বরিশাল সিটি নির্বাচন

বরিশালে বেচাকেনার ৩৩ হাজার ভোটই ফ্যাক্টর

বিএনপির পক্ষে মাঠে নেমেই বিপাকে জামায়াত গ্রেফতার ৩

  শেখ মামুনুর রশীদ ও আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল থেকে ২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক, এ ৩৩ হাজার ভোটের ওপর নির্ভর করে জয়-পরাজয়ের অনেক কিছু। আর এর বেশিরভাগই বিক্রি হয় টাকায়। ফলে যে কোনো নির্বাচনের আগের রাতে অন্ধকার মানুষের গোপন আনাগোনায় নীরবে-নিভৃতে জমজমাট হয়ে উঠে এসব ভোটারদের এলাকা।’ বরিশাল নগরীতে থাকা নিু আয়ের মানুষের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ৩৫টি বস্তি এলাকার প্রায় ৩৩ হাজার ভোটার সম্পর্কে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি জানালেন বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান। এ ৩৩ হাজার ভোটারের ভোট কেনাবেচা বন্ধে কার্যকরী কঠোর পদক্ষেপ নেয়া না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একজন দক্ষ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচিত হওয়া অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে শুরু থেকে চুপচাপ থাকলেও শুক্রবার প্রথমবারের মতো বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের পক্ষে প্রচারণায় নামে জামায়াত। আর নেমেই বিপদে পড়েন দলটির নেতাকর্মীরা। ওই রাতেই গ্রেফতার হন জামায়াতের মহানগর কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল জহিরুদ্দিন মু. বাবরসহ আরও দু’জন। এছাড়া নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পুলিশ হানা দিতে শুরু করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন দলটির দায়িত্বশীলরা। বিষয়টি নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে প্রতিবাদ জানানো হবে বলে জানান তারা।

বরিশাল নগরীতে বস্তির সংখ্যা ৩৫। শুধু যে নিু আয়ের লোকজনই এখানে বসবাস করেন তা নয়, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষও থাকেন এসব বস্তিতে। যদিও তাদের সংখ্যা খুবই সামান্য। রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতর সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এসব বস্তিতে মোট ভোটারের সংখ্যা কম-বেশি প্রায় ৩৩ হাজার। ওয়ার্ডওয়ারী হিসেবে, নগরীর ৫নং ওয়ার্ডে ১৩টি, ১০নং ওয়ার্ডে ৮টি, ৬নং ওয়ার্ডে ৫টি, ৩নং ওয়ার্ডে ৫টি এবং ২নং ওয়ার্ডে ৪টি বস্তি রয়েছে। শনিবার পলাশপুর, বঙ্গবন্ধু কলোনি বা স্টেডিয়াম বস্তি ও কলাপট্টিসহ বেশ কয়েকটি বস্তি ঘুরে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, ‘যারা আমাগো বস্তির লাইগ্যা কাম করব আমরা হেগোরেই ভোট দিমু।’

বঙ্গবন্ধু কলোনির বাসিন্দা সেতারা বেগম বলেন, ‘মোগো এই হানে দেওইতে (বৃষ্টি) পানি জইম্যা থাহে। রাস্তাগুলান এক্কেলে চেহন। দুইডা রিশকা একলগে যাইতে পারে না। বহু মাইনষেই তো মেয়র অইছে। ক্যাবল হিরন মেয়া ছাড়া তো মোগো লইগ্যা কেউ কিচ্ছু হরেনাই। এইবার বুইঝ্যা হুইন্যা ভোড দিমু।’ বাসিন্দারা এভাবে বললেও খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল ভেতরের ঘটনা পুরোপুরি ভিন্ন। এসব বস্তিতে ভোটের আগের দু’রাত চলে দেদার ভোট কেনা-বেচা। নিজের মূল্যবান ভোটটি সামান্য ক’টা টাকার বিনিময়ে বেঁচে দেন বস্তির হাজার হাজার মানুষ।

বরিশাল সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, ‘বস্তির খেটে খাওয়া মানুষের এ দুর্বলতার বিষয়টি জানে সবাই। আর সেটার ব্যবহারও করে। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের বয়স ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। যেসব বস্তির কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর অবস্থান বলতে গেলে নগরীর একেবারে কেন্দ্রে। এ ১৫ বছরেও এসব বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ বেঁচে থাকার ন্যূনতম নাগরিক অধিকার পাননি। এমনও তো হতে পারে যে খুব সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে এদের দরিদ্র করে রাখা হয়েছে। যাতে করে বিশালসংখ্যক এ ভোট সেই দারিদ্র্যতা কেনা-বেচার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।’

বস্তির ভোট কেনা-বেচার ইতিহাসও এখানে নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে এ কেনা-বেচার ঘটনা ঘটান বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতারা। নগরীতে আলোচনা আছে যে বিগত সিটি নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী মরহুম শওকত হোসেন হিরনের পরাজয়ের পেছনে অন্যতম একটি কারণ ছিল বস্তির ভোট গোছানোর ব্যর্থতা। হিরন ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সেবার নির্বাচনে হিরনের আশপাশে থাকা কয়েকজন বস্তির ভোট গোছানোর দায়িত্ব নিলেও শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠে তাদেরই ২-১ জনের বিরুদ্ধে। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানা গোলমালের খবরও বেরোয় তখন।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রচারণার পুরোটা সময় যে টাকা খরচ করেন তার প্রায় সমান খরচ হয় ভোটের আগের দু’রাতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেকটি ভোট কিনতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করেন প্রার্থীরা। আর এ টাকার প্রায় পুরোটাই ব্যয় হয় নগরীর এ ৩৫টি বস্তিতে। কেননা যেখানে সিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ফলাফল নির্ধারণ হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার ভোটে সেখানে এ ৩৩ হাজার ভোটের গুরুত্ব কতখানি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

অবশ্য বস্তির সব ভোট টাকায় কেনাবেচা হওয়া নিয়ে ভিন্নমতও আছে। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি এসএম ইকবাল বলেন, ‘টাকা নিয়ে যে ওই প্রার্থীকেই ভোট দেয় সব ক্ষেত্রে তা হয় না। অনেক সময় আবার সবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা ভোট দেয় পছন্দের প্রার্থীকে। গেল সিটি নির্বাচনে এর নজির আমরা পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু কলোনির বহু বাসিন্দা সেবার টাকা নিয়েও সাবেক মেয়র হিরনকে ভোট দেননি। আবার টাকা নিয়ে বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দেননি এমন উদাহরণও রয়েছে। আসলে তাদের অভাবটা বিক্রি হয় ভোটের দামে। এটা ঠেকাতে প্রশাসন তথা রিটার্নিং দফতরকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে ভোটের মাঠে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন কখনোই সম্ভব হবে না।’

এদিকে শুরুতে চুপচাপ থাকলেও শুক্রবার থেকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছে এখানকার জামায়াতে ইসলামী। আর নেমেই বিপাকে পড়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ দলের নেতাদের করা অভিযোগ অনুযায়ী, জামায়াত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানি শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে বরিশাল মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জহিরুদ্দিন মু. বাবরসহ ৩ জনকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার নগরীর ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায় বিএনপির একটি উঠান বৈঠকে যোগ দেন জামায়াতের বরিশাল মহানগর আমীর অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল ও সেক্রেটারি জেনারেল জহিরুদ্দিন মো. বাবর। ওই বৈঠক শেষে বেরিয়ে আসার সময় পুলিশ গ্রেফতার করে বাবরকে। জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর আমিনুল ইসলাম খসরু বলেন, ‘শুধু বাবরই নয়, আমাদের ২৯নং ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি মনিরুজ্জামান শাহিন ও ২৮নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মো. মিলনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। বাবরকে ২০১৪ সালে নগরীর রূপাতলী এলাকায় একটি ট্রাকে অগ্নিসংযোগের মামলায় এবং বাকি দু’জনকে নাশকতার পরিকল্পনার অপর একটি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান করা হয়েছে। আমাদের আরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বাসায় হানা দিয়েছে পুলিশ। অথচ নির্র্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকায় ওয়ারেন্ট না থাকলে কাউকে গ্রেফতার করতে পারার কথা নয়। বিষয়টি নিয়ে আমাদের একটি প্রতিনিধি দল আজ-কালের মধ্যে এখানকার রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করবে।’

জামায়াত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারও। সংবাদকর্মীদের দেয়া সাক্ষাৎকারে সরোয়ার বলেন, ‘পরাজয় নিশ্চিত জেনে এখন প্রশাসনকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে সরকারি দল। জামায়াতের ৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারেও অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এভাবে চলতে থাকলে এখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো পরিবেশ থাকবে না।’

বিএনপি প্রার্থীর করা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বৈধতা-অবৈধতা প্রশ্নে জামায়াতের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে এখানে তাদের কোনো নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই। আমি মনে করি, উন্নয়নের পক্ষে ভোটারদের মধ্যে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভয় পেয়ে বিএনপি এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter