রাজশাহী সিটি নির্বাচন

অজানা আতঙ্কে ভোটাররা

  রেজাউল করিম প্লাবন, রাজশাহী থেকে ২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী সিটি নির্বাচন

আর মাত্র একদিন পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় মহাব্যস্ত মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। কিন্তু এত বড় ভোট উৎসবের মধ্যেও যেন রয়েছে অজানা ভয়, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। ভোটারদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকার কথা সেটি দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, ভোট কেন্দ্রে যাওয়া এবং নিজের ভোট নিজে দিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে তারা আতঙ্কে রয়েছেন।

তবে ভোটারদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই বলে দাবি করেছেন রাজশাহী সিটি নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে শুক্রবার দেখা যায়, ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষ ও ভোটাদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বহিরাগতরা এরই মধ্যে চলে যাওয়া শুরু করেছে। মেসগুলোতে টানিয়ে দেয়া হয়েছে নোটিশ। মালিকরা রুমে রুমে গিয়ে মেস ছাড়ার তাগাদা দিচ্ছেন। মোটরসাইকেলে মহড়া দিচ্ছেন প্রভাবশালী প্রার্থীর সমর্থকরা।

সাধারণ ভোটাররা ছাড়াও নির্বাচনের একদম শেষ সময়ে নানা অভিযোগ করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী ছাড়া অন্যরা। তারা বলছেন, সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে হুমকি দেয়া হচ্ছে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থক ও ভোটারদের প্রতি।

নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডের বিএনপির প্রার্থী রবিউল ইসলাম মিলুর এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত রাত (বৃহস্পতিবার রাত) থেকে বাড়িতে থাকা মুশকিল হয়েছে। বাড়ির সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে অপরিচিত কয়েকজন মহড়া দিচ্ছে। এতে আমিসহ আমার পরিবার ও ঠেলাগাড়ি মার্কার ভোটাররা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বুঝতে পারছি না ৩০ জুলাই কী হতে যাচ্ছে।

এই ওয়ার্ডের দড়িখরবোরা এলাকার আজমত নামের একজন ভোটার বলেন, ভোট নিয়ে কিছু বলব না। ঠেলাগাড়ি (বিএনপি প্রার্থীর) মার্কার ভোট চাইতে গিয়ে আমার ছেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ভোট পরে, আগে মান বাঁচাই।

নগরীর ১৯নং ওয়ার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কাউন্সিলর প্রার্থী জানান, ভোট এমন হবে জানলে দাঁড়াতাম না। নিজের লোকরাও কাজ করতে চাচ্ছে না। সবার ভিতর ভয় ঢুকে গেছে। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে বলে মনে হয় না। এখনই স্থানীয় প্রভাবশালী প্রার্থীর লোকজন যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাতে আশা-ভরসা ছেড়ে দিয়েছি।

এই ওয়ার্ডের হাজারাপুকুর এলাকার বাসিন্দা অটোবাইক চালক মিয়া হোসেন বলেন, শুনতেছি ভোটের দিন নাকি গণ্ডগোল হবে। তাই ভোট নিয়ে খুব উৎসাহ নেই।

নগরীর বোয়ালীয়া থানা বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী বলেন, মেয়র পদে নৌকার প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থীরা দায়িত্ব নিয়েছেন। নৌকার সঙ্গে নিজের জয় নিশ্চিত করতে এখনই এসব কাউন্সিলর প্রার্থী এলাকায় ত্রাস কায়েম করেছে। প্রতিপক্ষের প্রার্থী ও তার লোকজনকে হুমকি দিচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে ভোটের দিন অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যাবে না বলেও জানান তিনি।

এদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাড়া অন্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা খুঁজে পাচ্ছেন না পোলিং এজেন্ট। ঝামেলা এড়াতে এরই মধ্যে অনেকে পোলিং এজেন্ট তালিকা থেকে নাম কাটিয়েছেন। অনেকে কোনো কিছুতে না থেকেও আতঙ্ক বোধ করছেন। নগরীর ২২নং ওয়ার্ডের আকলিমা আক্তার কাউন্সিলর প্রার্থী বিএনপির নেতা মির্জা পারভেজ রিপনের কাছের লোক হয়েও পোলিং এজেন্ট হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। ভয়ে নির্বাচনী প্রচারণায়ও যাচ্ছেন না তিনি। ভোট দেয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছেন এই নারী।

রাজশাহী শহরের প্রাণ কেন্দ্র কামারুজ্জামান চত্বরের পাশের একটি চায়ের দোকাদার বলেন, শুনতেছি ভোটের দিন নাকি গণ্ডগোল হবে। সবাই আলোচনা করছে। এখানে যারা বসছেন সবাই একই কথা বলছেন। কাউন্সিলর প্রার্থীরা নাকি এখন থেকেই মারামারি করছেন। এমন হলে ভোট দিতে যাব না।

এরই মধ্যে কাউন্সিলর প্রার্থী-সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অনেকেই আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ১৭নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারিতে রফিকুল ইসলাম ওরফে রিংকু নামে একজন গুরুতর আহত এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণেও উদ্বিগ্ন ভোটাররা। এছাড়া রাতে অপরিচিত লোকদের আনাগোনা ও মহড়ার কারণে তারা আরও বেশি আতঙ্কিত বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

২২নং ওয়ার্ডের রামপুর বাজার এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা যুগান্তরকে বলেন, অনেক বাড়িতেই প্রভাবশালীদের কাছ থেকে হুমকি আসছে। ফলে ভোট দেয়া নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।

২১নং ওয়ার্ডের শিরোইল এলাকার আকবর হোসেন বলেন, ভয়-আতঙ্ক তো আছেই। চাইলেও পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে পারছি না। নিজের ভোটটি যে দিতে পারব তারও নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। ২৭নং ওয়ার্ডের টিকাপাড়া এলাকার মুদি দোকানদার আনারুল বলেন, শুধু দেখছি। বলতে পারছি না। মুখ তালাবদ্ধ। ভোট না দিয়ে যদি শান্তিতে থাকা যায় তাই করব। তিনি বলেন, এলাকায় রটিয়ে দেয়া হচ্ছে, ভোট কেন্দ্রে যাওয়া যাবে না। কারা রটাচ্ছে জানতে চাইলে বলেন, স্থানীয় একজন প্রভাবশালী কাউন্সিলর প্রার্থী।

এদিকে ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে নৌকায় সিল মেরে রাখা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় শুক্রবার সকালে গণসংযোগে গিয়ে তিনি বলেন, ভোটের আগের রাতে নৌকায় সিলমারা ব্যালট ভোট কেন্দ্রে লুকিয়ে রাখা হতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে ৯০ শতাংশ প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার ‘আওয়ামী ঘরানার’ লোক থেকে বাছাই করা হয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তারা করবেই। তারা চেষ্টা করছে ভোটের আগের দিন প্রিসাইডিং অফিসারদের দিয়ে ভোট কেটে সেটা লুকিয়ে রাখা হবে (স্কুলের) হেডমাস্টারের রুমে বা অ্যাসিসট্যান্ট হেডমাস্টারের রুমে। ধানের শীষের প্রার্থী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন যুগান্তরকে বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও বিএনপি নেতাকর্মীরা মিথ্যাচার করে আসছে। আমরা জানতাম যে নির্বাচনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা মিথ্যাচার করবে, তাই হচ্ছে। তারা ভোট ডাকাতির কথা বলছে। ভোট ডাকাতির ইতিহাস তো তারাই সৃষ্টি করেছে। মাগুরায় ভোট ডাকাতি হয়েছিল খালেদা জিয়ার আমলে। আমাদের ভোট ডাকাতির প্রয়োজন নেই। কারণ আওয়ামী লীগ জনগণের দল, জনগণকে নিয়ে আমরা চলি। জনগণের ভোটে আমরা বিজয়ী হব।

ভোটারদের আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি নির্বাচনের সহকারী রিটানিং অফিসার আতিয়ার রহমান যুগান্তরকে বলেন, ভোটারদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই। নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছে। আশা করছি, ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেবে।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter