প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ

  মুসতাক আহমদ ও আজমল খান, সিলেট থেকে ২৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেট
ফাইল ছবি

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট নগরীতে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। প্রধান দুই দলের প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ বাড়ছে।

হুমকি-ধমকি, ধরপাকড়, তল্লাশি, পাড়া-মহল্লায় সংঘাত-সংঘর্ষ লেগে থাকায় নগরীতে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে ভোটার ও সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

পুলিশ ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতা ও নির্বাচনী এজেন্টদের আসামি করা হচ্ছে। এসব ঘটনা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলের মেয়র ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীরা সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে এ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান।

তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি গুছিয়ে আনা হয়েছে। ভোটারদের নিরাপত্তায় তিন স্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকবে। মাঠে ৩৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন।

এছাড়া ট্রাইব্যুনাল গঠন, পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা মনিটরিংয়ে সেল স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত পক্ষপাতিত্বমূলক কোনো কাজ করা হয়নি।

ভোটারদের তিনি নিঃশঙ্কচিত্তে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নির্বাচন কর্মকর্তার বক্তব্য তাদের খুব কমই আশ্বস্ত করছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে নানা আতঙ্ক।

তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার পরও শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগ কার্যালয় এবং বুধবার রাতে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা নগরবাসীকে শঙ্কিত করে তুলেছে।

কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে একের পর এক মামলা, ধরপাকড় ও বাসাবাড়িতে পুলিশের অভিযানের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশের এমন তৎপরতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেকের আশঙ্কা, আতঙ্ক সৃষ্টি করে হয়তো নৌকার প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়া হবে।

সবার প্রশ্ন, এমন অবস্থায় সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ হবে কিনা, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে কিনা।

নগরীর সোবহানি ঘাটের বাসিন্দা আবদুল অদুদ বলেন, ভোট দেয়ার বিষয়ে আতঙ্ক তো আছেই। তিনি বলেন, কেন্দ্রে ঝামেলা বা মারামারি হতে পারে এমনটিও শুনছি লোকজনের মুখে।

এমন পরিস্থিতিতে ভোট কেন্দ্রে যাব কিনা তাই ভাবছি। উপশহর এলাকার বাসিন্দা রসুল মিয়া বলেন, আমরা সাধারণ জনগণ পছন্দের মানুষকে ভোট দিতে চাই। এক্ষেত্রে কেন্দ্রে কোনো ধরনের হট্টগোলের খবর রটলে অনেকেই কেন্দ্রে যাবেন না।

ভিন্ন কথাও বলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, নির্বাচনে উৎসব বিরাজ করছে। শহরের দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলার বাসিন্দা পাপ্পু মিয়া বলেন, আমি এবার প্রথম ভোট দেব। তাই ভোট নিয়ে আগ্রহ অনেক। মনের মধ্যে উৎসব-উৎসব ভাব লাগছে।

নির্বাচনে নানা শঙ্কার কথা তুলে ধরে শুক্রবার রাতে আকস্মিক সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ভোটারদের অবাধে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে তিনি শঙ্কিত।

ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা, গ্রেফতার, গুম করে কেন্দ্র দখল করার পাঁয়তারা চলছে বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

তবে হুশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সিলেটে বেরাচেরা (উল্টাপাল্টা) করে লাভ নেই। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। সিলেটের মানুষ এসব পছন্দ করে না। অধিকার কেড়ে নিলে মানুষ জেগে ওঠবে।

সব ‘ভয়ভীতি’ উপেক্ষা করে ৩০ জুলাই ভোট কেন্দ্রে যেতে নগরবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান। নির্বাচনে অনিয়ম হলে কেউ রাজপথ ছাড়ব না। প্রয়োজনে শাহাদাত বরণ করব।

শুধু বিএনপি প্রার্থীই নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমীর এহসানুল মাহবুব জোবায়েরও প্রচারে বাধা দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, কয়েক দিনে যা ঘটেছে তাতে আতঙ্ক আছে। যদিও রিটার্নিং কর্মকর্তা সুষ্ঠু ভোটানুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।

সিপিবির প্রার্থী মো. আবু জাফর মনে করেন, প্রশাসন বৈষম্যমূলক আচরণ অব্যাহত রাখলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। ইসলামী আন্দোলনের ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খানও এমন আশঙ্কার কথা জানান।

তবে সুষ্ঠু নির্বাচনে ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয়-শঙ্কা দেখছেন না আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। শনিবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র এক দিন বাকি।

এমন সময় আরিফুল হক যে কথা বলেছেন তা মনে হচ্ছে তিনি নির্বাচন বানচাল করতে চান। পরাজয়ের আশঙ্কায় আগেই তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কারণ তার দলের নেতারাই তার সঙ্গে নেই।

কামরান বলেন, বাধা দেয়া হলে আরিফুল হক কিভাবে সংবাদ সম্মেলন করলেন। তিনি বলেন, বরং তার নির্বাচনী কার্যালয়ে একাধিকার ককটেল হামলা হয়েছে। তার পোস্টার কেটে অন্যের পোস্টার লাগানো হয়েছে।

অসৎ উদ্দেশে আগাম অভিযোগ তোলা হচ্ছে। দেশের মানুষ নেতিবাচক রাজনীতি পছন্দ করে না। তারা উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত বাংলাদেশ দেখতে চায়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সেই দেশ গঠনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছি। সিলেটের মানুষ এসব দেখে নৌকাকে বিজয়ী করবে। আরিফুল হক এসব বুঝতে পেরে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন।

অবশ্য এটাই বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কামরান বলেন, সিলেটের মানুষ এসব অপপ্রচারে বিভ্রান্ত নয়। সুষ্ঠু ভোট হবে। আমি শান্তিপূর্ণ ভোট চাই।

রাজপথ দখলের নামে আন্দোলনের ভয় না দেখাতে আরিফুল হককে আহ্বান জানিয়ে কামরান বলেন, এসব বলে লাভ নেই। তারা (বিএনপি) কী করতে পেরেছেন দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে নিরপেক্ষ ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন কিনা সন্দেহ।

তারা কেন্দ্রে না গেলে অর্থহীন একটি নির্বাচন হবে। নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট এমন পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করব। শুরু থেকে লাগাম টেনে ধরলে, আচরণবিধি লংঘনের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

তিনি বলেন, প্রশাসনে কিছু অতিউৎসাহী ব্যক্তির কারণে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সমস্যা দিন দিন বড় আকার ধারণ করছে। নির্বাচন বিতর্কিত হলে এর দায় প্রশাসনকেই দেব।

উত্তেজনা উস্কে দিচ্ছে ৫ মামলা : সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে ছয় দিনের মধ্যে চারটি মামলা হয়েছে।

কামরানের নির্বাচনী কার্যালয়ে ককটেল হামলার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মামলা (২৭ জুলাই) করা হয়েছে। পুলিশের ওপর ককটেল হামলার (২৬ জুলাই) অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়েছে।

এর আগে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ একই দিনে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। ২৬ জুন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নামে আরেকটি মামলা হয়। এর বাইরে বিভিন্ন মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেফতার দেখানোর ঘটনা ঘটছে।

বেছে বেছে এজেন্টদের আসামি : পাঁচ মামলায় ৪৭৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। ২৭ জুলাইয়ের মামলায় বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের ৮০ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।

২৬ জুলাই ৪৮ জনের নাম উল্লেখ করে ৭৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করে। এতে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আক্তার হোসেনকে প্রধান আসামি করা হয়। ২২ জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী লীগের দুই মামলায় ১৭৮ জনকে আসামি করা হয়।

এরমধ্যে নির্বাচনী এলাকার বাইরে টুলটিকর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়।

এ ঘটনায় জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমদ, বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের ছেলে রুমান রাজ্জাক ও ছাত্রদল কর্মী এনামুলকে গ্রেফতার করা হয়।

অপর মামলায় আরিফের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক, সদস্য সচিবসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের আসামি করা হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter