বিজয়ের নীতি ও ধারা ফিরিয়ে আনার শপথ নিতে হবে
jugantor
যুগান্তরকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
বিজয়ের নীতি ও ধারা ফিরিয়ে আনার শপথ নিতে হবে

  হাসিবুল হাসান  

০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ১ ডিসেম্বর। শুরু হলো বিজয়ের মাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে ১৯৭১ সালের এ মাসেই অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা।

বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় গৌরবদীপ্ত চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বর। বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে অর্জিত বিজয় ছিল আনন্দ ও গৌরবের।

একই সঙ্গে প্রিয়জন হারানো শোকের। সবকিছুর পরও বাঙালি জাতির হাজার বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্নসাধ পূরণ হয় এই ডিসেম্বরেই। শুরু হয় বাঙালির স্বপ্নের পথে নবযাত্রা।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে ধারায় যাত্রা শুরু করেছিল, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও আমরা সেই ধারা ধরে রাখতে পারিনি বলে মনে করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, ডিসেম্বরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের নীতি ও ধারা ফিরিয়ে আনার শপথ নিতে হবে। বুধবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আধা পাকিস্তান হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ওপর নির্ভর করে আমরা একাত্তরের বিজয়ের ধারা উদ্ধার করতে পারব না। এটার জন্য নতুন শক্তি লাগবে।

তবে এটাও আপাত বাস্তবতা যে, সেই বিকল্প প্রগতিশীল বামপন্থি শক্তি এখনো জোরদার হয়ে উঠেনি। আমাদের মধ্যেও দুর্বলতা আছে। তবে তারপরও আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দীর্ঘদিন ধরে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০১২ সালে তিনি পার্টির দশম কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি সিপিবির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি পদে ছিলেন। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন সেলিম। ছাত্র ইউনিয়নের এই নেতা শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই প্রস্তুত করেন ব্রিগেড। নকল রাইফেল দিয়ে চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলাবাহিনীর কমান্ডার হিসাবে অংশ নেন তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ডিসেম্বরে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এটা বাঙালি জাতির জন্য চরম গৌরবের মাস। ইতিহাস বলে, বাঙালি বীরের জাতি। তারা বিজয় অর্জন করতে জানত। আবার ইতিহাস এটাও বলে, বাঙালি জাতির ইতিহাস কলঙ্কের ইতিহাস। বিজয় অর্জন করে এর ধারা ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আমরা যে বিজয় অর্জন করেছি, এর প্রায় সবটাই কর্পূরের মতো উবে গেছে। সমাজতন্ত্র থেকে বিপরীতমুখী যাত্রা শুরু করেছি। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে আমরা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছি। দেশ আজ বিদেশি প্রভুদের আজ্ঞাবহ থেকে তথাকথিত উন্নয়নের যে পথ নিয়েছে, সেটা আমাদের পদানত করে রাখছে। গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি আমলে যেমন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি চালু ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০ বছর পর একই দেশে দুই অর্থনীতি ও দুই সমাজ সমান্তরালভাবে বিরাজ করছে। একদিকে ৯৯ ভাগ শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মেহনতি মানুষ। আরেকদিকে এক ভাগ লুটেরা ধনিক শ্রেণি। গত ১৬ বছরে ১১ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। কোটিপতির সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। অথচ চা-বাগানের শ্রমিকরা ১২০ টাকা মজুরিতে কাজ করে। আন্দোলন করার পর তাদের সব দাবি মানা হয়নি। যেটুকু মানা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছিলেন ১৭০ টাকা, সেই বাড়তি ৫০ টাকা এখনো বকেয়া পড়ে আছে। দ্রব্যমূল্যের কারণে মানুষ নাজেহাল।

সিপিবির সাবেক সভাপতি সেলিম বলেন, বড় বড় কিছু প্রজেক্ট উন্নয়নে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বহু প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু উন্নয়নের সুফল প্রায় ষোলো আনায় চলে যাচ্ছে মুষ্টিমেয়দের হাতে। গরিবের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে উন্নয়নের যে নীতি গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রচার করা হচ্ছে, সে উন্নয়নের প্রসববেদনা জনগণকেই সহ্য করতে হবে। স্বাধীনতার পর বঙ্গন্ধুর নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ভিন্ন পথ ছিল, যে পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমি তখন ডাকসুর ভিপি ছিলাম। বঙ্গবন্ধু অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাকে হত্যা করে ইতিহাসের গতি পালটে দেওয়া হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় আসার পরও এবং একটানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও মোশতাকের নীতি ধরেই দেশ অগ্রসর হচ্ছে।

যুগান্তরকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বিজয়ের নীতি ও ধারা ফিরিয়ে আনার শপথ নিতে হবে

 হাসিবুল হাসান 
০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ১ ডিসেম্বর। শুরু হলো বিজয়ের মাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে ১৯৭১ সালের এ মাসেই অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা।

বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় গৌরবদীপ্ত চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বর। বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে অর্জিত বিজয় ছিল আনন্দ ও গৌরবের।

একই সঙ্গে প্রিয়জন হারানো শোকের। সবকিছুর পরও বাঙালি জাতির হাজার বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্নসাধ পূরণ হয় এই ডিসেম্বরেই। শুরু হয় বাঙালির স্বপ্নের পথে নবযাত্রা।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে ধারায় যাত্রা শুরু করেছিল, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও আমরা সেই ধারা ধরে রাখতে পারিনি বলে মনে করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, ডিসেম্বরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের নীতি ও ধারা ফিরিয়ে আনার শপথ নিতে হবে। বুধবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আধা পাকিস্তান হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ওপর নির্ভর করে আমরা একাত্তরের বিজয়ের ধারা উদ্ধার করতে পারব না। এটার জন্য নতুন শক্তি লাগবে।

তবে এটাও আপাত বাস্তবতা যে, সেই বিকল্প প্রগতিশীল বামপন্থি শক্তি এখনো জোরদার হয়ে উঠেনি। আমাদের মধ্যেও দুর্বলতা আছে। তবে তারপরও আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দীর্ঘদিন ধরে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০১২ সালে তিনি পার্টির দশম কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি সিপিবির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি পদে ছিলেন। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন সেলিম। ছাত্র ইউনিয়নের এই নেতা শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই প্রস্তুত করেন ব্রিগেড। নকল রাইফেল দিয়ে চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলাবাহিনীর কমান্ডার হিসাবে অংশ নেন তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ডিসেম্বরে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এটা বাঙালি জাতির জন্য চরম গৌরবের মাস। ইতিহাস বলে, বাঙালি বীরের জাতি। তারা বিজয় অর্জন করতে জানত। আবার ইতিহাস এটাও বলে, বাঙালি জাতির ইতিহাস কলঙ্কের ইতিহাস। বিজয় অর্জন করে এর ধারা ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আমরা যে বিজয় অর্জন করেছি, এর প্রায় সবটাই কর্পূরের মতো উবে গেছে। সমাজতন্ত্র থেকে বিপরীতমুখী যাত্রা শুরু করেছি। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে আমরা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছি। দেশ আজ বিদেশি প্রভুদের আজ্ঞাবহ থেকে তথাকথিত উন্নয়নের যে পথ নিয়েছে, সেটা আমাদের পদানত করে রাখছে। গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি আমলে যেমন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি চালু ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০ বছর পর একই দেশে দুই অর্থনীতি ও দুই সমাজ সমান্তরালভাবে বিরাজ করছে। একদিকে ৯৯ ভাগ শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মেহনতি মানুষ। আরেকদিকে এক ভাগ লুটেরা ধনিক শ্রেণি। গত ১৬ বছরে ১১ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। কোটিপতির সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। অথচ চা-বাগানের শ্রমিকরা ১২০ টাকা মজুরিতে কাজ করে। আন্দোলন করার পর তাদের সব দাবি মানা হয়নি। যেটুকু মানা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছিলেন ১৭০ টাকা, সেই বাড়তি ৫০ টাকা এখনো বকেয়া পড়ে আছে। দ্রব্যমূল্যের কারণে মানুষ নাজেহাল।

সিপিবির সাবেক সভাপতি সেলিম বলেন, বড় বড় কিছু প্রজেক্ট উন্নয়নে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বহু প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু উন্নয়নের সুফল প্রায় ষোলো আনায় চলে যাচ্ছে মুষ্টিমেয়দের হাতে। গরিবের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে উন্নয়নের যে নীতি গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রচার করা হচ্ছে, সে উন্নয়নের প্রসববেদনা জনগণকেই সহ্য করতে হবে। স্বাধীনতার পর বঙ্গন্ধুর নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ভিন্ন পথ ছিল, যে পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমি তখন ডাকসুর ভিপি ছিলাম। বঙ্গবন্ধু অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাকে হত্যা করে ইতিহাসের গতি পালটে দেওয়া হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় আসার পরও এবং একটানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও মোশতাকের নীতি ধরেই দেশ অগ্রসর হচ্ছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন