‘ঐক্য’ অটুটেই সংশয় চট্টগ্রাম আ.লীগ নেতাকর্মীদের
jugantor
‘ঐক্য’ অটুটেই সংশয় চট্টগ্রাম আ.লীগ নেতাকর্মীদের
প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে নেতারা এক টেবিলে * সমঝোতার ভূমিকায় দুই কেন্দ্রীয় নেতা

  আবদুল্লাহ আল মামুন ও শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম থেকে  

০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা কেন্দ্র করে বহুধাবিভক্ত চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ‘ঐক্যের’ সৃষ্ট হয়েছে। এটি ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য রোববার দলের সভাপতি শেখ হাসিনা স্থানীয় নেতাদের বার্তা দিয়েছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমন ঐক্য জরুরি বলেও মনে করেন দলসংশ্লিষ্টরা। তবে সাধারণ নেতাকর্মীরা বলছেন, দৃশ্যত নেতাদের মধ্যে ঐক্যের সুর লক্ষ করা গেলেও আদৌ ঐক্য হয়েছে কি না, হলেও তা কতদিন অটুট থাকবে-সেটাই দেখার বিষয়। অবশ্য নেতাকর্মীরা আরও বলছেন, দৃশ্যত চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তারা যে এক টেবিলে বসে কাজ করেছেন, এজন্য দলের দুই কেন্দ্রীয় নেতার ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দফায় দফায় চট্টগ্রাম এসে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদের এক টেবিলে বসাতে ঘুম হারাম হয়েছে এ দুই নেতার।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, চলার পথে একটি সংগঠনের নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা থাকে, আওয়ামী লীগেও আছে। কিন্তু জাতি ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব সময় ঐক্যবদ্ধ। চট্টগ্রামে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে স্মরণকালের বৃহত্তম এই জনসভা তারই বড় প্রমাণ।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে এত বড় জনসভা করতে পারাটা দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আন্তরিকতার ফসল। আমি বিশ্বাস করি, এই আন্তরিকতা নিয়ে তারা আগামী দিনেও দল ও দেশের জন্য কাজ করবেন।

চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগে শীর্ষ নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব ততটা প্রকট নয়। তবে মাঠ পর্যায়ে ঠিকই দ্বন্দ্ব আছে। জেলা নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এমপিদের ঘিরে রয়েছে আলাদা আলাদা বলয়। অবশ্য মহানগর আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব প্রকট। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়ে যাওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে সেখানে পদ-পদবি প্রাপ্তির লড়াই নেই।

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে ১২ ডিসেম্বর। সম্মেলন সামনে রেখে নানামুখী গ্রুপিং-লবিং চলছে। বর্তমানে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি হিসাবে মোছলেম উদ্দিন আহম্মদ এবং সাধারণ সম্পাদক হিসাবে রয়েছেন মফিজুর রহমান। সম্মেলনে নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে একটি গ্রুপ সক্রিয়। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে জোরালো লবিং গ্রুপিং চলছে। এখানে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর প্রভাব রয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের অনুসারী নেতাদের নিয়ে আসতে জোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ নিয়ে নিজেদের মতো করে কেন্দ্রে গ্রুপিং-লবিং করছেন দুই নেতা। সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হওয়ায় এই তদবির-লবিংকে কেন্দ্র করে গ্রুপিংও চাঙা হচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ বর্তমানে দুটি ধারায় বিভক্ত। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন একটি শক্তিশালী বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে যে বলয়টি ছিল সেটির নেতৃত্বে রয়েছেন তার ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এক সময় আরও এক নেতাকে ঘিরে একটি শক্তিশালী বলয় ছিল। তিনি সেই বলয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে বর্তমানে তিনি নিষ্ক্রিয়। ফলে সেই বলয়ের নেতাদের কেউ আ জ ম নাছির আবার কেউ নওফেলের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই বলয়টি আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে বলে দলীয় একাধিক সূত্র মনে করে। নাছির-নওফেলের অনুসারী দুই ধারা কেবল নগর আওয়ামী লীগে নয়; তা সক্রিয় রয়েছে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ছাত্রলীগেও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দুই শীর্ষ নেতার নামে চলে সংগঠন। দুই গ্রুপে দখল-বেদখল, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। দ্বিধা-বিভক্তি রয়েছে ওয়ার্ড এবং থানা পর্যায়েও। গ্রুপিংয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ে ইউনিট, ওয়ার্ড ও থানা সম্মেলন শেষ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ওয়ার্ড বা থানা পর্যায়ে সম্মেলন করতে গেলেই দুপক্ষের মতবিরোধ ও মতভিন্নতা সামনে আসে। তাই তারিখ নির্ধারণ হলেও আগামী ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনও হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংঘাত এড়াতে শীর্ষ পদে দুই ধারা থেকে দুজনকে পদ দেওয়া হয়। পুরো কমিটিতে দুই ধারার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করে ‘ব্যালেন্স’ করা এখানে একটি অঘোষিত রীতি। নগর যুবলীগের সম্মেলন হয়েছে এ বছর ৩০ মে। কিন্তু এ ছয় মাসেও কমিটি ঘোষণা হয়নি। মনে করা হচ্ছে, দুই ধারার ব্যালেন্স কমিটি নির্ধারণ করতে না পারায় নেতৃত্ব ঘোষণা করা হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও জনসভাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবলীগ এক মাস ধরে চট্টগ্রাম মহানগরে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে। পদপ্রত্যাশীরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সবটুকু ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

নগরে সভাপতি পদে অন্যতম দাবিদার ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এম আর আজিম এবং অপরজন দিদারুল আলম নাদির। এ দুজন চট্টগ্রামের স্থানীয় দুই নেতার অনুসারী। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা উপলক্ষ্যে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এম আর আজিমের কর্মতৎপরতা ছাড়িয়ে গেছে সবাইকে। লোক জমায়েতের প্রচারণায় তার নেতৃত্বে শহরে দৃষ্টিনন্দন কয়েক হাজার মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রা নেতাকর্মীদের মন কেড়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে দেবাশীষ পাল দেবু ও আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা পৃথকভাবে স্থানীয় দুই নেতার অনুসারী। দুজনের মধ্যে আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের কর্মতৎপরতা ছিল লক্ষণীয়।

৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা এক টেবিলে বসেছেন। এক মাস ধরে কাজ চালিয়ে গেছেন। কখনো কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কখনো নিজেরাই সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে থেকে দফায় দফায় বর্ধিত সভা করেছেন। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে করেছেন কর্মিসভা। আ জ ম নাছির এবং নওফেলও প্রস্তুতি সভায় এক টেবিলে একাধিকবার বসেছেন। প্রধানমন্ত্রী তথা দলীয় প্রধানের আগমন এবং জনসভা সামনে রেখে সবার মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতে এক অভূতপূর্ব ঐক্য লক্ষ করা গেছে। দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা জানান, এই ঐক্যের কারণেই মূলত প্রধানমন্ত্রীর জনসভা সফল হয়েছে। বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা বা সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। জনসভার সমন্বয়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, একটি সফল জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে নাছির তার কর্মদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। সবাইকে, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপকেও এক ছাতার নিচে আনতে পেরেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন কেন্দ্রীয় দুই নেতা।

আ জ ম নাছির উদ্দীন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, বড় দল হিসাবে নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতা বা মতপার্থক্য থাকে। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় প্রধান যেখানে উপস্থিত হবেন সেখানে অন্য সবকিছুই তুচ্ছ। আমরা চেষ্টা করেছি ঐক্যবদ্ধভাবে জনসভার আয়োজন করতে। ৪ ডিসেম্বরের জনসভায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুশি হয়েছেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে আমাকে বিষয়টি বলেছেন। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে এখানেই আমার সার্থকতা।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, জেলা সম্মেলন সামনে রেখে আমরা কাজ করছি। পদ-পদবি পেতে সবাই চায়। সেটা যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করতে হয়। এটা করতে গিয়ে কোনো নেতা মন্ত্রী বা এমপি বিভেদ সৃষ্টি করলে, গ্রুপিং করলে সেটা দলের জন্য ক্ষতি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবেই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর জনসভাকে আমরা সবাই মিলে সফল করেছি। যেহেতু সামনে জাতীয় নির্বাচন। তাই কোনো ধরনের গ্রুপিং-কোন্দলকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। বৃহত্তর স্বার্থে সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। নেতাকর্মীদের কাছে আমরা সেটাই প্রত্যাশা করি।

‘ঐক্য’ অটুটেই সংশয় চট্টগ্রাম আ.লীগ নেতাকর্মীদের

প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে নেতারা এক টেবিলে * সমঝোতার ভূমিকায় দুই কেন্দ্রীয় নেতা
 আবদুল্লাহ আল মামুন ও শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম থেকে 
০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা কেন্দ্র করে বহুধাবিভক্ত চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ‘ঐক্যের’ সৃষ্ট হয়েছে। এটি ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য রোববার দলের সভাপতি শেখ হাসিনা স্থানীয় নেতাদের বার্তা দিয়েছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমন ঐক্য জরুরি বলেও মনে করেন দলসংশ্লিষ্টরা। তবে সাধারণ নেতাকর্মীরা বলছেন, দৃশ্যত নেতাদের মধ্যে ঐক্যের সুর লক্ষ করা গেলেও আদৌ ঐক্য হয়েছে কি না, হলেও তা কতদিন অটুট থাকবে-সেটাই দেখার বিষয়। অবশ্য নেতাকর্মীরা আরও বলছেন, দৃশ্যত চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তারা যে এক টেবিলে বসে কাজ করেছেন, এজন্য দলের দুই কেন্দ্রীয় নেতার ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দফায় দফায় চট্টগ্রাম এসে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদের এক টেবিলে বসাতে ঘুম হারাম হয়েছে এ দুই নেতার।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, চলার পথে একটি সংগঠনের নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা থাকে, আওয়ামী লীগেও আছে। কিন্তু জাতি ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব সময় ঐক্যবদ্ধ। চট্টগ্রামে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে স্মরণকালের বৃহত্তম এই জনসভা তারই বড় প্রমাণ।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে এত বড় জনসভা করতে পারাটা দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আন্তরিকতার ফসল। আমি বিশ্বাস করি, এই আন্তরিকতা নিয়ে তারা আগামী দিনেও দল ও দেশের জন্য কাজ করবেন।

চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগে শীর্ষ নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব ততটা প্রকট নয়। তবে মাঠ পর্যায়ে ঠিকই দ্বন্দ্ব আছে। জেলা নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এমপিদের ঘিরে রয়েছে আলাদা আলাদা বলয়। অবশ্য মহানগর আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব প্রকট। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়ে যাওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে সেখানে পদ-পদবি প্রাপ্তির লড়াই নেই।

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে ১২ ডিসেম্বর। সম্মেলন সামনে রেখে নানামুখী গ্রুপিং-লবিং চলছে। বর্তমানে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি হিসাবে মোছলেম উদ্দিন আহম্মদ এবং সাধারণ সম্পাদক হিসাবে রয়েছেন মফিজুর রহমান। সম্মেলনে নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে একটি গ্রুপ সক্রিয়। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে জোরালো লবিং গ্রুপিং চলছে। এখানে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর প্রভাব রয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের অনুসারী নেতাদের নিয়ে আসতে জোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ নিয়ে নিজেদের মতো করে কেন্দ্রে গ্রুপিং-লবিং করছেন দুই নেতা। সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হওয়ায় এই তদবির-লবিংকে কেন্দ্র করে গ্রুপিংও চাঙা হচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ বর্তমানে দুটি ধারায় বিভক্ত। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন একটি শক্তিশালী বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে যে বলয়টি ছিল সেটির নেতৃত্বে রয়েছেন তার ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এক সময় আরও এক নেতাকে ঘিরে একটি শক্তিশালী বলয় ছিল। তিনি সেই বলয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে বর্তমানে তিনি নিষ্ক্রিয়। ফলে সেই বলয়ের নেতাদের কেউ আ জ ম নাছির আবার কেউ নওফেলের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই বলয়টি আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে বলে দলীয় একাধিক সূত্র মনে করে। নাছির-নওফেলের অনুসারী দুই ধারা কেবল নগর আওয়ামী লীগে নয়; তা সক্রিয় রয়েছে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ছাত্রলীগেও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দুই শীর্ষ নেতার নামে চলে সংগঠন। দুই গ্রুপে দখল-বেদখল, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। দ্বিধা-বিভক্তি রয়েছে ওয়ার্ড এবং থানা পর্যায়েও। গ্রুপিংয়ের কারণে নির্ধারিত সময়ে ইউনিট, ওয়ার্ড ও থানা সম্মেলন শেষ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ওয়ার্ড বা থানা পর্যায়ে সম্মেলন করতে গেলেই দুপক্ষের মতবিরোধ ও মতভিন্নতা সামনে আসে। তাই তারিখ নির্ধারণ হলেও আগামী ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনও হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংঘাত এড়াতে শীর্ষ পদে দুই ধারা থেকে দুজনকে পদ দেওয়া হয়। পুরো কমিটিতে দুই ধারার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করে ‘ব্যালেন্স’ করা এখানে একটি অঘোষিত রীতি। নগর যুবলীগের সম্মেলন হয়েছে এ বছর ৩০ মে। কিন্তু এ ছয় মাসেও কমিটি ঘোষণা হয়নি। মনে করা হচ্ছে, দুই ধারার ব্যালেন্স কমিটি নির্ধারণ করতে না পারায় নেতৃত্ব ঘোষণা করা হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও জনসভাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবলীগ এক মাস ধরে চট্টগ্রাম মহানগরে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে। পদপ্রত্যাশীরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সবটুকু ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

নগরে সভাপতি পদে অন্যতম দাবিদার ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এম আর আজিম এবং অপরজন দিদারুল আলম নাদির। এ দুজন চট্টগ্রামের স্থানীয় দুই নেতার অনুসারী। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা উপলক্ষ্যে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এম আর আজিমের কর্মতৎপরতা ছাড়িয়ে গেছে সবাইকে। লোক জমায়েতের প্রচারণায় তার নেতৃত্বে শহরে দৃষ্টিনন্দন কয়েক হাজার মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রা নেতাকর্মীদের মন কেড়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে দেবাশীষ পাল দেবু ও আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা পৃথকভাবে স্থানীয় দুই নেতার অনুসারী। দুজনের মধ্যে আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের কর্মতৎপরতা ছিল লক্ষণীয়।

৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা এক টেবিলে বসেছেন। এক মাস ধরে কাজ চালিয়ে গেছেন। কখনো কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কখনো নিজেরাই সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে থেকে দফায় দফায় বর্ধিত সভা করেছেন। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে করেছেন কর্মিসভা। আ জ ম নাছির এবং নওফেলও প্রস্তুতি সভায় এক টেবিলে একাধিকবার বসেছেন। প্রধানমন্ত্রী তথা দলীয় প্রধানের আগমন এবং জনসভা সামনে রেখে সবার মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতে এক অভূতপূর্ব ঐক্য লক্ষ করা গেছে। দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা জানান, এই ঐক্যের কারণেই মূলত প্রধানমন্ত্রীর জনসভা সফল হয়েছে। বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা বা সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। জনসভার সমন্বয়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, একটি সফল জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে নাছির তার কর্মদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। সবাইকে, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপকেও এক ছাতার নিচে আনতে পেরেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন কেন্দ্রীয় দুই নেতা।

আ জ ম নাছির উদ্দীন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, বড় দল হিসাবে নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতা বা মতপার্থক্য থাকে। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় প্রধান যেখানে উপস্থিত হবেন সেখানে অন্য সবকিছুই তুচ্ছ। আমরা চেষ্টা করেছি ঐক্যবদ্ধভাবে জনসভার আয়োজন করতে। ৪ ডিসেম্বরের জনসভায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুশি হয়েছেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে আমাকে বিষয়টি বলেছেন। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে এখানেই আমার সার্থকতা।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, জেলা সম্মেলন সামনে রেখে আমরা কাজ করছি। পদ-পদবি পেতে সবাই চায়। সেটা যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করতে হয়। এটা করতে গিয়ে কোনো নেতা মন্ত্রী বা এমপি বিভেদ সৃষ্টি করলে, গ্রুপিং করলে সেটা দলের জন্য ক্ষতি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবেই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর জনসভাকে আমরা সবাই মিলে সফল করেছি। যেহেতু সামনে জাতীয় নির্বাচন। তাই কোনো ধরনের গ্রুপিং-কোন্দলকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। বৃহত্তর স্বার্থে সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। নেতাকর্মীদের কাছে আমরা সেটাই প্রত্যাশা করি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন