বাংলাদেশ ব্যাংক

ঋণখেলাপি মহাব্যবস্থাপকের তদন্তে গড়িমসি

  হামিদ বিশ্বাস ২১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণখেলাপি

ঋণখেলাপি বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) বিচার আজও হয়নি। এমনকি তার বিরুদ্ধে করা তদন্ত কার্যক্রমও ধীরগতিতে চলছে।

অথচ ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১০ মাস। গত বছরের অক্টোবরে ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

সূত্র জানায়, প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে সময়মতো ঋণ বিতরণ ও আদায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নানান উপদেশ দিয়ে থাকেন।

অথচ তিনি নিজে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছেন না। ঋণের টাকা আদায়ের জন্য বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার পেছনে ঘুরছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৫ ব্যাংক ও এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তার।

ঋণের টাকা চাইলে উল্টো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের শাসাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু ব্যাংক নয়, তার পেছনে ঘুরছেন সহকর্মীরাও। নানা কৌশলে সহকর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছেন না। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

এ ঘটনা প্রকাশের সময় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া অফিসের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন। গত বছরের মার্চে ওই অফিসে যোগদানের আগে প্রধান কার্যালয়ের কৃষিঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

ওই সময়ে কৃষিঋণ বিভাগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকার বেশি ধার নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসবের বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই তার হাউস বিল্ডিং ও গাড়ি কেনার জন্য এক কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে।

সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেয়ার বিষয়ে জানা গেছে, অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে জমি ক্রয়, কিংবা কিছুদিনের জন্য ধারের কথা বলে এই টাকা নিয়েছেন তিনি। যার বেশিরভাগই তিনি ফেরত দিচ্ছেন না। বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো সুরাহা না পাওয়ায় অনেক সহকর্মী ক্ষুব্ধ হন। আর ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে এক ব্যাংকের ঋণের তথ্য আরেক ব্যাংকে গোপন করেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় ঋণদাতা ব্যাংকগুলোও বিষয়টি ততটা যাচাই করেনি।

এসব বিষয়ে জানতে প্রভাষ চন্দ্র মল্লিকের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই শেষে ১৫টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

মন্দমানে শ্রেণীকৃত ঋণের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে তিন দফায় নেয়া হয় দুই লাখ ৩০ হাজার, চার লাখ ৬০ হাজার ও দুই লাখ ১৮ হাজার টাকা। পূবালী ব্যাংক থেকে দুই দফায় নেয়া হয় তিন লাখ ৮১ হাজার টাকা। একই ব্যাংক থেকে নেয়া এক লাখ ১৪ হাজার টাকার অন্য একটি ঋণ সন্দেহজনক মানে শ্রেণীকৃত। প্রাইম ব্যাংকের ১৩ লাখ ৬৭ হাজার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ছয় লাখ ১৮ হাজার, ন্যাশনাল ব্যাংকের পাঁচ লাখ আট হাজার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের তিন লাখ ২০ হাজার, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের দুই লাখ ৫৭ হাজার, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দুই লাখ ২৩ হাজার এবং সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের এক লাখ ৪১ হাজার টাকা মন্দমানে শ্রেণীকৃত।

প্রাইম ব্যাংকের ঋণ আদায় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) গোলাম রব্বানী যুগান্তরকে বলেন, প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক ২০১৩ সালে ১০ লাখ টাকা ঋণ নেন। বর্তমানে তা সুদাসলে ১৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। পুরো টাকাই মন্দমানের খেলাপি।

এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ফরাছত আলী যুগান্তরকে বলেন, প্রভাষ চন্দ্র খেলাপি ছিলেন। তিনি টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। তবে তার পক্ষে যে গ্যারান্টার ছিল তিনি টাকা পরিশোধ করেছেন।

সূত্র জানায়, ইস্টার্ন ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি পরিমাণের ঋণখেলাপি ছিলেন প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক। তবে সম্প্রতি কিছু টাকা দিয়ে পুনঃতফসিল করায় তা কমে আট লাখ ৯৩ হাজার টাকায় নেমেছে। এই ঋণ এখন নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এ ছাড়া সিটি ব্যাংকে তিনটি ঋণের মধ্যে চার লাখ ৪১ হাজার টাকার একটি ঋণ এখন সন্দেহজনক মানে শ্রেণীকৃত। আর এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা সাব-স্ট্যান্ডার্ড এবং এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা ঋণের তিনি গ্যারান্টার।

এ ছাড়া এনসিসি ব্যাংকের চার লাখ ৫৬ হাজার ও মেঘনা ব্যাংকের এক লাখ ১৪ হাজার টাকা সন্দেহজনক মানে শ্রেণীকৃত। আর এবি ব্যাংকে আট লাখ টাকা, উত্তরা ফাইন্যান্সের সাত লাখ ৫০ হাজার ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পাঁচ লাখ টাকা খেলাপি হয়ে গেছে।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্রভাষ চন্দ্র মল্লিকের খেলাপির টাকা বহু কষ্টে আদায় করা হয়েছে। সে একা নয়, আরও অনেকে এ কাজে লিপ্ত।

এবি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মহাদেব সরকার যুগান্তরকে বলেন, তিনি ঋণ নিয়েছেন ১০ লাখ টাকা। সুদাসলে তা ১২ লাখের কাছাকাছি। সব ঋণই খেলাপি। এর মধ্যে সামান্য টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকি সব টাকা ব্যাংক পাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশিস চক্রবর্ত্তী যুগান্তরকে প্রথমে বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না। পরে বলেন, জেনে জানাবেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি জানাতে পারেননি।

ব্যাংক-কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির পরিচালক বা এমডি হতে পারেন না। ঋণখেলাপিরা দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্যও অযোগ্য। মূলত খেলাপিদের সামাজিকভাবে চাপে রাখতে আইনে এ রকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এসব বিষয় দেখভাল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও খেলাপি এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা চাকরিতে থাকতে পারেন কি-না সে বিষয়ে আইনে কিছু উল্লেখ নেই।

তবে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার দায়ে চাকরি চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। প্রভাষ চন্দ্র মল্লিকের এসব ঋণে অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter