হামলার প্রতিবাদে ঢাবিতে সংহতি সমাবেশে শিক্ষকরা

শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিপীড়নে জড়িতদের বিচার করুন

কোটার যৌক্তিক সংস্কার ও আটকদের মুক্তি দাবি * একাত্মতা ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের সংহতি প্রকাশ

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ঢাবি প্রতিনিধি

ঢাবি, জাবি ও বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৭০ জন শিক্ষক সংহতি সমাবেশে অংশ নেন। ছবি: যুগান্তর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলা, শিক্ষক লাঞ্ছনা, ছাত্রী নিপীড়নে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনে আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি এবং কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবি করেছেন তারা। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাবি ক্যাম্পাসের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সংহতি সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৭০ জন শিক্ষক সংহতি সমাবেশে অংশ নেন। শিক্ষকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে কয়েকশ’ শিক্ষার্থী সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেন। সমাবেশ শেষে মৌন মিছিল কলাভবন ঘুরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশ থেকে ঢাবি প্রশাসনকে আরও পেশাদারিত্ব হওয়ার তাগিদ দেয়া হয়।

ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীনের সভাপতিত্বে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দিন খানের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ইতিহাস বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. এএইচ আহমেদ কামাল, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএম আকাশ, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসরীন ওয়াদুদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বুয়েটে অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাসনীম সিরাজ মাহবুব, সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক খান প্রমুখ।

সমাবেশে ঢাবি প্রক্টরকে উদ্দেশ করে অধ্যাপক আহমেদ কামাল বলেন, ‘আপনাকে ভুলে যেতে হবে যে আপনি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। অনেকদিন তো হল প্রশাসন ও শিক্ষাকতার সঙ্গে আছেন। কিন্তু আপনি পরিচয়টা ভুলতে পারছেন না। এটা ভুলতে হবে শিক্ষাকতা করতে গেলে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ সবসময় ছিল, আছে ও থাকবে। নিপীড়ন আন্দোলন থামানোর শেষ পন্থা না। নিপীড়ন করে গণআন্দোলন, অধিকার এবং রুটিরুজি, শিক্ষার আন্দোলন দমানো যায় না।’

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেন এই আন্দোলন হচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি না’। বুঝতে পারতেন খুব সহজেই। লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী যারা আন্দোলন করছে, তাদের যদি একটা ঘণ্টা সময় দিতেন। কিংবা আপনি যদি শিক্ষকদের সঙ্গেও কিছু সময় কথা বলতেন কিংবা তাদের লেখা কথাবার্তা যদি আপনি শোনার চেষ্টা করতেন। তাহলে নিশ্চয় বুঝতে পারতেন এই দাবিগুলো কত দিনে জমানো ক্ষোভ থেকে এসেছে। তিনি বলেন, ‘ভিসির বাড়িতে যখন হামলা হয়েছে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ বলছে এ হামলার সঙ্গে আন্দোলনকারী কেউ জড়িত নয়। তাহলে আজ কেন আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হচ্ছে?’

তিনি বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবি সমাধান করা খুব সহজ ছিল। অর্থমন্ত্রী বলেছেন শতকরা ৭৫ ভাগই কোটা থেকে নিয়োগ হয়। যদি ২৫ ভাগের বেশি না-ই হয়, তাহলে তো কোটা সংস্কার করা খুব সহজ হয়ে যায়। নির্যাতন করলে ক্ষোভ-অসন্তোষ চলে যাবে। প্রতিবাদগুলো থেকে যায়।’

নির্যাতনের মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ছাত্রলীগ এমন একটি অবস্থা তৈরি করেছে, ২০১৮তে দাঁড়িয়ে আয়ুব খানের দশকের কথা মনে পড়ছে। আয়ুব দশক অতিক্রম করে গণঅভ্যুত্থান-মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন সমাজ-দেশ গড়তে চেয়েছিলাম।

অধ্যাপক ড. এমএম আকাশ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বৈত প্রশাসনের অবসান ঘটাতে হবে। হলগুলো থেকে সহ-প্রশাসনকে (ছাত্রলীগ) বিতাড়িত করে প্রভোস্টকে দায়িত্ব দিতে হবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি সেটা ব্যবস্থা করতে না পারেন, তাকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে হবে কোনো রাষ্ট্রীয় চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তিনি ক্ষমতা ছদ্মপ্রশাসনের কাছে তুলে দিয়েছেন এবং তাকে অবিলম্বে পদত্যাগ করে দেখাতে হবে তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না রাষ্ট্রীয় চাপের কারণে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনা। এটা না হলে ছাত্র রাজনীতি আদর্শগত প্রতিযোগিতাভিত্তিক হবে না। তিনি অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক নাসরীন ওয়াদুদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে ছাত্রলীগের একটা তকমা দেয়া হয়েছিল, যেটা নিয়ে আমি গর্ববোধ করতাম। এখন মনে হয় ছাত্রলীগ একটা গালি, সত্যিকারে। আমি মনে করেছিলাম, শহীদ মিনারে আমিও যাব। কিন্তু আমার হাত-পা ভাঙা। তখন মনে হয়েছে যদি ওরা মারতে শুরু করে তাহলে আমি কি আমাকে সামলাতে পারব? কি রকম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা আছি, চিন্তা করতে পারছি না।

অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্তির আস্বাদ দেয়ার কথা, সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কারাগার বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর যেখানে ইতিহাস রচিত হয়েছে, বিভিন্ন আন্দোলনের সাক্ষী, সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করে যারা কারাগার বানিয়ে তুলছে, তাদের বিপক্ষে আমাদের বলতেই হবে। আমাদের নিঃশ্বাস নেয়ার জায়গা, পরিসরের জন্য আমাদের দাঁড়াতেই হবে। এ সময় তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার করা, সরকারের কোটা সংস্কারের ঘোষণার প্রজ্ঞাপন জারি করা, ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সাতটি দাবি তুলে ধরেন।