ইসির সঙ্গে মতবিনিময়ে লিটন-বুলবুল

কালো টাকা ছড়ানোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ৫৩ অভিযোগ

  আনু মোস্তফা ও তানজিমুল হক, রাজশাহী ব্যুরো ১৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুলবুল
ছবি: যুগান্তর

রাজশাহী সিটি নির্বাচনে কালো টাকা ছড়ানোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছেন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সমর্থিত হেভিওয়েট দুই মেয়রপ্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেছেন, ভোটের মাঠে কালো টাকা ব্যবহার করছে আওয়ামী লীগ। ভোটের তিন দিন আগ থেকে পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে আমি নির্বাচনে থাকব না।

আর আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের অভিযোগ, নৌকার গণজোয়ার আঁচ করে বোমাবাজি শুরু করেছে বিএনপি। কালো টাকা ছড়িয়ে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

বুধবার দুপুরে রাজশাহীতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্যোগে প্রার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রতিদ্বন্দ্বী এ দুই মেয়র এসব অভিযোগ করেন। তাদের এ ধরনের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে মতবিনিময় সভা রূপ নেয় একরকম বিতর্ক প্রতিযোগিতায়।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নিয়ে বাড়ছে উত্তাপ। এরই মধ্যে সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডের ২২ কাউন্সিলর প্রার্থীকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-২০১৮ এর রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত পরস্পরের বিরুদ্ধে ৫৩টি অভিযোগ দাখিল করেছেন আচরণবিধি লঙ্ঘনের।

ইসির মতবিনিময় সভায় ভোটের মাঠে কালো টাকা ও পোস্টার সন্ত্রাস চলছে- অভিযোগ এনে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী বুলবুল বলেন, সরকারদলীয় লোকদের দাপটে ভোট উৎসব নয়, যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন তোলেন নিজের নিরাপত্তা নিয়েও।

তবে সভার প্রধান অতিথি নির্বাচন কমিশনার (ইসি) শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, রাজশাহী সিটি নির্বাচন হবে ইতিহাসে স্মরণীয়। লিটনের প্রচার নিয়ে বিষোদ্গার করে তিনি বলেন, রাজশাহীতে পোস্টার সন্ত্রাস চলছে। আমার পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে পাশের ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হচ্ছে। এটি কোনো নির্বাচনের পরিস্থিতি নয়, এটি যুদ্ধের পরিস্থিতি। কালো টাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী পুরো নগরীকে পোস্টারে পোস্টারে ভরে ফেলেছেন।

বক্তব্য দিতে গিয়ে পাল্টা অভিযোগ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, কালো টাকা কাদের কাছে আছে, কারা কালো টাকা দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও করেছিল, মানুষ পুড়িয়েছিল এবং কারা হাজার হাজার কোটি কালো টাকার ব্যবহার করে দেশের রাজনীতিকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল, অবৈধ পন্থায় সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল, তা মানুষ জানে।

এদিকে নগরীতে প্রার্থীদের পোস্টার ও ফেস্টুনের ছড়াছড়ি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, শহরের অনেক স্থানে প্রার্থীদের ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ পোস্টার-ফেস্টুন আছে। এগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। কেবল নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট মাপেরই পোস্টার দিয়ে ভোটের প্রচারণা চালানো যাবে।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজশাহীর নির্বাচনী অবস্থা ভালো আছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য নির্বাচন কমিশন সজাগ রয়েছে। সচিবের আশা, তারা সফল ভোটের রেকর্ড গড়তে প্রস্তুতি শেষ করেছেন।

জেলা কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বাকযুদ্ধ শেষে মঞ্চ থেকে নেমে কোলাকুলি করেন মেয়র প্রার্থী লিটন ও বুলবুল। সোফায় বসেনও পাশাপাশি। অনুষ্ঠানে নির্বাচনের অন্য মেয়রপ্রার্থী এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরাও অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর-রহমান।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মনোনীত এবং ১৪ দল ও জাতীয় পার্টি সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ২১টি অভিযোগ রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ১৯টি অভিযোগ দাখিল করেছেন সংশ্লিষ্ট দফতরে।

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের দাখিলকৃত আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ছড়ানোর চেষ্টা ছাড়াও ধর্মের ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া কালো টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার অভিযোগও বুলবুলের বিপক্ষে দিয়েছেন লিটন।

লিটনের আইন উপকমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মুসাব্বিরুল ইসলাম অভিযোগে বলেন, রাতের আঁধারে নগরীর বিভিন্ন স্থানে নৌকার পোস্টার কেটে দেয়া ছাড়াও নির্বাচনী অফিস তছনছ করা হয়েছে। পাশাপাশি নগরীল বুথপাড়া, ডাশমারীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের সশস্ত্র ক্যাডাররা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ধানের শীষে ভোট না দিলে ভোট শেষে এলাকাছাড়া করার হুমকি দিয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করছে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী বুলবুল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী লিটনের বিরুদ্ধে ধানের শীষের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার তুলে ফেলা, রাতে বাইক বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছাড়াও ভোটারদের মধ্যে কালো টাকা ছড়ানোর অভিযোগ করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর সাগরপাড়ায় বিএনপির পথসভায় ককটেল হামলার অভিযোগও দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী। অন্যদিকে একই অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে করা হয়েছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে।

আওয়ামী লীগের অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্বাচনী পরিবেশ ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিএনপি প্রার্থী বুলবুলের লোকেরা নিজেরাই ককটেল ফাটিয়ে আলোচনায় আসতে চেয়েছে। এর মাধ্যমে বিএনপি প্রার্থী ভোটারদের সহানুভূতি পেতে এই কাজ করেছেন। তবে আওয়ামী লীগের দেয়া অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী বুলবুলের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী জেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু।

এদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেছেন, নির্বাচনী কার্যালয় ভাংচুরসহ প্রচার সন্ত্রাস চালিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠ দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও সমর্থকদের সঙ্গে কী আচরণ করা প্রয়োজন, তা মানছে না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। একের পর এক রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, বুলবুলের অভিযোগ অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, রাজশাহীতে ভোটারদের মধ্যে উন্নয়ন ইস্যুটি প্রধান হয়ে উঠেছে। এতে নৌকার পক্ষে জোয়ার দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নানাভাবে মিথ্যা অভিযোগ ও ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু তাতে তারা সফল হবে না। রাজশাহীর মানুষ এবার উন্নয়নকেই বেছে নেবেন। অযোগ্য কাউকে নগর ভবনে পাঠাবেন না।

এদিকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কমিশনের পদক্ষেপ সম্পর্কে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আতিয়ার রহমান জানান, এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষে মোট ৫৩টি অভিযোগ এসেছে। এগুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। যেখানে যেমন প্রয়োজন, সেখানে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×