বরিশালে সেই প্রশ্ন, ভোট দিতে পারব তো

  শেখ মামুনূর রশীদ ও আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল থেকে ৩০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালে সেই প্রশ্ন, ভোট দিতে পারব তো
বরিশালে সেই প্রশ্ন, ভোট দিতে পারব তো। ছবি: যুগান্তর

একদিকে উৎসবের আমেজ অন্যদিকে আতঙ্ক, এমন পরিস্থিতিতেই আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বরিশাল সিটি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র বিএনপি শিবিরে। বাড়ি বাড়ি পুলিশি হানা, গ্রেফতার এবং হামলা মারধরের মুখে অনেকটাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। গতকাল রোববারও সংবাদ সম্মেলন করে এমনই অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা।

এদিকে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনাস্থার কথা জানিয়েছেন চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবায়দুর রহমান মাহবুব। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রচার-প্রচারণার শেষদিনে বরিশালে পথসভার নামে পুলিশ এবং প্রশাসনের সহায়তায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে যে বিশাল জনসভা হয়েছে তাতেই প্রমাণ হয়ে গেছে যে এখানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। সংবাদ সম্মেলন করে প্রায় একই অভিযোগ করেন বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী এবং লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকা জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস। এসবের পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, ভোটের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসেও সবার সেই একটাই প্রশ্ন, ভোট সুষ্ঠু হবে তো? নিজের ভোট কি নিজেই দিতে পারবে সবাই?’ প্রচারণার শুরুতেও একই প্রশ্ন ছিল সাধারণ ভোটারদের। এখনও কাটেনি তাদের সেই সংশয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘কান চিলে নিয়েছে শুনেই চিলের পেছনে দৌড় না দিয়ে আগে দেখা উচিত যে কানটা জায়গা মতো আছে কিনা। উনারা আগেভাগে কি করে বুঝলেন যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না? নাকি ভোট যাতে সুষ্ঠু না হয় সে জন্য তাদের ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা আছে? আমরা আশা করি যে ভোট সুষ্ঠু হবে এবং ভোটাররা তাদের ইচ্ছেমতো ভোট দেবে।’

বরিশালে আওয়ামী শিবিরে ভোট নিয়ে চলছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রায় সব ভোট কেন্দ্রে নৌকার লেমিনেটেড পোস্টার লাগানো আর কেন্দ্রের আশপাশে ছোট ছোট বুথ তৈরিতে ব্যস্ত এখন নেতাকর্মীরা। আজ সকালে যারা ভোট দিতে আসবেন, তাদের এসব বুথ থেকে ভোট তথ্যের স্লিপ সরবরাহের পাশাপাশি শেষবারের মতো নৌকায় ভোট চাইবেন তারা। কেবল ভোট কেন্দ্রই নয়, বিভিন্ন এলাকায় কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি চলছে তাদের নৌকার পক্ষে ইশারা ইঙ্গিতে ভোট প্রার্থনা। সিটি নির্বাচনে বরিশালে প্রচার-প্রচারণা শুরুর দিন থেকেই অনেকটা খোশমেজাজে ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। একদিকে পছন্দের প্রার্থীর মেয়র হিসেবে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তি এবং অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরে প্রার্থিতা নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব-বিভেদ না থাকায় শুরু থেকেই একাট্টা হয়ে যায় সবাই। নৌকার বিজয় নিশ্চিতে দিন-রাত একাকার হয়ে প্রচার-প্রচারণা চালায় দলটির নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থাপিত নির্বাচনী ক্যাম্প এবং ওয়ার্ড কার্যালয়গুলোও হয়ে ওঠে জমজমাট। গভীর রাত পর্যন্ত নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত সময় কাটায় দলটির নেতাকর্মীরা। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল জানান, ‘প্রার্থী হিসেবে সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ শুরু থেকেই ছিল আমাদের সবার পছন্দের। কেন্দ্র সেই পছন্দের মান রেখেছে। ফলে এখানে ভোটের লড়াই প্রশ্নে কোনোরকম অনৈক্য কিংবা বিভেদ ছিল না। তা ছাড়া সাদিক এখানে আরও ৩-৪ বছর আগে থেকে দল গোছানো আর নির্বাচনী প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছিল। ফলে প্রচার-প্রচারণার মাঠে আমাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। তফসিল ঘোষণার আগেই কেন্দ্র কমিটি পর্যন্ত গঠন সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল আমাদের।’ ভোটের মাঠের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নৌকার পক্ষে গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে। এটা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন বিপ্লবের ফসল। আমরা আশাবাদী যে নৌকা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’

আওয়ামী শিবিরে যখন ভোট নিয়ে এত আনন্দ-উল্লাস ঠিক সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র বিএনপিতে। ২৫ জুলাই থেকে বরিশালে শুরু হওয়া পুলিশি অভিযান, হামলা আর গণগ্রেফতারের মুখে পালিয়ে বেড়াচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। প্রচার-প্রচারণার মাঠে থাকা তো দূরের কথা, বাড়িঘরে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। বরিশালে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জেলা বিএনপির (দক্ষিণ) সভাপতি এবায়েদুল হক চান জানান, ‘এ পর্যন্ত ৫-৬ বার পুলিং এজেন্টদের নামের তালিকা পরিবর্তন করতে হয়েছে আমাদের। যখনই যে তালিকা করি শুনি যে ওই তালিকার ৮-১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আবার নতুন করে তালিকা করতে হয়। এ পর্যন্ত ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ক্ষমতাসীন দল যখন প্রচার-প্রচারণায় মাঠ কাঁপায় তখন আমাদের নেতাকর্মীরা হাইকোর্টের বারান্দায় জামিন নিতে ব্যস্ত। আমার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে পর্যন্ত দেয়া হয়েছে চাঁদাবাজির মামলা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আমাদের প্রচারকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে ৮-১০ জনকে। যেখানে আমাদের নেতাকর্মী তো দূরের কথা, ভোটার সমর্থকরা পর্যন্ত ঘরছাড়া সেখানে সুষ্ঠু আর নিরপেক্ষ ভোট কি করে হবে?’ বিকালে নগরীর সদর রোডে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনেও প্রায় একই অভিযোগ করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী অ্যাড. মজিবর রহমান সরোয়ার। সেখানে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। কিন্তু তার কোনো নমুনা তো আমরা দেখছি না। ভোটাররা ভোট দিতে যাবে কি, তারা তো এখন এলাকাছাড়া। ২৭নং ওয়ার্ডে আমরা একটা কর্মী সভা করলাম। আওয়ামী লীগ যখন দেখল যে কর্মী সভায় বিপুল জনসমাগম হয়েছে ঠিক তখনই তারা নিজেদের প্রচার ক্যাম্পে নিজেরাই আগুন দিয়ে মামলা করল। মামলায় আসামি করা হল ধানের শীষের ভোটারদের। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হল আরও অনেককে। এখন পুলিশ বিএনপির ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকজন গ্রেফতার করছে, তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। এভাবে আরও ২টি মামলা করা হয়েছে। ভোটাররাই যদি বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় তাহলে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবে কারা? তাছাড়া বর্ধিত এলাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বিপুলসংখ্যক বহিরাগত জড়ো করেছে ক্ষমতাসীন দল। ভোটের সময় এরা ভোটারের লাইনে দাঁড়িয়ে জাল ভোট দেবে এবং কারচুপি করবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’

আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য মেয়র প্রার্থীর এসব শঙ্কার পুনরাবৃত্তিই যেন সিটি নির্বাচনের ভোটারদের মুখে মুখে। আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর দিন থেকে ভোটের আগের রাত পর্যন্ত ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্ন সবার মুখে, ‘ভোট দিতে পারব তো?’ বরিশালে সিটি নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটলেও কেন এই জিজ্ঞাসা তা জানতে চাইলে এর উত্তরও যেন তৈরি সবার মুখে। ২১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেমায়েত হাওলাদার বলেন, ‘এমপি নির্বাচনে ভোট দেওন লাগেনায়। হেরা এমনে এমনে অইয়া গ্যাছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা আর পৌরসভার ভোডও তো দেখছি। হের উফর আবার হুনছি যে, খুলনা আর গাজীপুরেও বোলে কেউ ভোড দেতে পারেনাই। এহন বরিশালে যে ভোড দেতে পারমু হেইয়ার নিশ্চয়তা কি ?’ নগরীর বঙ্গবন্ধু কলোনির বাসিন্দা হারুন মল্লিক বলেন, ‘সরকারি দলের লোকজনে তো কয় যে ভোড ভালো অইবে, আবার দেহি পুলিশে আয়জান দিয়া বিএনপির লোকজন ধরতে আছে। ভোড নিরপেক্ষ অইলে পুলিশে বিএনপির লোকজন ধরবে ক্যা?’ লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা তসলিম সিকদার বলেন, ‘নেতারা তো কিছু কয় না, কয় মোগো আশপাশে যারা থাহে হেই পাতিগুলান। কয় ওমুক মার্কায় ভোড না দেলে নাহি এলাকায় থাকতে পারমু না। এতই যহন জালা তাইলে ভোট দেতেই যামু না।’ লাকুটিয়া এলাকার ভোটার মঈনুল খলিফা বলেন, ‘গত কয়দিন ধইর‌্যা পুলিশ যা হরতে লাগছে হ্যাতে ভোড ভালো অইবে ক্যামনে? নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব মাহমুদা বলেন, ‘মোর ভোড-টা কি মুই নিজে দেতে পারমু না যাইয়া হুনমু যে ভোড দেওয়া অইয়া গ্যাছে?’ বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের এসব মন্তব্য এবং প্রার্থীদের শঙ্কা বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশালের রিটার্নিং অফিসার মজিবর রহমান বলেন, ‘সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট গ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রার্থীরা অভিযোগ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে, আমরা আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি কিনা। আজও (রবিবার) আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার এবং এপিবিএন মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৫ হাজার ১৫ জন সদস্য। জুডিশিয়াল এবং নির্বাহী মিলিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দায়িত্বে থাকবেন ৪০ জন ম্যাজিস্ট্রেট। এরপরও অতিরিক্ত ব্যবস্থা থাকবে আমাদের। এখন আপনারাই বলুন, সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা কোথায়? অপপ্রচার, অভিযোগ থাকবে, এটা সব নির্বাচনেই থাকে। ভোট নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হল কিনা সেটাই মূল বিষয়। ইনশাআল্লাহ আমরা একটা ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারব।’

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter