যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ

ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুই-ই আছে

সতর্ক দৃষ্টি রাখছি-এফবিসিসিআই সভাপতি * এতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং সুবিধাভোগী হবে -ইএবি সভাপতি * এ মুহূর্তে বলা মুশকিল-ট্যারিফ কমিশন চেয়ারম্যান * এ যুদ্ধ ইইউ ও ভারতে ছড়িয়ে পড়লে বিপদ-বিজিএমইএ সভাপতি

  শাহ আলম খান ০৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। ছবি: বিবিসি বাংলা

বিশ্ব অর্থনীতির দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে গোটা বিশ্ব। এ নিয়ে আশঙ্কামুক্ত নয় বাংলাদেশও। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয়ভাবেও এ দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধের গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা, বাণিজ্য বিশ্লেষক ও সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। তবে কারও কাছ থেকেই বাংলাদেশে এ বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব কী হতে পারে- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও দায়িত্বশীল কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।

কেউ বলেছেন, এ যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশ সাময়িকভাবে লাভবান হবে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি হলে তা বিশ্ব অর্থনীতির গতিবিধি পরিবর্তন করতে পারে, তখন বাংলাদেশকেও তার মূল্য দিতে হতে পারে। কেউ বলেছেন, তৈরি পোশাক রফতানিনির্ভর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এ যুদ্ধ সম্ভাবনা তৈরি করবে। এতে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুই-ই আছে বলে সবাই একমত পোষণ করেছেন। তবে এ বাণিজ্য যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং তা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি ইউরোপসহ অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে তার ওপর নির্ভর করবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে কিংবা বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে গ্রাস করলে সার্বিকভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে যাবে। চূড়ান্তভাবে উদ্যোক্তা-ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে আমাদের মতো দেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কারণ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম উদীয়মান দেশ। অপরদিকে সম্ভাবনার কারণ হল- যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের দাবি ২০১৭ সালে আমদানি করা ৮ হাজার ২৮০ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাকের মধ্যে ২ হাজার ৭৩০ কোটি ডলারের পণ্য সরবরাহ করেছে চীন। যেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে ৫০৬ কোটি ডলারের পণ্য।

এখন উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে চীনের রফতানি কমবে। সেখানে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া তুলার ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের কারণে দুই দেশের তুলাই বাংলাদেশের জন্য সহজলভ্য হবে। এটা রফতানির সক্ষমতা বাড়াবে।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, দুই দেশের এ আচরণ বিশ্ব অর্থনীতিকে ভোগাবে। বিশ্ব বাণিজ্যে কেউ একা নয়। আবার দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয়ও নয়। এছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির এ ধরনের লড়াইয়ে বিশ্ব অর্থনীতি স্বস্তিতে থাকবে না। বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সম্পৃক্ত, তাই এর প্রভাব ও ধাক্কা এ দেশেও পড়বে। এখানে আন্তর্জাতিক মেরুকরণ ও ভূ-রাজনৈতিক যোগ-বিয়োগের অনেক বিষয় আছে। আমরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। ফলাফল কতটা খারাপ হবে, বা এর থেকে যদি ভালো কিছু আসেও সেটা কতটা ভালো হবে, তা ভবিষ্যতই বলবে। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সেটি বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিদায়ক কিছু হবে না।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটো দিকই রয়েছে। যদি এটি ছড়িয়ে পড়ে তবে বিশ্ববাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সঙ্কুচিত হবে বিশ্ববাণিজ্য। বাণিজ্য সঙ্কুচিত হলে আমরা যেহেতু বাণিজ্যের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল দেশ, তাই আমাদের আয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে ক্ষেত্রে আমাদের ওপর ঝুঁকি রয়েছে। আবার সীমিত আকারে হলে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চীনের শুল্ক বেড়ে যাবে। অপরদিকে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র শুল্কারোপ করায় ভারতও বেঁকে বসেছে। তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি পণ্যে শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছে। এটা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন-ভারত যেসব দেশ থেকে আমদানি করলে ওই শুল্কের সম্মুখীন হবে না, সেসব দেশের বাজারে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি সেরকম প্রস্তুতি রাখতে পারে তবে লাভ হবে। কারণ তারা বেরিয়ে কোনো না কোনো দেশে তো যাবে। তবে বাংলাদেশে নয় কেন?

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চীনের তৈরি পোশাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চহারে শুল্কারোপ করায় বাংলাদেশের জন্য একটি ভালো সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন বাড়তি শুল্কারোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ক্রয়ে বাংলাদেশ কিছু সুবিধা পেতে পারে।

বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ উচ্চহারের শুল্ক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে সেটা হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক বিষয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্যে অন্তর্ভুক্ত হলেও তেমন কোনো ক্ষতির মুখোমুখি হবে না। বরং তুলার ওপর পাল্টাপাল্টি উচ্চহারের শুল্কারোপের কারণে দুই দেশের বাজার সঙ্কুচিত হবে। এতে উদ্বৃত্ত তুলা বিক্রির জন্য তারা অন্য বাজার খুঁজবে এবং প্রতিযোগিতার কারণেই তুলার দাম কমবে। এখানে তৈরি পোশাক উৎপাদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। সেক্ষেত্রে তুলার দাম কমলে তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচও কমবে। একই সঙ্গে মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাক রফতানি সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে।

ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মো. জহিরউদ্দিন আহমেদ এনডিসি যুগান্তরকে বলেন, এ বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। এর ফলে সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে এ নিয়ে ট্যারিফ কমিশন একটি স্ট্যাডি করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের কিছু সুযোগ নেয়ার ক্ষেত্র আছে। তবে তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিকারকদের বার্গেনিং ক্যাপাসিটির ওপর। বৃহৎ দৃষ্টিকোণ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থায় থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ বাংলাদেশকে কতটা প্রভাবিত করবে সেটি বলার সময় এখনও আসেনি। আমাদের দেখতে হবে এটা কতদিন স্থায়ী হয়। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ বাণিজ্য যুদ্ধ চীনের বাইরে গিয়ে ইইউ এবং ভারতে সম্প্রসারিত হয় কিনা। এটা দীর্ঘমেয়াদি হলে ওই দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক হবে। তখন তাদের সামর্থ্য কমে গেলে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিজিএমইএ পর্যবেক্ষণে রেখেছে। প্রয়োজন দেখা দিলে সমীক্ষা করে দেখা হবে।

উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন বৃহস্পতিবার চীনের তিন হাজার ৪০০ কোটি ডলারের আমদানি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ কার্যকর করেছে। আরও এক হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে বলে জানানো হয়েছে। এর জবাবে বেইজিংও পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ভারতেরও কিছু পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করে। পাল্টা ভারতও কিছু পণ্যে শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছে। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক আরোপ করায় ভারতের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ কানাডাও।

jugantor-event-যুক্তরাষ্ট্রের-বাণিজ্য-যুদ্ধ-67548--1

ঘটনাপ্রবাহ : যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter