এমডিদের সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহারও নামবে সিঙ্গেল ডিজিটে

প্রাথমিকভাবে রফতানি ও নারী উদ্যোক্তারা এ সুযোগ পাবেন * ৭ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে আমানত পাবে * এক সপ্তাহের মধ্যে নিজ নিজ পর্ষদে সিদ্ধান্ত নেবে

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) গভর্নর ফজলে কবির

ব্যাংকের পর এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সুদহার এক অঙ্ক (সিঙ্গেল ডিজিটে) নামিয়ে আনবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নিজ নিজ পর্ষদে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।

এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে রফতানি, উৎপাদনশীল খাত ও নারী উদ্যোক্তা ঋণে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। পর্যায়ক্রমে অন্য সব ঋণেও সুদহার কমবে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডিদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্ত হয়।

এর আগে ২০ জুন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেয়ার ঘোষণা দেয়। এরপরের দিন তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে দেখা করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করে।

ওইদিনই গভর্নর ফজলে কবির আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) কয়েকজন নেতার সঙ্গে অনির্ধারিত একটি বৈঠক করেন। বৈঠকে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিতে বলেন।

পরবর্তীকালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা বসে সুদহার ঠিক করে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠকের কথা বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে এমডিরা ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা এসকে সুর চৌধুরী, ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, আহমেদ জামালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে (সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ) নামিয়ে আনবে।

এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নিজ নিজ পর্ষদ বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের তহবিলের একটি অংশ আসে ব্যাংক থেকে। সরকারি ব্যাংকগুলো বেসরকারি ব্যাংককে ৬ শতাংশ সুদে তহবিল জোগানে সম্মত হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে যেন ৭ শতাংশ সুদে অর্থ পায় সে বিষয়ে অনুরোধ করেছে। তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে।

ফলে এসব প্রতিষ্ঠান শুধু স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহের ওপর জোর না দিয়ে যেন দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ করে সে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আর এজন্য বন্ড মার্কেটে জোর দিতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদনে কোনো জটিলতা থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটা আলোচনা করবে।

বৈঠক শেষে বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সুদহার কমাতে সরকারি মনোভাবের সঙ্গে তারাও একমত।

রফতানি, উৎপাদনশীল খাত ও এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেয়া হবে। আর আমানত নেবে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে। সুদহার কমাতে মঙ্গলবার থেকেই তারা কাজ শুরু করবেন। তবে এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে ১ থেকে ২ মাস সময় লাগবে।

আর সব ক্ষেত্রে সুদহার কমলেও ভোক্তা ঋণ, কার বা আবাসন ঋণে সুদহার এখন ১২ শতাংশের মতো থাকবে। তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে যে তহবিল নেয় তা ব্যাংকের মতো ৬ শতাংশে না পেলেও সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে পাবেন বলে তারা আশা করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। আর গড়ে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ সুদে আমানত নেয়।

আর ঋণ বিতরণ করে গড়ে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ সুদে। আলোচ্য সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্পের মেয়াদি ঋণে সুদ নেয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর যেখানে সুদহার ছিল ৯ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকগুলো গ্রাহক থেকে চলতি, সঞ্চয়ী, মেয়াদিসহ বিভিন্ন ধরনের আমানত নিতে পারে।

তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তিন মাসের কম মেয়াদে কোনো আমানত নিতে পারে না। আবার ব্যাংকের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কম হওয়ায় আমানত সংরক্ষণে গ্রাহকরা তেমন আগ্রহ দেখান না।

ফলে ব্যাংকের তুলনায় বেশি সুদ দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী আমানত না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহে ধরনা দিতে হয় ব্যাংকে। আমানতের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কার্যক্রম চালাতে হয়।

বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের ২৩ শতাংশের মতো আসে ব্যাংক থেকে। আবার ব্যাংকের চেয়ে আমানতের গড় সুদহারও তুলনামূলক বেশি। ফলে ব্যাংকের তুলনায় সব সময় এসব প্রতিষ্ঠানের সুদহার বেশি থাকে।

আইপিডিসি ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোমিনুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনবে। তবে ব্যাংকগুলো যেখানে ৬ শতাংশে সুদে আমানত সংগ্রহ করবে, আমাদের সেখানে ৭ শতাংশে সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হবে।

একই সঙ্গে অগ্রাধিকার খাত, যেমন শিল্প ঋণ, মহিলা উদ্যোক্তাদের ঋণের সুদহার তারা খুব তাড়াতাড়িই এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে পারবেন।

আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে কাজ শুরু করা হবে। তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে থাকে, তাই অর্থের সংস্থান করতে বন্ড মার্কেটকে চাঙ্গা করতে হবে।

প্রতিবেশী ভারতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট তহবিলের ৬০ শতাংশই আসে বন্ড মার্কেট থেকে, ব্যতিক্রম শুধু আমাদের দেশে।

বন্ড মার্কেটকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা রয়েছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে বন্ড মার্কেট চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে সব প্রতিবন্ধকতা দূরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করেছে।

তিনি বলেন, বন্ড মার্কেট চাঙ্গা হলে সহজেই কম সুদে ঋণ বিতরণ করা যাবে। এ বিষয়ে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।