শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় সরগরম

  সংগ্রাম সিংহ, সিলেট, আনু মোস্তফা, রাজশাহী ও তন্ময় তপু, বরিশাল ২৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তিন সিটি
ফাইল ছবি

রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আগামীকাল সোমবার। শনিবার মধ্যরাতেই শেষ হয়েছে প্রার্থীদের টানা ১৮ দিনের প্রচারণা। বহিরাগতরাও চলে গেছেন নগরী ছেড়ে। যানবাহন চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়েছে।

ফলে আজ তিন সিটি থাকবে হইহুল্লোড়মুক্ত। শনিবার শেষদিনের প্রচারণায় সিলেট নগরী ছিল উত্তাল। নির্বাচনী প্রচারের উচ্ছ্বাসে আচরণবিধিরও ধার ধারেননি অনেক প্রার্থী। গণসংযোগ-পথসভার নামে তারা করেছেন বিশাল জনসভা।

এ সুযোগে প্রচারণার নামে নগরীতে কয়েক দফা মহড়া দেয় জামায়াত-শিবির। এক অনুষ্ঠানে দেখা হলে কোলাকুলি করেন মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় একে অপরকে কেকও খাইয়ে দেন।

রাজশাহীতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনভর প্রচার চালিয়েছেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। মিছিল, স্লোগান, মাইকিং, ডিজিটাল গান-বাজনাসহ প্রচারের নানা উপকরণ নগরবাসীকেও উৎসবমুখর করে তোলে।

বরিশালে প্রচারণার শেষদিনে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ করেছেন মেয়র প্রার্থীরা।

সিলেট : আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান শনিবার রাতে তার সর্বশেষ নির্বাচনী পথসভার নামে জনসভা করেন সুরমার তীর চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ির পাশে।

এর আগে নেতাকর্মীদের নিয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিরামহীন গণসংযোগ ছাড়াও পথসভা করেন তিনি। বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীও পথসভার নামে জনসভা করেন।

এর আগে বিকাল সাড়ে ৪টায় তিনি তার প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় থেকে শুরু করে নগরীর আম্বরখানা, সুবিদবাজার, রিকাবীবাজার, শেখঘাট জিতু মিয়ার পয়েন্টে গণসংযোগ করে বন্দর পয়েন্টে আসেন।

বাকি তিন মেয়র প্রার্থীও তাদের শেষ দিনের প্রচারণা চালিয়েছেন গণসংযোগ ও পথসভার মধ্য দিয়ে।

এদিকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ১২৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও ৬২ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীও শেষ দিনের প্রচারে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন।

প্রার্থীর তালিকায় এখনও বাস প্রতীকের প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমের নাম থাকলেও দলের চাপে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তিনি এখন দেশেই নেই। ফলে তার পক্ষে কোনো প্রচারণা হয়নি।

দুপুরে মেয়র প্রার্থী কামরান ও আরিফ মুখোমুখি হন একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। তখন তারা করমর্দন ও কোলাকুলি করেন। কেক কাটার পর একজন অপরজনকে কেকও খাওয়ান।

এরপর কামরানের সমর্থকরা নৌকা নৌকা বলে স্লোগান দিতে থাকলে আরিফ তার কর্মী-সমর্থক নিয়ে চলে যান। এর আগে দুপুর ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিয়ে নৌকার পক্ষে প্রচারণায় নামেন সিলেটের জাতীয় পার্টির নেতারা।

পাশাপাশি কামরানের পক্ষে বিবৃতি দেন ইসলামী ঐক্যজোট একাংশের চেয়ারম্যান মাওলানা মিছবাহুর রহমান।

নির্বাচনী প্রচারণায় ধানের শীষের সমর্থনে সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদল ব্যতিক্রমী গণসংযোগ চালায়। তারা ‘বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ সম্বলিত গেঞ্জি পরে নগরীর জেলরোড, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, সাপ্লাই রোড প্রদক্ষিণ করে।

১০ জুলাই থেকে শুরু হয়েছিল প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। এরপর নগরীতে শরিক দলসহ আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের তৎপরতা বেশ লক্ষ করা গেলেও শনিবার তাদের উপস্থিতি ছিল কম।

শুক্রবার রাতে বহিরাগতদের নগরী ছাড়ার নির্দেশের পর অধিকাংশই নগরী ছেড়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের বহিরাগত নেতাদের কেউ কেউ হোটেলে আবার বিএনপির নেতারা নগরীর বাইরে পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়িতে অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী শনিবার জানান, নৌকার পক্ষে প্রচারণায় তিনি সিলেটেই অবস্থান করছেন।

এর অংশ হিসেবে সকালে তিনি সিলেট মহানগর ও বিভাগীয় পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বিকালে তিনি সিলেটের সম্মিলিত ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে অনুরূপ মতবিনিময় করেন।

দলীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার সিলেট সফর করেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান শিখর, অসীম কুমার উকিল এমপিসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একটি টিম।

এদিন রাতে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে অভিযোগ করেন, নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে এবং ফলাফল পাল্টে দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রশাসন ও সরকারের প্রভাবশালীরা দফায় দফায় সিলেট সফর করছেন।

আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনার মো. আলীমুজ্জামান জানান, সিসিকের ১৩৪টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আম্বরখানা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও আম্বরখানা কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হবে।

এর মধ্যে একটিতে পুরুষ ও অপরটিতে নারী ভোটারদের ভোটগ্রহণ করার কথা। তবে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ওই ওয়ার্ডে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের দাবি জানালেও নির্বাচন কমিশন তা করেনি।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করতে হলে আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজন। তাই সেখানে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না।

রিটার্নিং অফিসের তথ্য কর্মকর্তা প্রলয় কুমার সাহা জানান, নির্বাচনে দুই হাজার ৯১২ জন কর্মকর্তা ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত থাকবেন।

এর মধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার ১৩৪ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ৯২৬ জন ও পোলিং অফিসার এক হাজার ৮৫২ জন রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ১১ নির্বাচন কর্মকর্তাকে নিজস্ব পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

এর মধ্যে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুককে পর্যবেক্ষক দলের প্রধান সমন্বয়কারী ও কুমিল্লার সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার খোরশেদ আলমকে উপ-প্রধান সমন্বয়কারী করা হয়েছে।

অন্য পর্যবেক্ষকরা হলেন- চট্টগ্রামের জেলা নির্বাচন অফিসার মো. মুনীর হোসাইন খান, মানিকগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসার তারেক আহমেদ, নেত্রকোনা জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ শুকুর মাহমুদ মিঞা, শেরপুর জেলা নির্বাচন অফিসার আবদুল্লাহ আল মোতাহসিন, কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. কামরুল হাসান, ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার সৈয়দা শারমিন সুলতানা, মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. তাজুল ইসলাম, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. ইকরামুল হাসান ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাচন অফিসার তানজিদা আফরিন ছন্দা।

শনিবার প্রচারণার শেষদিনে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেছেন, সিলেট নগরীর অধিবাসীরা আমার অত্যন্ত প্রিয়। তাদের কাছে কিছু চেয়ে কোনোদিন খালি হাতে ফিরিনি।

এ নগরের অধিবাসীরাই আমাকে বারবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। এবারের নির্বাচনেও আমি তাদের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি নৌকা প্রতীকের জয়গান শুনছি। মানুষ নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নেমেছেন।

আশা করি, অতীতের মতো এবারও এই পুণ্যভূমিতে উড়বে নৌকার বিজয় পতাকা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিলেটে রাজনীতি করছি। শাসক হিসেবে নয়, সেবক হিসেবেই নগরবাসীর পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও সুখ-দুঃখে জনগণের পাশে থাকব।

সকালে তিনি লালদীঘি হকার্স মার্কেট ও হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ এলাকা, দুপুরে আম্বরখানা বড়বাজার এবং খাসদবির মদিনাতুল উলুম দারুসসালাম মাদ্রসা এলাকায় গণসংযোগ করেন।

এ সময় বদরউদ্দিন কামরান মদিনাতুল উলুম দারুসসালাম মাদ্রসার শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন প্রিন্সিপাল মাওলানা মুফতি ওলিউর রহমান, মাওলানা মুফতি জাকারিয়া, মাওলানা মুফতি নাসির উদ্দিন, হাফিজ মাওলানা মঞ্জুর আহমদ, মাওলানা আবদুল খালিক, মাওলানা নিয়ামত উল্লাহ, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ প্রমুখ।

মতবিনিময় শেষে বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের বিজয় কামনা করে দোয়া করা হয়।

হকার্স মার্কেট এলাকায় গণসংযোগকালে বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের সঙ্গে ছিলেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুর হক আতিক, খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আফসর আহমদ, সিলেট মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আলম খান মুক্তি, আওয়ামী লীগ নেতা কয়েস আহমদ, কামাল আহমদ প্রমুখ।

আম্বরখানা বড়বাজার এলাকায় গণসংযোগকালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহিউদ্দিন আহমদ সেলিম, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হাজী ঝুনু মিয়া, কয়েস আহমদ, কামাল আহমদ, এম ইলিয়াছুর রহমান দিনার, বেলাল খান প্রমুখ।

অন্যদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সিলেট নগরের মানুষের প্রতি আমার অগাধ আস্থা। তারা যে কাউকে যেমন বুকে টেনে নিতে পারেন, তেমনি আঁস্তাকুড়েও ছুড়ে দিতে পারেন।

গত ৫ বছর আমার ওপর যে অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে এবং আমার কর্মীদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে তার বিচারের ভার আমি নগরবাসীর ওপরই ছেড়ে দিলাম। তিনি বলেন, কোনো ষড়যন্ত্র করে নির্বাচন বানচাল করা যাবে না।

সিলেটের মানুষ অন্যায় সহ্য করেন না। আপামর জনতা যদি ষড়যন্ত্রের বিষয় টের পেয়ে যান তবে ষড়যন্ত্রকারীরা পালাবার পথ খুঁজে পাবে না। তিনি প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়ার আহ্বান জানান।

শনিবার সিসিক নির্বাচনে শেষদিনের গণসংযোগ ও পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে সদ্যবিদায়ী মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমার কর্মী-সমর্থক প্রচার চালাতে পারছে না।

তারা বাড়িঘরে থাকতে পারছে না। এজেন্টদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় নগরবাসীকে সোচ্চার ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই নগরের মানুষই আমার বড় ভরসা।

আরিফুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, সিলেটে নির্বাচনের জন্য মনোনীত কয়েকজন প্রিসাইডিং অফিসার পরিবর্তন করা হয়েছে। আরিফুল হক চৌধুরী আরও বলেন, নির্বাচন বানচাল করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।

আমি আবারও বলছি, দয়া করে সিলেটের মাটিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করবেন না।

আরিফুল হক চৌধুরীর গণসংযোগ ও পথসভায় সঙ্গে ছিলেন বিএনপি ছাড়াও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতাকর্মীরা।

এ ছাড়া সিলেট নাগরিক ফোরামের ব্যানারে প্রার্থী হওয়া মহানগর জামায়াতের আমীর টেবিল ঘড়ি প্রতীকের এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিপিবি-বাসদের মেয়র প্রার্থী আবু জাফর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত ও উলামা-মাশায়েখ সমর্থিত হাতপাখা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী প্রফেসর ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খান ও হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ এহছানুল হক শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় দিনভর ব্যস্ত সময় পার করেন।

বরিশাল : সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রচারণার শেষদিনে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ করেছেন মেয়র প্রার্থীরা। নির্বাচন নিয়ে সংশয় এবং শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ৪ মেয়র প্রার্থী।

তাদের মধ্যে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার এবং বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতার কথা জানিয়েছেন।

পাশাপাশি নির্বাচনী কাজে বাধা এবং নেতাকর্মীদের হয়রানি করার কথা জানিয়েছেন এই দুই মেয়র প্রার্থী। এদিকে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে হুমকি দেয়ার অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্ল­াহ।

পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহাবুব বলেছেন, ক্ষমতাসীন দল প্রতিদিনই নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গ করছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন।

নগরীতে তিন বাহিনীর টহল চললেও ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থী বরিশালের জনগণের সমস্যা সৃষ্টি করে বিশাল শোডাউন করছেন। এছাড়াও নির্বাচনে শঙ্কার কথা বলছেন মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস।

শনিবার দুপুরে নগরীর সদর রোড এলাকায় গণসংযোগ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। গণসংযোগের ফাঁকে সরোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন করে বর্তমান সরকার প্রায় ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে যাচ্ছে।

সিটি নির্বাচন সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি পূর্বাভাস। প্রধানমন্ত্রীও বলছেন, সিটি নির্বাচনের জয় পরাজয়ে সরকারের কোনো পরিবর্তন হয় না এবং এটা করতে গিয়ে যাতে কোনো দুর্নাম না হয়।

বরিশালে আমরা নির্বাচন কমিশনের কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে, গাজীপুর খুলনার মতো নির্বাচন বরিশালে হবে না। বরিশালে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। গাজীপুর-খুলনার পর একটা বিষয়ে অবগত হলাম দলীয় সরকারের অধীনে ভোট আর সুষ্ঠু হবে না।

তিনি বলেন, হাইকোর্টের আদেশের পরও পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে। নির্বাচন কমিশনারকে আমরা বলেছি। কিন্তু ফল পাওয়া যায়নি। বিগত সময়ে আমরাও নির্বাচন করেছি, কিন্তু কেউ বলতে পারবে না আমাদের সময় নির্বাচনের আগে গ্রেফতার অভিযান চলেছে।

কিন্তু ২-৩ দিন সারা রাত ধরে অভিযান চলছে, গ্রেফতার করা হয়েছে নেতাকর্মীদের। তাহলে কারা নির্বাচন পরিচালনা করবে, পোলিং এজেন্ট না থাকলে, আর ভোটই বা করবে কারা?

তিনি বলেন, নৌকার প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল করছে। নৌকার স্টিকার পোস্টারে শহর ছেয়ে গেছে। মোটরসাইকেলের মহড়া চলছে, অথচ আমার পেছনে মোটরসাইকেল এলেই তাদের বাধা দেয়া হচ্ছে।

শনিবার সকালে নগরীর ফকির বাড়ি রোডস্থ বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। এ সময় তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কারও প্রতি খুব সদয়, আবার কারও প্রতি খুব কঠোর।

পক্ষপাতিত্বের মধ্যে দিয়ে এই নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা পুরোপুরি আস্থাহীনতায় ভুগছি নির্বাচন কমিশনের ওপর থেকে। নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের যে মুভমেন্ট দেখছি তাতে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা আর বোকার স্বর্গে থাকা সমান ব্যাপার।

সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য দরকার সমান সুযোগের পরিবেশ। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে পরিবেশ এখনও পরিপূর্ণভাবে তৈরি করতে পারেনি।

মনীষা বলেন, বিভিন্ন এলাকার বস্তিবাসী, রিকশাচালক আমার পক্ষে যারা প্রচার কাজ করছে তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। অনেককেই মারধর করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।

সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে সরকারি কর্মকর্তা, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়ররা প্রচার অভিযান চালাচ্ছে, যা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এই নারী মেয়র প্রার্থী বলেন, আমরা প্রতিটি কেন্দ্রে আমাদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করেছি। কক্ষ অনুযায়ী এজেন্টও দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি, তবে যাদের এজেন্ট দেয়া হবে তাদের ভয়ভীতি দেখানোর কারণে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে টিকে থাকতে পারব কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

অপরদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ শেষে কালেক্টরেট পুকুরপাড় এলাকায় পথসভা করেছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

এ সময় তিনি বলেন, আমি ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হওয়ায় সবাই অভিযোগের তীর আমার দিকে তুলছে। যেটা ঠিক নয়। আমিও নির্বাচন করছি তারাও করছে, এতে মিথ্যা অভিযোগ দেয়ার কিছু হয়নি।

আর আমি যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন বা কাউকে হুমকি, বাধা দিয়েই থাকতাম তাহলে তো সেটার খবরও সবাই পেত। যারা এসব অভিযোগ করছেন তারাই উল্টো আমাদের বাধা প্রদান করছেন এবং নির্বাচনের পর দেখিয়ে দেয়ার হুমকি-ধমকিও প্রদান করছেন।

আমার আশা বরিশালে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর ভোটারদের প্রতি আহ্বান থাকবে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা।

এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহবুব।

গণসংযোগের ফাঁকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের নামে মুখের বুলি দিলেও তার কোনো বাস্তবায়ন দেখাতে পারেননি। এই কারণে সিটি এলাকার ভোটারদের মনে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এছাড়াও মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়েছেন। আলাপকালে তিনিও নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানান।

গণসংযোগে বাধা দেয়ার অভিযোগ : ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার গণসংযোগ ও প্রচার কাজে দলীয় কার্যালয় থেকে বের হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধায় তার কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায় বলে জনিয়েছেন বিএনপির নেতারা।

শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জেলা ও নগর বিএনপি দলীয় কার্যালয় থেকে প্রচারণার জন্য বের হলে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, আমরা আগেও বলেছি এ নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন আমরা তার কথা বিশ্বাস করে নির্বাচন করছি।

এখন কি দেখছি- আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সরকারি দলের প্রার্থী হাজার হাজার লোক রাস্তায় জড়ো করে প্রচার চালাচ্ছেন। আর আমরা দলীয় কর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ ও প্রচার কাজে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ আমাদের ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিচ্ছে।

সরোয়ারের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, আবুল হোসেন খান, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন, জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন, মহানগর বিএনপির সহসভাপতি মনিরুজ্জামান খান ফারুক, মহানগর বিএনপি যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিনসহ বিভিন্ন দলীয় নেতা।

বিএনপি প্রার্থীর গণসংযোগে পুলিশের বাধার সময় উপস্থিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেন বলেন, বিএনপি প্রার্থী সরোয়ারের সঙ্গে কথা বলে ৬-৭ জন নিয়ে প্রচার করার প্রস্তাব দিলে সরোয়ার তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ কারণে তাকে বাধা দেয়া হয়েছে।

রাজশাহী : শেষদিনে বৃষ্টিতে ভিজে নগরীতে গণসংযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মহাজোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

শনিবার দিনের প্রথমভাগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করলেও বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নগরীর ৩০নং ওয়ার্ড এলাকায় গণসংযোগ করেন তিনি। এ সময় বৃষ্টি উপেক্ষা করে লিটনের পথসভাগুলোয় জনতার ঢল নামে।

এলাকাবাসী জানান, লিটন শনিবার বিকালে নগরীর ৩০নং ওয়ার্ডের বিনোদপুর বাজার থেকে গণসংযোগ শুরু করেন। এরপর মির্জাপুর, হনুফার মোড় ও আশপাশের এলাকায় বেশ কিছুক্ষণ প্রচারণা চালান।

পরে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের ওপর বিনোদপুর বাজারে একটি পথসভা করেন। এরপর নগরীর কাজলা, বাজে কাজলা ও তালাইমারি এলাকায়ও ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে যান লিটন।

এ সময় তিনি স্বাধীনতা ও উন্নয়নের প্রতীক নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করতে আহ্বান জানান। অন্যদিকে বিনোদপুর বাজারের পথসভায় লিটন বলেন, ১০ জুলাই থেকে শনিবার শেষদিন পর্যন্ত নগরীর সব ওয়ার্ডে গণসংযোগ ও পথসভা করেছি।

যেখানেই গেছি, সেখানেই নৌকার পক্ষে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। এককথায় নগরজুড়ে নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আমি রাজশাহীবাসীর অভূতপূর্ব সাড়া দেখে আবেগাপ্লুুত হয়েছি।

লিটন আরও বলেন, ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছি। উন্নয়নের মাধ্যমে নগরীকে চকচকে নগরী হিসেবে গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু গত ৫ বছরে সব উন্নয়ন ধ্বংস হয়ে গেছে বিএনপির মেয়রের কারণে।

যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা আর সময় নষ্ট করতে চাই না। নগরীর মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করতে চাই। এ জন্য আপনাদের মূল্যবান ভোট প্রয়োজন।

এদিকে একইভাবে দিনভর বৃষ্টি মাথায় করেই ব্যাপক গণসংযোগ করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। শনিবার সকালে বুলবুল নগরীর জেলগেট থেকে গণসংযোগ শুরু করে সিপাহীপাড়া, ফায়ার সার্ভিসের মোড়, সাহেব বাজার, আরডিএ মার্কেট, হেতেমখাঁ, সোনাদীঘি মনিচত্বর, কাঁচাবাজার, মাছবাজার, মাস্টারপাড়া পাইকারি বাজার, পদ্মার পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও কয়েকটি পথসভায় বক্তব্য দেন।

নির্বাচনী পথসভাগুলোয় দেয়া বক্তব্যে বুলবুল বলেন, আগামী ৩০ জুলাইয়ের আগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হলে রাজশাহীতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে।

নির্বাচনে কোনো অনিয়ম করার চেষ্টা করলে আমরাও ভোট কেন্দ্র দখল করব। নির্বাচন কমিশনকে সেদিন কৈফিয়ত দিতে হবে। ঘেরাও কর্মসূচি হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোরাদ মোর্শেদ নগরীর উপশহর, বিজেপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান কোর্ট এলাকায় এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম সাহেববাজার ও মালোপাড়া এলাকায় গণসংযোগ করেন।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter