প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এখনও উপেক্ষিত

বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই ঋণের সুদ ৯ ভাগে নামেনি

  যুগান্তর রিপোর্ট ০১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো ব্যাংকেই ঋণের সুদ ৯ ভাগে নামেনি

নতুন অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাই পার হয়েছে। কিন্তু সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সরকারি ব্যাংক ছাড়া কোথাও বাস্তবায়ন হয়নি।

অথচ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্ত পহেলা জুলাই থেকে একযোগে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের নানা রকম সুবিধা নেয়ার পরও বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা না মানার সাহস কীভাবে পায় সেটাই এখন ভাবার বিষয়।

তারা বলেন, এমনিতে ভয়াবহ ঋণ জালিয়াতি ও দুর্নীতির কারণে পুরো ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উপরন্তু, ঝিমিয়ে পড়া বেসরকারি বিনিয়োগকে টেনে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তরকারী এ সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়ায় উদ্যোক্তারাও এক রকম হতাশ হয়ে পড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি খাতের কোনো ব্যাংকেই ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট বা ৯ শতাংশের মধ্যে নামেনি। কোনো কোনো ঋণের ক্ষেত্রে তারা এ হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামালেও ঋণের বিপরীতে নানা ধরনের ফি ও কমিশন আরোপ করে তা ডাবল ডিজিটেই বহাল রেখেছে।

অবশ্য বেসিক ব্যাংক ছাড়া বাকি সবকটি সরকারি ব্যাংক ইতিমধ্যে প্রায় সব ধরনের ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছে। যদিও বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ফি ও চার্জ আরোপ করে সরকারি ব্যাংকও ঋণের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখনও শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন ঋণ, পণ্য আমদানি ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেখেছে। মাঝারি শিল্পে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ, হাউসিং খাতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। ভোক্তা ঋণের ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ, রফতানিমুখী শিল্প স্থাপনে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে। এরফলে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগ।

সূত্র জানায়, সরকারি খাতের চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইতিমধ্যে প্রায় সব ধরনের ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তবে ঋণের বিপরীতে ব্যাংকিং সেবায় নানা ধরনের ফি ও চার্জ রয়েছে। এগুলোর কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণের খরচ কমপক্ষে ১ থেকে দেড় শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক এপ্রিলে আমানতের সুদের হার কমালেও ঋণের সুদের হার এখনও কমায়নি। তাদের প্রায় সব ঋণেরই সুদের হার ১০ থেকে ১৩ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৩২টি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। তবে বেশির ভাগ ব্যাংকেই এই হার ডাবল ডিজিটেই রয়েছে। পূবালী, উত্তরা, প্রাইম, ব্র্যাক, আইএফআইসি, ঢাকা, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট, এনসিসি, এক্সিম, ট্রাস্ট ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক শিল্প ঋণ, চলতি মূলধন ঋণের সুদের হার কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু অন্যান্য ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১৬ শতাংশে রেখেছে। এছাড়াও এবি, আল আরাফাহ, সিটি, এশিয়া, ইস্টার্ন, প্রিমিয়ার, মার্কেন্টাইল ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমালেও তারা প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ হার ডাবল ডিজিটে রেখেছে। নতুন প্রজšে§র মেঘনা, মধুমতি, এনআরবি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদের হার সামান্য কমিয়ে ডাবল ডিজিটেই রেখেছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত যেসব ঋণের সুদের হার কমিয়েছে সেগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র কৃষি ঋণ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ, রফতানি ঋণ ও মসলা চাষে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে রেখেছে। এগুলোর সুদ হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া। একইসঙ্গে এগুলো আগে থেকেই কার্যকর। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ ব্যাংকগুলো এসব ঋণের সুদের হার নতুন করে কমানোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃষি ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ ৯ শতাংশ, রফতানি ঋণ ৭ শতাংশ ও মসলা চাষের ঋণ ৪ শতাংশ সুদে বিতরণ করতে হবে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল থেকে যেসব ঋণ বিতরণ করা হবে সেগুলোর সুদের হার হবে ১০ শতাংশ।

এ বিষয়ে বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, প্রায় সব ব্যাংকই ঋণের সুদের হার ইতিমধ্যে কমিয়েছে। হিসাবের জটিলতায় যারা কমায়নি তারা খুব শিগগিরই কমিয়ে আনবে।

ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ব্যাংক ইতিমধ্যে উৎপাদন খাতে যেসব ঋণ দিয়েছে সেগুলোর সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে এনেছে। পর্যায়ক্রমে এ হার আরও কমবে। তবে সরকারি আমানত বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখনও কম সুদে পাচ্ছে না। যে কারণে সুদের হার কমানোর গতি ধীর।

উদ্যোক্তারা জানান, দেশে বিনিয়োগসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ঋণের সুদের হার কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এতে উদ্যোক্তারা পড়েছেন বিপাকে। তারা চড়া সুদের কারণে ঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপন করতে পারছেন না। ফলে পুঁজি বিনিয়োগ না করে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পের বিকাশ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ।

প্রসঙ্গত, বাজেট ঘোষণার আগে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণবভনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর এক সভায় তিনি ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য নির্দেশ দেন।

ওই সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। তাকে উদ্দেশ্য করেই প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

পরে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংক নানা ধরনের বিচার বিশ্লেষণ ও ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করে এ হার কমানোর উদ্যোগ নেয়।

এর আলোকে ২০ জুন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভায় সব ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার ৯ শতাংশে ও আমানতের সুদ হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় ।

সুদের এ হার তারা ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা জানায়। বিএবির সদস্য ৩৭টি ব্যাংক। এর মধ্যে ওইদিন ২৬টি ব্যাংকের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তারা ওইদিন এ হার কমাতে নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে ব্যাংকগুলো কাজ করছে। অচিরেই এ হার আরো কমে যাবে। এখন আমরা সরকারি খাতের আমানত পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। এগুলো পাওয়া শুরু হলেই ঋণের সুদের হার কমে যাবে।

এদিকে ঋণের সুদের হার কমাতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের একাধিক সংস্থা থেকে প্রবল চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কয়েকটি ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেও সুদের হার কমানোর বার্তা দেয়া হয়েছে। তারপরেও তারা সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনছে না।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter