ভোটযুদ্ধে থাকছে জাতীয় পার্টি

একাট্টা আওয়ামী লীগ, অগোছালো বিএনপি

  শেখ মামুনুর রশীদ ও আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল থেকে ২৪ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল

অপরদিকে নির্বাচন প্রশ্নে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিএনপিকে বিপাকে ফেলছে বলে আলোচনা থাকলেও তা উড়িয়ে দিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।

ধানের শীষের পক্ষে ভোটারদের মধ্যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে দাবি করার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত নগরীতে এসেছে উল্লেখ করে এই ঘটনায় শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে বিএনপিরও অসংখ্য বহিরাগত এখন বরিশালে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৭ তারিখের পর এদের কেউই আর থাকতে পারবে না বরিশালে।’

প্রচার-গণসংযোগ প্রশ্নে বিএনপি যে খানিকটা আগোছালো তা স্বীকার করেছেন দলের জেলা (দক্ষিণ) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন। বরিশালের বহু এলাকায় অলি-গলি কিংবা বাসাবাড়িতে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইতে এখন পর্যন্ত কেউ যায়নি উল্লেখ করে এর কারণ জানতে চাইলে আবুল কালাম শাহিন বলেন, ‘এখানে আওয়ামী লীগ সাদিক আবদুল্লাহকে তাদের প্রার্থী হিসেবে পছন্দ করে আরও অন্তত ২ বছর আগে থেকে মাঠ গোছানোর কাজ শুরু করেছে।

এই সময়ের মধ্যে তারা তাদের ওয়ার্ড কমিটিগুলোকে নির্বাচনমুখী করার পাশাপাশি গঠন করেছে কেন্দ্র কমিটি। ওয়ার্ডের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করার পাশাপাশি তৃণমূলে নির্বাচনী কার্যক্রমও তারা করছে প্রায় ২ বছর ধরে। এর বিপরীতে বিএনপি প্রার্থীর নির্র্বাচন নিয়ে ছিল জটিলতা।

কেন্দ্র থেকে কাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে তা ঠিক করতে বেশ সময় লেগেছে। সবচেয়ে বড় কথা হল সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাননি মজিবর রহমান সরোয়ার। পরে দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয় তাকে। এসব কারণে সবকিছু গোছাতে আমাদের খানিকটা সময় লেগেছে।’

নগরীর বহু এলাকায় এখনও পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধানের শীষের জন্য কেউ ভোট চায়নি। তাছাড়া ওয়ার্ড পর্যায়ে বিএনপির প্রচারণাও আওয়ামী লীগের তুলনায় বেশ কম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা সমস্যা হয়েছে আমাদের ওয়ার্ডগুলোর সভাপতি-সম্পাদকদের কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে। অন্তত ১৫টি ওয়ার্ডে দলের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছে। এতে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাউন্সিলর পদের প্রচার নিয়ে ব্যস্ত থাকছে।

ফলে ধানের শীষের পক্ষে ভোট প্রার্থনা কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ এতে করে ফলাফলের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। এখানে সবসময় ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভোটে হারে আওয়ামী লীগ। বরিশালের সব মানুষ জানে যে নির্বাচনে আছে ধানের শীষ। এখন প্রার্থনা কেবল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সেটা হলে আমাদের বিজয় নিশ্চিত।’

এদিকে বিএনপির এমন অবস্থার বিপরীতে প্রচারণার পুরো মাঠটাই যেন দখল করে রেখেছে আওয়ামী লীগ। পরিস্থিতি এমন যে, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কেবল নৌকা আর নৌকা। বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী এই পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার দিকে ইঙ্গিত করলেও তা মানতে নারাজ দলটির নেতারা। বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, ‘এখানে আমাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে আরও অন্তত ৪ বছর আগে থেকে। একটু একটু করে মাঠ গুছিয়েছেন আমাদের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

যদিও নিশ্চিত ছিল না যে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাবেন কিনা। তারপরও দলের কথা ভেবে মাঠেই ছিলেন তিনি। এর সুফলও মিলছে এখন। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বরিশালে এখন অনেক বেশি সুসংগঠিত আওয়ামী লীগ। নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এখানে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কোনো সভাপতি কিংবা সম্পাদক নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। ফলে এখন তারা পুরোপুরি প্রচার চালাচ্ছেন নৌকার পক্ষে।

আমরা বহু আগেই গঠন করেছি কেন্দ্র কমিটি। তাছাড়া আমাদের এখানে মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে যেমন কোনো বিরোধ নেই তেমনি প্রার্থী প্রশ্নে কোনো মতভেদও নেই। সব মিলিয়ে এখানে নৌকা প্রশ্নে একাট্টা সবাই। জয়ের লক্ষ্য নিয়ে জান প্রাণ দিয়ে কাজ করছে নেতাকর্মীরা।’

এখানে বিএনপির বিশাল একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। তারা সবসময় ২৫-৩০ হাজার ভোটে হারায় আওয়ামী লীগকে। এমন পরিস্থিতিতে জয় প্রশ্নে এতটা আত্মবিশ্বাসী কী করে হলেন জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এখানে বিএনপির নিজস্ব ভোট খুব বেশি নয়। বলতে গেলে আওয়ামী লীগের প্রায় সমান। তারা এগিয়ে যেত মূলত এন্টি আওয়ামী লীগ ভোটে। তবে সেই অবস্থা এবার আর নেই।

এবার বিএনপির ভোট ৩ ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। প্রার্থী আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টির। ফলে বেশ খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি আমরা। তাছাড়া এখানে বিএনপির ভোট কমেছে। ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনে এখানে বিএনপি জয়লাভ করে মাত্র ৫ হাজার ভোটে। ফলে বিএনপির ভোটব্যাংকের যে দাবি তা আর নেই।’

আওয়ামী লীগের এসব বক্তব্যকে নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল ও স্টান্টবাজি বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। ছোট ছোট দল বিএনপির নয় বরং আওয়ামী লীগের জন্যই ভয়ের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের ঘরানার দুটি দল এখানে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছে। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সিটি নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় অনেক ইস্যু জড়িত। অতএব ভোটাররা ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে ভুল করবে না।

আর যাই হোক তারা তাদের ভোট নষ্ট করবে না। বরং আপনারা এই দিকটাই খেয়াল দিন যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা। বিপুলসংখ্যক বহিরাগত এখন বরিশালে অবস্থান করছে। গ্রেফতার অভিযানে নেমেছে পুলিশ। যত দিন যাচ্ছে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ সামনে আসছে। আমাদেরকে ঠিকমতো প্রচার করতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ রাত ৮টার পরও মিছিল-মিটিং করছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা। এ সবই হচ্ছে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আলামত।’

বিএনপি প্রার্থীর এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘পছন্দের প্রার্থী কিংবা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইতে যে কেউ আসতে পারে বরিশালে। আমাদের যেমন এসেছে তেমনি তাদের পক্ষেও নগরীতে এখন অবস্থান করছে হাজার হাজার বহিরাগত। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় নয়। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ২৭ তারিখের পর এদের কেউ বরিশালে অবস্থান করতে পারবে না।’

গ্রেফতার অভিযানের অভিযোগ প্রসঙ্গে সাদিক বলেন, ‘উনারা বলতে পারবেন যে নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির একজন নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে? বিনা বাধায় নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপির সবাই। আসলে নৌকার পক্ষে এবার যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভীত হয়ে এসব মিথ্যাচার করা হচ্ছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চলছে। তবে এতে কোনো ফায়দা হবে না। ৩০ জুলাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’

এদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের নির্বাচনী মাঠে থাকা না থাকা নিয়ে সৃষ্ট গুঞ্জনের অবসান হয়েছে। সোমবার ঢাকা থেকে আসা জাতীয় পার্টির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয়, নির্বাচনী মাঠে থাকবে লাঙ্গল। দলের মেয়র প্রার্থী তাপস বলেন, বরিশালে জাতীয় পার্টির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এখান থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter