তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার প্রস্তুতি বিএনপির

সমন্বয়কের দায়িত্বে স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য * ভোটের দিন নেতাকর্মীদের মাঠে থাকতে কঠোর নির্দেশনা * সরকারবিরোধী বিভিন্ন দলের সমর্থন আদায়ের উদ্যোগ

  হাবিবুর রহমান খান ০৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিকে নজর বিএনপির। তিন সিটিতেই জয়ী হতে নানা কৌশল প্রণয়নে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

তাদের মতে, খুলনা ও গাজীপুরের মতো বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হবে না। জাল ভোট, কেন্দ্র দখলসহ যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তাই ভোটের দিন নেতাকর্মীরা যাতে মাঠে থাকে সেই ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে এ ব্যাপারে করণীয় চূড়ান্ত করতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের দেয়া হয়েছে বিশেষ দায়িত্ব।

এছাড়া তিন সিটির নির্বাচন পরিচালনায় কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য। মির্জা আব্বাসকে বরিশালে, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে রাজশাহীতে এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দেয়া হয়েছে সিলেটের দায়িত্ব। দলের পাশাপাশি জোটগতভাবেও গণসংযোগ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য শরিকদের নিয়ে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক কমিটিও করা হয়েছে। তারা একযোগে তিন সিটিতে প্রচার চালাবে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র আরও জানায়, তিন সিটিতে জোটের পাশাপাশি সরকারবিরোধী দলগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন তারা। জাতীয় নির্বাচনের আগে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে চান দলটির নীতিনির্ধারকরা। এ ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছেন তারা।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন তিন সিটির নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও এর মধ্য দিয়ে আগামী দিনের রাজনৈতিক চিত্র পাওয়া যাবে। বিশেষ করে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মনোভাব স্পষ্ট হবে। তাদের সেই মনোভাব দেখেই জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে কৌশল চূড়ান্ত করা হবে।

দুই সিটিতে নানা অনিয়মের পরও নির্বাচনে থাকার যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে দলটির নীতিনির্ধারকরা জানান, জাতীয় নির্বাচনের আগে এ সিটি নির্বাচনগুলোর দিকে জনগণ, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার বিশেষ নজর থাকবে। প্রকাশ্যে সিল মারা, বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে না দেয়া, পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করার ঘটনাগুলো সরকারের বিপক্ষেই যাচ্ছে। তিন সিটির নির্বাচনেও যদি সরকার একই ধরনের কৌশল নেয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) আরও কলঙ্কিত হবে। এতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপির দাবি আরও জোরালো হবে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে তিন সিটিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বিএনপি তা প্রার্থী চূড়ান্তেই প্রমাণিত হয়েছে। বরিশালে বর্তমান মেয়র আহসান হাবীব কামালের পরিবর্তে শক্তিশালী প্রার্থী দিয়েছে দলটি। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারকে সেখানে প্রার্থী করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আন্দোলনের পরিপূরক হিসেবে তারা সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নির্বাচনে তাদের মনোনীত প্রার্র্থীর জয় মানে আন্দোলনেরও জয়। এ জয়ের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিকে আরও বেগবান করবে।

তিনি বলেন, দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থীকে জোর করে পরাজিত করার পরও সরকারের নির্লজ্জ গণবিরোধী চরিত্র উন্মোচনের জন্য আমরা তিন সিটিতে অংশ নিচ্ছি। এ তিন সিটিতে সরকার একই ভূমিকা পালন করলে দেশবাসীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সরকারের ভূমিকা দেখবে। এরপর বিএনপি নতুন করে তাদের কর্মকৌশল চূড়ান্ত করবে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বিএনপি পিছপা হবে না।

খুলনা ও গাজীপুর সিটির নির্বাচনের পর বিএনপির মধ্যে কিছুটা হতাশা ভর করেছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এ তিন সিটিতেও সরকার ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করার চেষ্টা চালাবে। এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে যাবে না।

তারা মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জয়-পরাজয় উভয়কেই কাজে লাগাতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের প্রার্থী জয়ী হলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এটা প্রমাণিত হবে।

অন্যদিকে নির্বাচনে কারচুপি হলে সেটাকেও কাজে লাগানো যাবে। এ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় তাদের এ দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণিত হবে। এটাকে ইস্যু করে রাজপথে আন্দোলন জোরদার করা সম্ভব হবে। যাতে সবার সমর্থন পাওয়া যাবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী একটি দল। গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনগণের ভোটাধিকার আদায়ে তারা আন্দোলন করে যাচ্ছে। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তারা তিন সিটিতে নির্বাচনে থাকছে।

তিনি বলেন, খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। আগামী তিন সিটির নির্বাচনে সরকার ভোটাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে এবার জনগণ এর সমুচিত জবাব দেবে।

সূত্র জানায়, বিগত খুলনা ও গাজীপুরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনে প্রকাশ্যে নানা অনিয়ম হলেও তা প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। ভোটের দিন মাঠে ছিলেন না নেতাকর্মীরা। ঠুনকো অজুহাতে অনেক এজেন্ট কেন্দ্রে আসেনি। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শনিবার যুগ্ম-মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে নীতিনির্ধারকদের বৈঠকে এ ক্ষোভ জানানোর পাশাপাশি আগামী তিন সিটিতে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার পক্ষে মত দেয়া হয়। যে কোনো মূল্যে ভোটের দিন নেতাকর্মীদের মাঠে থাকতে হবে এবং ক্ষমতাসীনদের অনিয়মের জবাব দিতে প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদের এমন মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন নীতিনির্ধারকরা।

নেতাকর্মীরা যাতে মাঠে থাকেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে। তিন সিটির প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটি নির্বাচনের দিন পুরো কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবে। কেন্দ্রে এজেন্টদের উপস্থিতি এবং ভোটারদের কেন্দ্রে আনা নিশ্চিত করবেন তারা।

ভোটের দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন নেতা উপস্থিত না থাকলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। ওয়ার্ড কমিটিগুলো মনিটরিংয়ের জন্য থাকবে আলাদা কমিটি। এসব চিন্তাভাবনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় নেতারা ইতিমধ্যে তিন সিটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুরু করেছেন মতবিনিময়। ইতিমধ্যে রাজশাহীতে নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় করেছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। বুধবার রাজশাহীতে গেছেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। শিগগিরই বরিশাল ও সিলেটে যাবেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

জানতে চাইলে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে তিন সিটির ভোটকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আমরা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে চাই। ভোটাররা ভোট দিতে পারলে তিন সিটিতেই ধানের শীষের বিপুল জয় হবে। তিনি বলেন, তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে সরকার কোনো ষড়যন্ত্র করলে এবার ছাড় দেয়া হবে না। ভোট কারচুপির চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।

সূত্র জানায়, এ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহল যাতে কঠোর দৃষ্টি রাখে সেই উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ রাখছেন তারা।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter