওয়ামী লীগ এলে জনগণ শান্তি পায়। কিন্তু দেশের মানুষ শান্তিতে নেই।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না, এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই দানবীয় সরকার আমাদের সব অর্জন কেড়ে নিয়েছে। এই সরকার আমাদের ভাতে মারছে, পানিতে মারছে, সব পর্যায়ে কর্মসংস্থান শেষ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের যন্ত্রণায় গোটা দেশ আজ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, আজ মানুষ মুক্তি চায়, মুক্তির জন্যই আজ এখানে আপনারা সমবেত হয়েছেন।

মির্জা ফখরুল সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ১৫ বছরে সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি ধংস করে দিয়েছে, বিচার বিভাগ ধ্বংস করে দিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ করে দিয়েছে, কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে, প্রশাসন শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দেশ চলতে পারে না।

তিনি বলেন, সরকার জোর করে দুইবার নির্বাচন করেছে। ২০১৪ সালে কেউ ভোট দিতে যাননি, ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন, আর ২০১৮ সালে তো আগের রাতেই ভোট শেষ। আবার পুরোনো খেলা শুরু করেছে। সরাসরি তো ভোট দিতে সাহস নেই। কারণ তারা জানে ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, ভোট যদি সবাই দিতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগের জামানত থাকবে না। সেজন্য ওরা ফন্দিফিকির বের করেছে। বলছে, আগের মতো ভোট হবে। অর্থাৎ ওরা থাকবে ক্ষমতায়, শেখ হাসিনা থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, এমপিরা থাকবেন এমপি, মন্ত্রীরা থাকবেন মন্ত্রী। আর আমরা ভোট দেব। আবার নাকি ইভিএমে ভোট হবে। যেমন খুশি তেমন চুরি করবে। এটার জন্য তারা আবার গায়েবি মামলা দেওয়া শুরু করেছে। রাজশাহীতে গত ১১ দিনে ৩৫টি গায়েবি মামলা করেছে আর সারা দেশে ১০৪টার মতো মামলা দিয়েছে।

নেতাদের দ্রুত সাজা দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবার নামে অসংখ্য মামলা রয়েছে। শুধু তাই নয়, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের দ্রুত বিচার করতে চাচ্ছে। অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে যেভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে সাজা দিয়ে আটক করে রেখেছে, তাদেরও কারাগারে নিক্ষেপ করে সহজেই নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে চায়। ওইভাবে ওদের নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে দেশের মানুষ দেবে না। এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না-যতক্ষণ না শেখ হাসিনা পদত্যাগ করছে, যতক্ষণ না সংসদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে, যতক্ষণ না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়। পরিষ্কার কথা-তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিনের সভাপতিত্বে এবং কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ইউসুফ মোল্লা টিপু ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. জসিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় গণসমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, বিএনপি চেয়ারপারসন উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী, উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, রাশেদা বেগম হীরা, লায়ন হারুন রশিদ, জেড খান মো. রিয়াজ উদ্দীন নসু, খালেদ মাহবুব শ্যামল, আবুল কালাম আজাদ, জাকারিয়া তাহের সুমন, ড. শাহিদা রফিক, বোরহান উদ্দিন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, কুমিল্লা বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক উৎবাতুল বারী আবু, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আক্তারুজ্জান, সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান জিল্লু, সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সলিমুল্লাহ সেলিম প্রমুখ।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাদের সমাবেশে বাধা দিয়েছে; কিন্তু বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা সব বাধা উপেক্ষা করে কুমিল্লার সমাবেশ সফল করেছে। তিনি বলেন, মানুষ এই সরকারের ভোট ডাকাতির জবাব দিতে এসেছে, মানুষ গণতন্ত্র রক্ষা করতে এসেছে, ব্যাংকে টাকা নেই, কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে, অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, দেশের বিচার বিভাগ, অর্থনীতিসহ সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই আগামী দিনে এই সরকারের পতনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আপনারা প্রস্তুত হোন, এই সরকারের সময় শেষ। আগামী দিনের বাংলাদেশ, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বাংলাদেশ।

মোশাররফ বলেন, সরকার গোমতী নামে কুমিল্লা বিভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কুমিল্লাবাসী তা মানবে না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে গোমতী নয়, বিভাগের নাম হবে কুমিল্লা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপি কর্মী হত্যার তিব্র নিন্দা জানাই। এই সরকার গুলি করে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। মানুষ সরকারের সব ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে প্রস্তুত। খুন এখন ভয় পায় না। তিনি বলেন, কোটি কোটি ডলার পাচার করা হয়েছে, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই অবস্থা দূর করতে হলে এই সরকারকে সরাতে হবে। সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।

নজরুল ইসলাম খান সরকারের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচন দেন, মানুষ ভোট দিতে পারলে আপনাদের জামানত থাকবে না। আজ কুমিল্লার জসসমুদ্র প্রমাণ করে এই অবৈধ সরকারের পতন-ঘণ্টা বেজে গেছে।

বরকত উল্লাহ বুলু সমাবেশ সফল করায় সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশ ধ্বংসের পেছনে এ সরকার। তারা দেশকে ফোকলা করেছে। এ দানবীয় সরকারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশ শুরুর আগেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায় : কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ শুরুর আগেই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল একেবারেই বিচ্ছিন্ন। এতে অনেকটাই ভোগান্তিতে পড়েন গণমাধ্যমকর্মীরা। সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটে। তাছাড়া বিএনপির সমাবেশে আগতরা ফেসবুক মেসেঞ্জার ব্যবহার করতে পারেননি।

রুমিন ফারহানার মোবাইলসহ চার শতাধিক মোবাইল ফোন চুরি : কুমিল্লায় বিভাগীয় গণসমাবেশস্থল থেকে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা এমপির মোবাইল ফোনসহ চার শতাধিক নেতাকর্মীর মোবাইল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রুমিন ফারহানা নিজেই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, শুক্রবার রাতে জনস্রোত দেখতে টাউন হলে আসি। এরপরই আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে যায়। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চারশতাধিক নেতাকর্মীর মোবাইল ফোন চুরি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন