মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ

বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা চায় ঢাকা

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বার্তা দেবেন জাতিসংঘ মহাসচিব * এ সফরের পর রোহিঙ্গা ইস্যুটি আবার বিশ্বসভায় উঠবে * আগামী সপ্তাহে কানাডা সরকারের বিশেষ দূত বব রে ঢাকা আসছেন

  মাসুদ করিম ০৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা নির্যাতন

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সফরকে খুবই ইতিবাচক মনে করছে বাংলাদেশ। ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের গুরুত্ব অনুধাবনে বিশ্বকে নতুন করে বার্তা দেবে এই সফর। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর যে চাপের কথা বলা হচ্ছে, তা খুব বেশি কাজ হচ্ছে না। দেশটি কারও আহ্বানে তেমন সাড়া দিচ্ছে না। এ অবস্থায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চাপ কার্যকর করতে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চায় বাংলাদেশ।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গা নির্যাতনে জড়িত জেনারেলদের বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ এবং তাদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাচ্ছে। ঢাকার প্রত্যাশা- জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিরাপত্তা পরিষদে তুলে ধরবেন এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করবেন।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ৩০ জুন তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, মিয়ানমারের ওপর এমন চাপ প্রয়োগ করতে হবে যাতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাদের করণীয় বিষয় অনুধাবন করতে পারে। তিনি রোহিঙ্গাদের দেখে তার ‘বুক ভেঙে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন। রোহিঙ্গাদের ওপর যারা বর্বরতা চালিয়েছে, তাদের বিচার এবং রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলেন গুতেরেস। এসবই বিশ্বের কাছে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্তা।

পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফর খুবই ভালো হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করতে তিনি মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের আশা থাকবে, জাতিসংঘ মহাসচিব নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে ব্রিফ করবেন।’

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন হয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি কাড়তে সমর্থ হন। তারপর থেকে একে একে বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেন। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসছেন কানাডা সরকারের বিশেষ দূত বব রে। এমন চাপেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার আন্তরিকতার পরিচয় দেয়নি। জাতিসংঘ মহাসচিবের এবারের সফরের পরও সংকট নিরসনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল মোমেন এ বিষয়ে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের আগমনের ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আবার বিশ্বসভায় উঠবে। তিনি জাতিসংঘ সদর দফতরে গিয়ে রিপোর্ট করবেন। তিনি এবার অনেক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এ সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি, মিয়ানমারকেই এর সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর হামলা করার অপরাধে অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। এসব কথা তিনি আগেও বলেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের আসাটা ইতিবাচক। কেননা চীন ও রাশিয়া এ সংকট সমাধানে রাজি না থাকলে তিনি আসতেন না। তবে মহাসচিবের মতামতেই জাতিসংঘ চলে না। জাতিসংঘ চলে সদস্যদের মতামতে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ পাঁচ দেশ হল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া। তাদের মধ্যে চীন ও রাশিয়াকে এক টেবিলে আনতে পারলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে।’

জাতিসংঘে সাবেক এই স্থায়ী প্রতিনিধি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা হল এখন আমাদের গলার কাঁটা। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে এবং বিভিন্ন দেশে দূত পাঠিয়ে মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই গলার কাঁটা দূর করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপে যেভাবে অভিবাসী ভাগ করে নেয়া হচ্ছে, রোহিঙ্গাদেরও একটা সম্মেলন করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে ভাগ করে দেয়া যায়। এতে করে আমাদের ওপর থেকে বোঝা কিছুটা লাঘব হবে। এছাড়াও সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে এই ইস্যুতে বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে বড় বড় সফর করার মাধ্যমে কোনো সমাধান হবে না।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার অবস্থান প্রথম থেকেই আমাদের দেশের মতামতের মতো ছিল। ফলে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তার সমর্থন আমরা সবসময়ই প্রত্যাশা করতে পারি। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান করতে হলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠিন চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এ চাপ দিতে পারে শুধু নিরাপত্তা পরিষদ। কিন্তু তারা আদৌ চাপ দেবে কি না, তা সন্দেহ আছে। চীনকে এ ব্যাপারে রাজি করাতে পারলে কাজ হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এটা করা সম্ভব না হলে রোহিঙ্গাদের সেখানে পাঠানো সম্ভব হবে না। এসব ব্যাপারে চীনের সহায়তা দরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের খাওয়া-পরার জন্য বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।’

অ্যান্তোনিও গুতেরেস ২০০৮ সালেও একবার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি তখন জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রধান ছিলেন। তখনও তিনি কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। এবার তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে বাংলাদেশ সফর করলেন। রোহিঙ্গা ইস্যুটি তার জানা থাকায় এ ব্যাপারে তিনি স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমেনা মহসিন যুগান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের দুইটি বিকল্প পথ আছে। প্রথম পথ হল, মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফেরত নিতে বাধ্য করা। আরেকটি বিকল্প হল, যেসব রোহিঙ্গা এসেছেন তাদের বিভিন্ন দেশে পাঠানো। এভাবে বোঝা সবাই ভাগাভাগি করতে পারে।’

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter