সিলেটে ভোট দিয়ে নিরাপদে ফেরা নিয়ে সংশয়

কামরানের ভরসা নৌকা, আরিফের ইমেজ * আতঙ্ক নিয়েই ভোটারকে যেতে হবে কেন্দ্রে

  মুসতাক আহমদ ও সংগ্রাম সিংহ, সিলেট থেকে ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে ভোট দিয়ে নিরাপদে ফেরা নিয়ে সংশয়
সিলেটে ভোট দিয়ে নিরাপদে ফেরা নিয়ে সংশয়। ছবি: যুগান্তর

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৌনে সাত হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণও আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে চলা হামলা, গ্রেফতার ও বাড়িবাড়ি তল্লাশির ঘটনায় ভোটাররা উদ্বিগ্ন। পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক ভোটার। এ অবস্থায় বিএনপি নেতা ও বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নাকি আওয়ামী লীগ নেতা বদর উদ্দিন কামরান জয়লাভ করবেন, সেই প্রশ্ন নগরবাসীর মুখে মুখে। রোববার সারা দিন সরেজমিন ঘুরে এসব জানা গেছে।

দেশে নির্বাচন উৎসাহ-উদ্দীপনার হলেও এবার সিলেট সিটি নির্বাচন ঘিরে মামলা-হামলা, ধরপাকড়, নেতাকর্মীদের বাড়িতে তল্লাশি ও হয়রানির মতো ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক ভোটার। অবশ্য নগরবাসী ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ-উৎসাহ তুলনামূলক বেশি। নগরীর ১৩৪টি ভোট কেন্দ্রের ৯২৬টি কক্ষে ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার নতুন ভোটার। প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী।

এবার মেয়র পদে সাত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নগরবাসীরা জানান, প্রার্থী যতই থাকুক, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরান ও বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হকের মধ্যে। ২০০১ সালের ৩১ জুলাই সিলেট পৌরসভা সিলেট সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়। ২০০৩ সালের ২০ মার্চ প্রথম নির্বাচনে বদর উদ্দিন কামরান মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট দ্বিতীয় নির্বাচনে কারাগারে থেকে ভোট করে কামরান দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১৫ জুন তৃতীয় নির্বাচনে আরিফুল হক মেয়র নির্বাচিত হন। এ কারণে চতুর্থ নির্বাচনে সদ্যবিদায়ী মেয়র আরিফুলেরই প্রত্যাবর্তন ঘটছে, না পরিবর্তনের মাধ্যমে কামরান ফিরছেন নগরপিতার আসনে- সেই প্রশ্ন ফিরছে নগরবাসীর মুখে মুখে। অন্য মেয়র প্রার্থীরা হলেন- সিপিবির মো. আবু জাফর, ইসলামী আন্দোলনের ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমীর এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল হক তাহের।

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরান যুগান্তরকে বলেন, জনগণের কাছ থেকে যে সাড়া পেয়েছি, তাতে জয়লাভের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। নৌকার পক্ষে জোয়ার তৈরি হয়েছে। পরাজয়ের ভয়ে ভীত হয়ে প্রধান প্রতিপক্ষ নানা অভিযোগ তুলছেন। তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। কিন্তু সিলেটের জনগণ তা বিশ্বাস করে না। সকাল সাড়ে ৯টায় নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন কামরান।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার দেখে পরাজয়ের ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন তার প্রতিপক্ষ। তার জয় ছিনিয়ে নিতে আওয়ামী লীগ নানা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করছে। প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নানাভাবে হয়রানি করছে। তবে তিনি বিনা চ্যালেঞ্জে মাঠ ছাড়বেন না বলে জানান। সকাল ৮টায় নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে রায়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন আরিফুল হক।

নগরবাসীর সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, দলীয় প্রতীকে কামরান ও আরিফুল নির্বাচন করলেও জনগণের কাছে তাদের ব্যক্তি ইমেজই মূল বিবেচনার বিষয়। বিশেষ করে নতুন ও নারী ভোটাররা ব্যক্তি দেখে ভোট দেবেন। এক্ষেত্রে দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র, পারিবারিক বিষয়াদি, জনপ্রতিনিধি হিসেবে অতীতের কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিষয় ভোটাররা এখন মূল্যায়ন করছেন। ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে কামরান আবেগাপ্লুত হয়ে শেষবারের মতো ভোট চেয়েছেন একাধিকবার। অপরদিকে কাজের বিচার করে জনগণের করুণা প্রার্থনা করেছেন আরিফুল।

আওয়ামী লীগের মহানগর সাধারণ সম্পাদক ও কামরানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আসাদ উদ্দিন বলেন, সিলেটের মানুষ প্রতীকের পাশাপাশি ব্যক্তি ইমেজকেও প্রাধান্য দেয়। সেটি বিবেচনায় রেখে প্রার্থীকে নিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। জনগণের দারুণ সাড়া পেয়েছি। আর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও আরিফুলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য আলী আহমদ যুগান্তরকে বলেন, মেয়র হয়েও সরকারের রোষানলে পড়ে আমাদের প্রার্থী তিন বছর কারাগারে ছিলেন। মাত্র দুই বছর সময় পেলেও তিনি সিলেট শহরকে আধুনিক ও তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করেছেন। দৃশ্যমান উন্নয়ন ও ব্যক্তি আরিফের ইমেজের কারণে মানুষ ভোট দেবে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্রতীক ধানের শীষকে মানুষ হতাশ করবে না বলে আমরা আশাবাদী।

নির্বাচনে জয় পেতে মরিয়া দুই বড় দল। জয় ঘরে তুলতে তারা নানা পরিকল্পনা করেছেন। ভোট গ্রহণের সময় তারা মাঠে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের প্রধান টেনশন হল- আরিফুল হকের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং নিজস্ব ও দলীয় ভোট ব্যাংক। এ দুই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে আওয়ামী লীগ নানা কৌশল নিয়েছে। এছাড়া ভোটের ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে নতুন ও নারী ভোটারের ব্যাপারেও তাদের রয়েছে বিশেষ নজর।

সিলেটে ২০ দলীয় জোটের মধ্যে বিভক্তি আছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে জোটের পাঁচ শরিক দলের স্থানীয় নেতারা সমর্থন দিয়েছেন। বিএনপির জন্য জামায়াতের প্রার্থিতা বিষফোড়া হলেও আওয়ামী লীগের জন্য তা মিষ্টি ফল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আবার বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিম প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও আরিফুলের পক্ষে রহস্যজনক কারণে তিনি প্রচারে নামতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টির সমর্থন আওয়ামী লীগের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে। বিভেদ দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টিও নৌকা প্রতীকের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

অপরদিকে বিএনপির প্রধান টেনশন হল- জাল ভোট রোধ এবং দলীয় এজেন্ট নিশ্চিত করা। ভোটের আগের সপ্তাহে চারটি মামলায় বিএনপির পৌনে ৫০০ নেতাকর্মীকে আসামি করে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। আরিফুলের প্রধান পরিকল্পনাকারী ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবকে একদিন আগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া আরিফুলের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও মিডিয়া সেলের প্রধান জুরেজ আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নেতাকর্মীদের হয়রানি, হুমকিধমকির কারণে অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে গেছেন। অবশ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরিফের পক্ষ থেকেও নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এজেন্টদের যাতে পুলিশ ধরতে না পারে, সেজন্য রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত দলটির এজেন্টের নামের তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগের সিলেট মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, নেতাকর্মীদের সকাল সকাল ভোট দিতে বলা হয়েছে। নির্বিঘেœ ভোটাররা যাতে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেন, সেজন্য সহযোগিতা করতে নেতাকর্মীদের বলা হয়েছে। বিএনপির সিলেট জেলা সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, আমাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ জাল ভোট ঠেকানো ও পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে বসানো। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যাতে নির্বিঘেœ জাল ভোট দিতে পারে সেজন্য বেছে বেছে বিএনপির এজেন্টদের আসামি করা হয়েছে। তবে তা ঠেকাতে আমরা সব কেন্দ্রে এজেন্ট নিশ্চিত করব। বুথপ্রতি একাধিক বিকল্প এজেন্ট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদি একজনকে গ্রেফতার করে আরেকজনকে দেব। তাকে গ্রেফতার ও মারধর করে ফেরত পাঠালে বা গুম করলে তৃতীয়জনকে দেব। সময়মতোই এজেন্টরা কেন্দ্রে যাবেন। এজেন্টের তালিকা সকালে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়ার কথা জানান তিনি।

রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতরে আরিফুল : আরিফুল হক রোববার দুপুরে হঠাৎ একাই রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির হন। তিনি বলেন, বেশকিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছি; কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এরপরও শেষবারের মতো অভিযোগ করে গেলাম। তিনি বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৮-৯জন রিটার্নিং কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। শেষ সময়ে এসে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা পরিবর্তন কেন? রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বলেছি এরপরও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আমাকে কীভাবে আশ্বস্ত করবেন? এটা কিসের আলামত? আরিফুল বলেন, দেখে দেখে সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, নগরীতে এখনও আওয়ামী লীগের বহিরাগত নেতারা অবস্থান করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এসব অভিযোগের বিষয়ে কিছুই জানি না। পুলিশ পোলিং এজেন্টদের তালিকা চাইছে বা আওয়ামী লীগ নেতারা প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন- এমন তথ্য তার জানা নেই। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter