রাজশাহী সিটি নির্বাচন : সাক্ষাৎকার

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নেতাকর্মীরা

বুলবুল

  তানজিমুল হক, রাজশাহী ব্যুরো ২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তিনি বলেন, নির্বাচনে কালো টাকার ছড়াছড়ি, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, পেশিশক্তির ব্যবহার, বাইক বাহিনীর বোমা হামলা, পোস্টার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর, দলীয় নেতাকর্মীদের ধরপাকড়সহ নানা ধরনের নির্যাতনের মধ্যে আছি। এ অবস্থায় রাসিক নির্বাচনও গাজীপুর ও খুলনার মতো হয় কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন নেতাকর্মীরা। বুধবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মেয়র প্রার্থী বুলবুল।

রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি বুলবুল আরও বলেন, মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও কাশিয়াডাঙা থানার দু’জন ওসি আমাদের নেতাকর্মীদের বেশি নির্যাতন করছেন। অন্য থানা পুলিশের নির্যাতন ও হয়রানির ধরনও একই রকমের। ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে মামলা। অনেককে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। বিএনপির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে নিষেধ করা হচ্ছে। অংশ নিলে পরিণাম ভয়াবহ হবে বলেও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠ দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এসব বিষয় নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে।

এবারের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রচারণা সন্ত্রাসে লিপ্ত মন্তব্য করে বুলবুল বলেন, ১০ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। এরপর মাত্র দু’দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পুরো নগরীতে চার কোটি টাকার পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগিয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ টাকা কোথা থেকে পেলেন- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কিন্তু তাতেও সাড়া নেই। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নগরীতে আমার পোস্টার সাঁটানোর জন্য সামান্য পরিমাণ জায়গাও ফাঁকা রাখেনি। সবটুকু দখলে নিয়েছে। ইতিমধ্যে আমার পোস্টার ছিঁড়ে ড্রেনে ফেলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছে। কিন্তু কিছুই করতে পারছি না।

নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন দাবি করে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, পুলিশি হয়রানি, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, গণসংযোগকালে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর বোমা হামলাসহ নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে ২০টি অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিষয়গুলো আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশনের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়। রহস্যজনক কারণে নীরব থাকছে কমিশন। ফলে অরাজকতা বাড়ছে। শাস্তি না হওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

নির্বাচনের মাঠে নতুন আতঙ্ক বাইক বাহিনী উল্লেখ করে বুলবুল বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করেছে। আর এ পরিকল্পনার অংশ বাইক বাহিনী। এর সদস্যরা গভীর রাতে এমনকি ভরদুপুরেও বিএনপির নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করছে। নেতাকর্মীদের ভয় দেখাচ্ছে। প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এ বাহিনীর সদস্যরাই ১৭ জুলাই প্রকাশ্য দিবালোকে নগরীর সাগরপাড়া বটতলা মোড়ে জেলা ছাত্রদল আয়োজিত নির্বাচনী সভায় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বক্তব্য চলাকালে বোমা হামলা চালিয়েছে। এ হামলার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে দু’জনকে ইতিমধ্যে আমরা শনাক্ত করেছি। বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়েছে। অথচ পুলিশ অজ্ঞাত আট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেনি। পুলিশ কোনো রকম রাখঢাক না করেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে।

নির্বাচনের দিন ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না দেয়ার আশঙ্কায়ও রয়েছেন বুলবুল। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের চৌকস নেতাকর্মীদের পোলিং এজেন্ট হিসেবে বাছাই করেছি। কিন্তু তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে আছি। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ যে কোনো উপায়ে জেতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

এদিকে ২০০৮ সালে রাসিক মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর বুলবুল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার আমাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করেছে। আমি ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করি। শপথ নেয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ি। একজন মেয়র হিসেবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমি যে কাজগুলো করতে চেয়েছিলাম, তা পারিনি। পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার যে পরিবেশ থাকা দরকার তা বর্তমান সরকারের সময়ে নেই।

দায়িত্ব পালন করতে না দেবার অভিযোগ এনে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, শপথ নেয়ার পর থেকে আমার মেয়াদ ছিল ৫৬ মাস। এর মধ্যে আমি দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি মাত্র ২৬ মাস। কারাবন্দি ছিলাম ৬ মাস। দায়িত্ব ফিরে পেতে ৩২ মাস আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরেছি। এ কারণে আমি পরিপূর্ণভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। বাকি সময়ে একজন সাবেক মেয়র সিটি কর্পোরেশনের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছিলেন। এটি জনসেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য মারাÍক ক্ষতিকর। এরপরও ২৬ মাস দায়িত্ব পালনকালে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর উন্নয়নে কাজ করার চেষ্টা করেছি।

দায়িত্ব পালনকালে মর্যাদা হ্রাস করায় বুলবুলের ক্ষোভ রয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৩ সাল পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পদটি প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ছিল। কিন্তু ওই সময়ে রাজশাহীসহ সারা দেশের কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত হন। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকার ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা কেড়ে নেয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এমনটি হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু রাজশাহী নয়, সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনগুলোর ভোটারদের মর্যাদা ও সম্মানেও আঘাত করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে প্রথম ১৪ মাস আমি সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি ব্যবহার করিনি।

বিএনপি মাটি ও মানুষের দল উল্লেখ করে বুলবুল বলেন, আমি দীর্ঘ সময় থেকেই রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে আছি। তাদের দুঃখ-কষ্টে পাশে থেকেছি। তাদের সঙ্গে যেভাবে ছিলাম, আগামীতেও থাকব। রাজশাহীকে নিয়ে আমার স্বপ্ন আছে। আছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। নানা প্রতিবন্ধকতায় সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। রাজশাহীর সচেতন জনগণ এসব বিষয়ে অবহিত আছেন। আমি রাজশাহীর জনগণকে ভালোবাসি। আর এ কারণেই আমার প্রতিও তাদের রয়েছে অকুণ্ঠ ভালোবাসা। যদি ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে রাজশাহীর মানুষ আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবেন বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter