ঢাকার প্রবেশ পথে ব্যাপক তল্লাশি
jugantor
ঢাকার প্রবেশ পথে ব্যাপক তল্লাশি

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার প্রবেশপথে ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনলাইনেও রয়েছে তাদের সতর্কতা। সড়ক-মহাসড়কে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ।

যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে র‌্যাবের হেলিকপ্টার। বাড়তি নিরাপত্তায় নামানো হয়েছে পাঁচ হাজার আনসার সদস্য। রাজধানীর মোড়ে মোড়েও চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। টার্মিনাল এলাকায় পুলিশি কার্যক্রম অনেক বেশি দেখা গেছে।

দূরপাল্লার বাসে সব যাত্রীকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্দেহভাজনদের আটকও করা হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা অন্যান্য দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার অনেক কম দেখা গেছে। রেলপথ ও সড়কপথে যাত্রী সংখ্যাও তুলনামূলক অনেক কম।

রেল ও যাত্রীবাহী পরিবহণগুলোতে দাঁড়ানো যাত্রী দেখা যায়নি। সরেজমিন ঘুরে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে র‌্যাব ফোর্সেস। যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নাশকতা রোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

জনগণের নিরাপত্তা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াও, যে কোনো ধরনের হামলা ও নাশকতা রোধে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, স্থান ও প্রবেশপথসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে র‌্যাব ফোর্সেসের চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

১০ ডিসেম্বরকে ঘিরে বিভিন্ন দুস্কৃতকারী ও সুযোগ সন্ধানীদের বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির তৎপরতা রোধে দেশব্যাপী র‌্যাবের কার্যক্রম চলছে। অনলাইনে দুস্কৃতকারীরা যাতে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সেজন্য সার্বক্ষণিক সাইবার নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও, যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব স্পেশাল ফোর্স টিম, ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও র‌্যাবের হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।

সরেজমিন রাজধানীর প্রবেশপথ উত্তরার আবদুল্লাহপুর, কমলাপুর রেল স্টেশন, লঞ্চ ঘাট, গাবতলী, পোস্তগোলা ব্রিজ, বাবুবাজার ব্রিজ, সদরঘাট, পূর্বাচল ৩০০ ফিট, কাঁচপুর ব্রিজসহ বেশকিছু পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ডিএমপির থানাগুলোতেও বাড়ানো হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা। তিনজনকে একসঙ্গে দেখলেই থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে নেওয়া হচ্ছে থানাতে।

জানা গেছে, প্রতিটি জোনের সব থানাকে ১০-১২ জন করে অফিসার ও কনস্টেবল নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে কয়েকটি টিম করে পাড়া-মহল্লায় তল্লাশি ও অভিযানের নামে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সহায়তায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বাসায় বাসায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

চেকপোস্টে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, উপরের নির্দেশে তারা রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে যেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে সেই দিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।

যুগান্তরের সিদ্ধিরগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ অংশের মৌচাক এলাকায় তল্লা?শি চালা?চ্ছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলরত কারও আচরণ ও গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলেই তাকে তল্লাশি করছে পুলিশ। মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা প্রাইভেট কার, সিএনজি, মোটরসাইকেল, রিকশাসহ দূরপাল্লার বাসগুলোকে থামিয়ে তল্লাশি করছে পুলিশ। দূর থেকে আশা যাত্রীদের করা হচ্ছে নানা প্রশ্ন।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, কেউ যেন মহাসড়কে নাশকতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য আমাদের এই তল্লাশি অভিযান চলছে। গাড়ি ভাঙচুর বা আগুন দেওয়ার মতো নাশকতা যেন কেউ না ঘটাতে পারে সেজন্য আমরা চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছি। আমাদের এ তল্লাশি চলতে থাকবে।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এবং শ্রীপুর উপজেলার জৈনা বাজার এলাকায় পুলিশ প্রতিটি গাড়ি ও যাত্রীদের তল্লাশি করছে। গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীতেও পুলিশের চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সব যানবাহন কালিয়াকৈর হয়ে এবং ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জের যানবাহন শ্রীপুরের জৈনাবাজার দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে।

চেকপোস্টে থাকা পুলিশ সদস্যরা সন্দেহভাজন মোটরসাইকেল, পিকআপ, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক গতিরোধ করে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করছে। যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ, বস্তা, মোবাইল ফোন চেক করছে। এতে যাত্রী ও চালকরা অনেকেই অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনাবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে-ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর অঞ্চলের যাত্রীবাহী বাসগুলো থামিয়ে বাসের ভেতর ও পরিবহণ চালকদের কাগজপত্র তল্লাশি করছে। বিশেষ করে ঢাকামুখী পরিবহণে এসব তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে।

আলম এশিয়া পরিবহণের চালক আবু সাঈদ বলেন, তল্লাশি থেকে কোনো যাত্রীবাহী পরিবহণ বাদ পড়ছে না।

একই পরিবহণের যাত্রী শরিফুল ইসলাম বলেন, তল্লাশি করে পুলিশ গাড়িতে কিছু পায়নি। কিন্তু আমাদের আধা ঘণ্টার মতো সময় নষ্ট হচ্ছে।

কালিয়াকৈর থানার এসআই আজিম হোসেন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড যেন না ঘটে, সেজন্য বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। চেকপোস্টের মাধ্যমে কাউকে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।

বিনিময় পরিবহণের চালক আবুল আরীম বলেন, ঢাকায় যাওয়ার পথে টাঙ্গাইল, মির্জাপুর ও কালিয়াকৈর চন্দ্রায় পুলিশের চেকপোস্ট চোখে পড়েছে। তারা আমাদের যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ঢাকায় ১০ তারিখের বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করেই এ তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে ধারণা। যাত্রীদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। যে যার মতো জরুরি কাজে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথে পুলিশ তাদের গাড়ি থামিয়ে দেহ তল্লাশিসহ মোবাইল ফোনের ব্যক্তিগত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ, ছবি ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখছে। তবে তল্লাশির তালিকায় বেশি রয়েছে মোটরসাইকেল।

গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান আহমেদ সরকার জানান, ঢাকায় বিএনপির সমাবেশকে সামনে রেখে গাড়িতে এখন সাধারণ মানুষ (যাত্রী) কমে গেছে। তাদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ যাত্রী ছাড়াও চালক/গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা/নিরীক্ষা করছে। তবে কোথাও কাউকে হয়রানির তথ্য পাওয়া যায়নি।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম জানান, ১ ডিসেম্বর থেকেই আমাদের বিশেষ অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহাসড়কে গাড়িতে তল্লাশি চলছে। প্রতি থানার আওতায় দুটি করে চেকপোস্টে এ অভিযান চলছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় যেহেতু ১০ লাখ লোকের সমাগম করার কথা শোনা যাচ্ছে সেহেতু গমনকারীদের সঙ্গে অবৈধ কিছু রয়েছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। এতগুলো লোকের সমাগম হলে দেশের অনেক জেলার লোকজন গাজীপুরের ওপর দিয়েই রাজধানীতে প্রবেশ করবে। সেজন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। আর এ তৎপরতার জন্যই তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নয়াপল্টনে সংঘর্ষের পর রাজধানীর প্রতিটি থানায় আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। আনসার সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ১০ ডিসেম্বরের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকা শহরে পাঁচ হাজার আনসার সদস্য নামানো হয়েছে। তারা পরিবেশ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ডিএমপির ৫০টি থানাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করেই দায়িত্ব পালন করবেন।

এ বিষয়ে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, আনসার সদস্যরা সব সময়ই পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ১০ ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন করে রাজধানীতে কিছু আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

যাত্রাবাড়ী : যাত্রাবাড়ী (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের শ্যামপুর বাজার, পোস্তগোলা এলাকায় প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসিয়েছে যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা পুলিশ। এসব স্থানে বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে তারা। প্রতিটি চেকপোস্টে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা বাস, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য পরিবহণও তল্লাশি করা হয়েছে। এ সময় পরিবহণের কাগজপত্রও যাচাই-বাছাই করতে দেখা গেছে।

উত্তরা : উত্তরা পশ্চিম (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার ঢাকার প্রবেশপথ উত্তরার আব্দুল্লাহপুর চেক পয়েন্টে যাত্রী-পথচারীদের ব্যাগ ও পকেট তল্লাশি করছে পুলিশ। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গ থেকে ছেড়ে আসা দূরপাল্লার বাস থেকে শুরু করে ঢাকামুখী সব ধরনের গণপরিবহণে নজরদারি চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সিএনজি, মোটরসাইকেল এমনকি রিকশা থেকে যাত্রীদের নামিয়ে তাদের ব্যাগ ও দেহ তল্লাশি করতে দেখা গেছে। পুলিশি তল্লাশিতে যাত্রীদের কেউ কেউ ভোগান্তির কথাও প্রকাশ করেছেন।

ঢাকার প্রবেশ পথে ব্যাপক তল্লাশি

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামীকাল বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার প্রবেশপথে ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনলাইনেও রয়েছে তাদের সতর্কতা। সড়ক-মহাসড়কে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ।

যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে র‌্যাবের হেলিকপ্টার। বাড়তি নিরাপত্তায় নামানো হয়েছে পাঁচ হাজার আনসার সদস্য। রাজধানীর মোড়ে মোড়েও চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। টার্মিনাল এলাকায় পুলিশি কার্যক্রম অনেক বেশি দেখা গেছে।

দূরপাল্লার বাসে সব যাত্রীকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্দেহভাজনদের আটকও করা হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা অন্যান্য দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার অনেক কম দেখা গেছে। রেলপথ ও সড়কপথে যাত্রী সংখ্যাও তুলনামূলক অনেক কম।

রেল ও যাত্রীবাহী পরিবহণগুলোতে দাঁড়ানো যাত্রী দেখা যায়নি। সরেজমিন ঘুরে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে র‌্যাব ফোর্সেস। যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নাশকতা রোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

জনগণের নিরাপত্তা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াও, যে কোনো ধরনের হামলা ও নাশকতা রোধে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, স্থান ও প্রবেশপথসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে র‌্যাব ফোর্সেসের চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

১০ ডিসেম্বরকে ঘিরে বিভিন্ন দুস্কৃতকারী ও সুযোগ সন্ধানীদের বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির তৎপরতা রোধে দেশব্যাপী র‌্যাবের কার্যক্রম চলছে। অনলাইনে দুস্কৃতকারীরা যাতে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সেজন্য সার্বক্ষণিক সাইবার নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও, যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব স্পেশাল ফোর্স টিম, ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও র‌্যাবের হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।

সরেজমিন রাজধানীর প্রবেশপথ উত্তরার আবদুল্লাহপুর, কমলাপুর রেল স্টেশন, লঞ্চ ঘাট, গাবতলী, পোস্তগোলা ব্রিজ, বাবুবাজার ব্রিজ, সদরঘাট, পূর্বাচল ৩০০ ফিট, কাঁচপুর ব্রিজসহ বেশকিছু পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ডিএমপির থানাগুলোতেও বাড়ানো হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা। তিনজনকে একসঙ্গে দেখলেই থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে নেওয়া হচ্ছে থানাতে।

জানা গেছে, প্রতিটি জোনের সব থানাকে ১০-১২ জন করে অফিসার ও কনস্টেবল নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে কয়েকটি টিম করে পাড়া-মহল্লায় তল্লাশি ও অভিযানের নামে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সহায়তায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বাসায় বাসায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

চেকপোস্টে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, উপরের নির্দেশে তারা রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে যেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে সেই দিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।

যুগান্তরের সিদ্ধিরগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ অংশের মৌচাক এলাকায় তল্লা?শি চালা?চ্ছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলরত কারও আচরণ ও গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলেই তাকে তল্লাশি করছে পুলিশ। মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা প্রাইভেট কার, সিএনজি, মোটরসাইকেল, রিকশাসহ দূরপাল্লার বাসগুলোকে থামিয়ে তল্লাশি করছে পুলিশ। দূর থেকে আশা যাত্রীদের করা হচ্ছে নানা প্রশ্ন।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, কেউ যেন মহাসড়কে নাশকতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য আমাদের এই তল্লাশি অভিযান চলছে। গাড়ি ভাঙচুর বা আগুন দেওয়ার মতো নাশকতা যেন কেউ না ঘটাতে পারে সেজন্য আমরা চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছি। আমাদের এ তল্লাশি চলতে থাকবে।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এবং শ্রীপুর উপজেলার জৈনা বাজার এলাকায় পুলিশ প্রতিটি গাড়ি ও যাত্রীদের তল্লাশি করছে। গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীতেও পুলিশের চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সব যানবাহন কালিয়াকৈর হয়ে এবং ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জের যানবাহন শ্রীপুরের জৈনাবাজার দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে।

চেকপোস্টে থাকা পুলিশ সদস্যরা সন্দেহভাজন মোটরসাইকেল, পিকআপ, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক গতিরোধ করে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করছে। যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ, বস্তা, মোবাইল ফোন চেক করছে। এতে যাত্রী ও চালকরা অনেকেই অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনাবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে-ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর অঞ্চলের যাত্রীবাহী বাসগুলো থামিয়ে বাসের ভেতর ও পরিবহণ চালকদের কাগজপত্র তল্লাশি করছে। বিশেষ করে ঢাকামুখী পরিবহণে এসব তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে।

আলম এশিয়া পরিবহণের চালক আবু সাঈদ বলেন, তল্লাশি থেকে কোনো যাত্রীবাহী পরিবহণ বাদ পড়ছে না।

একই পরিবহণের যাত্রী শরিফুল ইসলাম বলেন, তল্লাশি করে পুলিশ গাড়িতে কিছু পায়নি। কিন্তু আমাদের আধা ঘণ্টার মতো সময় নষ্ট হচ্ছে।

কালিয়াকৈর থানার এসআই আজিম হোসেন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড যেন না ঘটে, সেজন্য বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। চেকপোস্টের মাধ্যমে কাউকে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।

বিনিময় পরিবহণের চালক আবুল আরীম বলেন, ঢাকায় যাওয়ার পথে টাঙ্গাইল, মির্জাপুর ও কালিয়াকৈর চন্দ্রায় পুলিশের চেকপোস্ট চোখে পড়েছে। তারা আমাদের যাত্রীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ঢাকায় ১০ তারিখের বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করেই এ তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে ধারণা। যাত্রীদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। যে যার মতো জরুরি কাজে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথে পুলিশ তাদের গাড়ি থামিয়ে দেহ তল্লাশিসহ মোবাইল ফোনের ব্যক্তিগত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ, ছবি ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখছে। তবে তল্লাশির তালিকায় বেশি রয়েছে মোটরসাইকেল।

গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান আহমেদ সরকার জানান, ঢাকায় বিএনপির সমাবেশকে সামনে রেখে গাড়িতে এখন সাধারণ মানুষ (যাত্রী) কমে গেছে। তাদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ যাত্রী ছাড়াও চালক/গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা/নিরীক্ষা করছে। তবে কোথাও কাউকে হয়রানির তথ্য পাওয়া যায়নি।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম জানান, ১ ডিসেম্বর থেকেই আমাদের বিশেষ অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহাসড়কে গাড়িতে তল্লাশি চলছে। প্রতি থানার আওতায় দুটি করে চেকপোস্টে এ অভিযান চলছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় যেহেতু ১০ লাখ লোকের সমাগম করার কথা শোনা যাচ্ছে সেহেতু গমনকারীদের সঙ্গে অবৈধ কিছু রয়েছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। এতগুলো লোকের সমাগম হলে দেশের অনেক জেলার লোকজন গাজীপুরের ওপর দিয়েই রাজধানীতে প্রবেশ করবে। সেজন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। আর এ তৎপরতার জন্যই তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নয়াপল্টনে সংঘর্ষের পর রাজধানীর প্রতিটি থানায় আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। আনসার সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ১০ ডিসেম্বরের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকা শহরে পাঁচ হাজার আনসার সদস্য নামানো হয়েছে। তারা পরিবেশ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ডিএমপির ৫০টি থানাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করেই দায়িত্ব পালন করবেন।

এ বিষয়ে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, আনসার সদস্যরা সব সময়ই পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ১০ ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন করে রাজধানীতে কিছু আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

যাত্রাবাড়ী : যাত্রাবাড়ী (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের শ্যামপুর বাজার, পোস্তগোলা এলাকায় প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসিয়েছে যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা পুলিশ। এসব স্থানে বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে তারা। প্রতিটি চেকপোস্টে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা বাস, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য পরিবহণও তল্লাশি করা হয়েছে। এ সময় পরিবহণের কাগজপত্রও যাচাই-বাছাই করতে দেখা গেছে।

উত্তরা : উত্তরা পশ্চিম (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার ঢাকার প্রবেশপথ উত্তরার আব্দুল্লাহপুর চেক পয়েন্টে যাত্রী-পথচারীদের ব্যাগ ও পকেট তল্লাশি করছে পুলিশ। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গ থেকে ছেড়ে আসা দূরপাল্লার বাস থেকে শুরু করে ঢাকামুখী সব ধরনের গণপরিবহণে নজরদারি চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সিএনজি, মোটরসাইকেল এমনকি রিকশা থেকে যাত্রীদের নামিয়ে তাদের ব্যাগ ও দেহ তল্লাশি করতে দেখা গেছে। পুলিশি তল্লাশিতে যাত্রীদের কেউ কেউ ভোগান্তির কথাও প্রকাশ করেছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন