‘মন্ত্রী হাসছিলেন’ শুনে ক্ষোভ জানান মিমের বাবা

  যুগান্তর রিপোর্ট ৩১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম
নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ‘তার মেয়ে মারা গেল অথচ কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে এলো না। উল্টো শুনলাম আমার মেয়েসহ দুজন মরার কথা বলতে বলতে আমাগো অভিভাবক মন্ত্রী শাজাহান খান নাকি হাসতে ছিলেন। কী বলব ভাষা নেই। দুঃখে আমার বুকটা ভাইঙ্গা আসছে।’

সোমবার এভাবেই যুগান্তরের কাছে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রোববার দুপুরে শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম মিম সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। এ সময় একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবদুল করিম রাজীবও (১৭) নিহত হন।

জাহাঙ্গীর বলেন, আমি সারা জীবন বাস চালাইছি, কিন্তু কই আমার গাড়িতে কখনও কোনো মায়ের বুক খালি হয়নি। আমি তো কাউরে মারি নাই। তাইলে আমার মতো মানুষের মেয়ের কপাল এমন হইল কেন? তিনি বলেন, আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই। এটা তো দুর্ঘটনা না। পুলিশ আমাকে বলছে মামলা করতে। আমি তো মেয়েরে নিয়ে ব্যস্ত। মেয়ের পোস্টমর্টেম করিনি। অমনি মাটি দিছি। কী মামলা হইছে জানি না। এটা তো হত্যা? আমি কেন সবাই বলবে এটা হত্যা।

জাহাঙ্গীর আরও বলেন, মেয়ে আমার কলেজে গেলে আমি রুটিন করে ওর মায়ের কাছে খবর নিতাম সে পৌঁছাইছে কিনা। আবার বাড়ি আইলে জিগাই আইছে কিনা। ২৭ বছর ধরে আমি ঢাকা-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে একতা পরিবহনের বাস চালাই। ওইদিন দুপুর ২টার সময় বাস নিয়ে আমার চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার কথা ছিল। ওর মারে কইলাম মেয়ে আইলে আমারে জানাইও। এই কথা কইয়া আমি বাইর হইছি কেবল। হঠাৎ এক ফোন আইল দুপুর ১টার দিকে। একজন কইল আপনার মেয়ে নাই, জলদি আসেন। আমি কেমনে যাব কিসে যাব ভাবতে পারতাছিলাম না। পরে বাসে রিকশায় বনানী পর্যন্ত গেছি। এক মোটরসাইকেলওয়ালাকে কইলাম ভাই আমার মেয়ে অ্যাকসিডেন্ট করছে আমারে লইয়া যান। এরপর যা দেখলাম তা আর ভাষায় প্রকাশ করতে পারমু না। গিয়া দেখি আমার মেয়ে আর নাই। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহাঙ্গীর। সেখানে মেয়ের ব্যবহৃত রক্তাক্ত ছাতা খুঁজে পান তিনি। তখন পরিছন্নকর্মীরা জায়গাটি পরিষ্কার করছিলেন। ভাঙা ছাতাটি ফেলে দিতে চাইলে তিনি বাধা দেন। মেয়ের ব্যবহৃত ছাতাটি স্মৃতি হিসেবে নিয়ে বাসায় ফেরেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাহাঙ্গীর বলেন, মেয়ে ভালো ছাত্রী ছিল। এসএসসিতে ভালো করছে। এ প্লাস পাইছে টিঅ্যান্ডটি মহিলা ডিগ্রি কলেজ থাইকা। কিন্তু শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ওর ভর্তি হওয়ার খুব ইচ্ছা। আবার এদিকে ভালো কলেজ নেই। তাই অনেক দূরে হলেও ওই কলেজে ভর্তি কইরা দিলাম। মেয়েটা খুব খুশি আছিল। প্রতিদিন কলেজে যায়-আসে। আমি খবর নেই ও ঠিকমতো আইছে কিনা। একবার গাড়ি নিয়ে আসা-যাওয়া করলে এক হাজার ২৫০ টাকা পাই। অনেক কষ্টের জীবন আমার। মেয়েকে বুঝতে দেই নাই কষ্টে আছি। শুধু চাইছি মেয়েটা বড় হোক। ওরে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল আমার...।

অভিমান করে জাহাঙ্গীর বলেন, এত দিন বাস চালাই কই ফেডারেশনের কেউ তো আইল না। মেয়ে মরা বাপ আমি কী কষ্টে আছি, কেউ তো খবর নিল না। মন্ত্রী তো আমাগো অভিভাবক, তিনি না আসতে পারলেও কাউকে পাঠিয়ে খোঁজ নিতে পারতেন। সেটাও তো করলেন না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঢাকায় যারা বাস চালায় তাদের ঠিকমতো গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নেই। তিনি বলেন, খোঁজ নেন এরা হেলপার। দুই দিন বাস চালাইয়া ড্রাইভার হইয়া গেছে। তো এরা মানুষ মারব না তো কি? এদের কোনো ঠিকানা নাই। আপনারা আসল জায়গায় হাত দেন। এই যে নিরাপদ সড়ক চান কী লাভ, আমার মেয়ে রে তো ফেরত পামু না। আপনারা উদ্যোগ নেন। আমি বাস চালানো শিখামু। প্রশিক্ষণ ছাড়া একজনেরও লাইসেন্স দিবেন না। আমি বিআরটিএকে সহায়তা করমু। মিমের মা রোকসানা বেগম বলেন, কিছুই চাই না আমি। মেয়ে হত্যার বিচার চাই। ওই কলেজে তার পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করলাম। কিন্তু সেই মেয়ে এভাবে মারা গেল। কষ্টের সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে আমার মন ভইরা রাখত। এখন আমার মা নাই। আমাদের ছেড়ে চলে গেল...। রোকসানা আরও বলেন, ঠিক এক মাস আগে ও কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কলেজের সব কথা আমারে কই তো। ওর কয়েকটা বই কম ছিল। তাও কালকে কিনা দিয়েছি। যাতে আমার মায়েরে স্যাররা কলেজে দাঁড় না করায়। মিমের বড় বোন রিয়া বলেন, আমাদের মধ্যে খুব মিল ছিল। ও গল্পের বই পড়তে ভালোবাসত। কার গল্প সেইটা দেখত না। কোনো গল্প ভালো হলেই ও পড়ত। গণিতে ভালো ছিল মিম।

রোববার দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এ সময় ১৫ জন আহত হয়। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন দুই শিক্ষার্থীর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ নুর নাহার ইয়াসমিন বলেন, গুরুতর আহত রিয়াদ ও আরাফাতের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তিনি বলেন, এ ঘটনায় গুজব ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাসের চাপায় দু’জন শিক্ষার্থী মারা গেছে।

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter