হবিগঞ্জ এসি ল্যান্ড অফিস

একসনা লিজে ৩৯ বছরের খাজনা একসঙ্গে আদায়

লুটপাট চলছে সরকারি সম্পত্তি, রক্ষায় পদক্ষেপ নেই * সরকারের বিরুদ্ধে মামলায় বাদী সরকারি কৌঁসুলি * অভিযোগ না পেলে অবৈধ দখল উচ্ছেদে অনীহা

  সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন, হবিগঞ্জ ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জ এসি ল্যান্ড অফিস

হবিগঞ্জ এসি ল্যান্ড অফিসে চলছে নানা অনিয়ম। বছরে বছরে খাজনা আদায়ে কর্তৃপক্ষ যেন চরম উদাসীন। এজন্য একটি সরকারি জমির একসনা লিজে ৩৯ বছরের বকেয়া খাজনা একসঙ্গে আদায় করা হয়েছে।

অথচ একসনা লিজের ক্ষেত্রে এক বছর লিজমানি না দিলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার বিধান রয়েছে। অপরদিকে কোনো কাগজপত্র না থাকলেও জমিদারের প্রজা দাবি করে ওই জমির মালিকানা নেয়ার চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা। করছেন একের পর এক মামলা।

এসব মামলায় বাদী হয়েছেন স্বয়ং সরকারি কৌঁসুলি। মামলাগুলোতে বিরোধীয় জমিতে শ্মশান, কবরস্থান দেখানো হলেও বাস্তবে তা নেই। আর মন্দির, মাদ্রাসার কথা বলা হলেও মন্দিরের কয়েকটি পিলার ছাড়া কিছুই নেই, মাদ্রাসায় নেই কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী। ঘরও পরিত্যক্ত। যে যার মতো করে সরকারি এ সম্পত্তিটি লুটেপুটে নিচ্ছে।

দখলদারদের দাবি, তাদের বাড়ি সংলগ্ন হওয়ায় তারা এটি দখল করছেন। অথচ তা উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেই এসি ল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি (এসি ল্যান্ড) নাঈমা খন্দকার বলেন, কেউ অভিযোগ দিলেই সরকারি জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। লিজের বিষয়ে তিনি বলেন, জমিটি প্রথমে ১৯৭৫-৭৬ সালে লিজ দেয়া হয়েছিল। অনেক সময়ই লিজ গ্রহীতারা কয়েক বছরের টাকা জমিয়ে রাখেন। তাদের নোটিশ দিয়ে এনে লিজমানি আদায় করতে হয়। এক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। তা ছাড়া ৩৯ বছরের খাজনা একসঙ্গে নেয়ার ঘটনাটি ঘটেছে এখানে আমার যোগদানের আগে। আর যখন কোনো জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলে সেটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সে জমির লিজ বাতিল করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

সরকারি কৌঁসুলির (আইনজীবী) মামলার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি কৌঁসুলির সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কাজ করার কথা, কিন্তু তিনি কেন সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে মামলা করলেন তা তিনিই বলতে পারবেন। জমিটি অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় সেখানে অনেকেরই নজর পড়েছে বলে জানান এসি ল্যান্ড।

একসনা লিজের ক্ষেত্রে ৩৯ বছরের খাজনা একসঙ্গে আদায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অবমুক্তি মামলার বাদীদের একজন স্বয়ং সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) অ্যাডভোকেট মো. আফিল উদ্দিন। তিনি বলেন, আইনে বলা আছে, একসনা লিজের ক্ষেত্রে যদি কেউ এক বছর খাজনা পরিশোধ না করে তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিজ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তারা কিভাবে একসঙ্গে ৩৯ বছরের খাজনা নিয়ে একসনা লিজ দিলেন তা বোধগম্য হচ্ছে না। এছাড়া নিয়ম হলো কোনো জমি লিজ দেয়ার ক্ষেত্রে যদি কেউ দখলে থাকে তবে তাকে নোটিশ করতে হবে। উচ্ছেদ করতে হবে। সরেজমিন দখল সমঝিয়ে দিতে হবে। তার কিছুই তারা করেনি।

মামলার অপর বাদী শহরের যশেরআব্দা এলাকার আলহাজ শফিক উদ্দিন জানান, এটি সদর উপজেলার রিচি গ্রামের জমিদার নগেন্দ দত্ত চৌধুরীর জমিদারি স্বত্ব। তাদের রাইয়ত (প্রজা) হিসেবে গ্রামবাসী জমিটি ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই ভোগদখল করছে। ১৯৬৩ সালে গ্রামবাসীর পক্ষে জগদানন্দ সরকার ও সৈয়দ আলী মিয়া জমিটি গোচর, কবরস্থান, শ্মশান স্বত্ব ঘোষণার দাবিতে আদালতে একটি মামলা করেন। ১৯৭০ সালে গ্রামবাসীর পক্ষে মামলাটির রায় ঘোষণা করেন তৎকালীন মুন্সেফী ৩য় আদালত। এখনও ওই জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান আছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা এটির মামলা চালিয়েছেন। এখন আমরা চালাচ্ছি। আমাদের উত্তরসূরিরাও গ্রামবাসীর অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে যাবে।

কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, সদর উপজেলার উত্তরকুল মৌজার ৮০৬১, ৮৫৮৬, ৮০৩৪, ৮০৫৪, ৮০৫২ হাল দাগে মোট জমির পরিমাণ ২ একর ৯৬ শতাংশ। এটির পুরো অংশই রিচি গ্রামের জমিদার নগেন্দ্র চন্দ্র দত্ত চৌধুরীর পরিবারের সম্পত্তি। জমিদারি প্রথা বাতিলের পর ওই সম্পত্তি সরকারের দখলে যায়। ১৭৭৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ওই ভূমির ২ একর জায়গা একসনা বন্দোবস্ত নেয়ার আবেদন করেন কামড়াপুর গ্রামের ছুরাব আলী। যার কেস নং ২৩৯/৭৫-৭৬। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৮৮নং মেমোর মাধ্যমে ১৯৭৬ সালের ১৪ মে তৎকালীন সাব ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) ওই ভূমি তাকে একসনা বন্দোবস্ত দেন। এরপর ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি আর খাজনা দেন না। দীর্ঘদিন খাজনা না দেয়া হলেও সদর এসি ল্যান্ড অফিসের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাও ছিল না। তারা কোনো পদক্ষেপও নেয়নি। হঠাৎ করেই ২০১৭ সালের ৬ জুন ইজারাদারকে একটি চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। এতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্তকৃত ভূমি নবায়ন না করে আপনি ওই ভূমিতে অন্যায়ভাবে ভোগদখল করছেন। অতএব কেন আপনার বন্দোবস্ত বাতিল করা হবে না তার সন্তোষজনক জবাব এবং ২০১৭ সালের ২৮ জুন বকেয়া ইজারামূল্য পরিশোধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। ওই নোটিশ পাওয়ার পর ছুরাব আলীর ছেলে সাহেব আলী ওয়ারিশান হিসেবে ওই জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার আবেদন জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৮৫ থেকে ১৪২৪ বাংলা সন পর্যন্ত একসঙ্গে ৩৯ বছরের খাজনা আদায় করে তাকে ওই জমি লিজ দেয়া হয়। ০০৫৮০১নং রসিদে মোট ৪৪ হাজার ৯৪০ টাকা লিজ ফি বাবদ আদায় করা হয়।

এদিকে জমিদারি প্রথা বাতিলের পর জমিদার নগেন্দ্র চন্দ্র দত্ত চৌধুরীর প্রজা হিসেবে ওই ভূমির স্বত্ব দাবি করেন যশেরআব্দা গ্রামবাসী। গ্রামের পক্ষে জগদানন্দ সরকার ও সৈয়দ আলী মিয়াসহ কয়েকজন ১৯৬৩ সালে ডিক্রি হওয়ার দাবিতে একটি স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেন। ১৯৭০ সালের ৩০ এপ্রিল আদালত ওই মামলায় ডিক্রি রায় প্রদান করেন। একই বছর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার সিলেট জেলা জজ আদালতে আপিল দায়ের করেন। ১৯৭২ সালের ২৮ এপ্রিল আদালত আপিল খারিজ করে দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে জনৈক সামছুল হক চৌধুরী ওই ভূমির স্বত্ব দাবি করে প্রচারণা চালান। এর বিরুদ্ধে জগদানন্দ সরকার ও হাজী আমির উদ্দিনসহ কয়েকজন বাদী হয়ে গ্রামবাসীর পক্ষে হবিগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করেন। এতে সামছুল হক চৌধুরী ও সরকারপক্ষকে বিবাদী করা হয়। ১৯৯৪ সালে ওই মামলায় গ্রামবাসীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি হয়। একই বছর ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ আপিল করে। সরকারপক্ষ দাবি করে ওই ভূমি অর্পিত সম্পত্তি তালিকাভুক্ত। ইতিমধ্যে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন হওয়ায় আদালত আপিল মঞ্জুর করেন। ওই মামলায় ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল হবিগঞ্জ যুগ্ম জেলা জজ আদালত ১ সরকারের পক্ষে একটি আদেশ দেন। এতে উল্লেখিত ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনঃবিচারের জন্য প্রেরণ করেন। নিম্ন আদালত নথি প্রাপ্তির পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি করবেন বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে মামলাটি আদালতে চলমান আছে।

অর্পিত সম্পত্তি আইনের ধারা ১৩-এ বলা আছে, অর্পিত সম্পত্তি গেজেট প্রকাশের পর তালিকাভুক্ত কোনো সম্পত্তি নিয়ে যদি স্বত্ব মোকদ্দমা চলমান থাকে তবে তা আপনা-আপনি মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। মামলার কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। ওই জমি সরকারের জিম্মায় থাকবে।

পূর্বপুরুষের মৃত্যুর কারণে সম্প্রতি আবেদন করে গ্রামবাসীর পক্ষে মামলার বাদী শ্রেণীভুক্ত হন জীবন দাস। তিনি বলেন, ১৯৭৬ সালে ছুরাব আলীকে জমিটি লিজ দেয়া হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তিনি কখনও দখলে আসতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর এখন হঠাৎ এসে তার ছেলে অনেক বছরের খাজনা দিয়ে সেটি দখলের চেষ্টা করছেন। মন্দির এবং মাদ্রাসা দুটিই ৫-৭ বছর আগে করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মন্দিরটি নির্মাণাধীন আছে। মাদ্রাসায় ছাত্র নেই ঠিকই। এটিও পরিত্যক্ত আছে। মেরামতের কাজ চলছে। শ্মশান এবং কবরস্থান নদীর তীরে বিরোধীয় জমির বাইরে বলে তিনি স্বীকার করেন। অনেকেই জমি দখল করছে তা স্বীকার করে তিনি বলেন, তারা নিজেদের বাড়ির পেছনে খালি জায়গা আছে বলে দখলে নিচ্ছে। ব্যবহার করছে।

একসনা লিজ গ্রহীতা ছুরাব আলীর ছেলে সাহেব আলীর কাছে একসঙ্গে ৩৯ বছরের খাজনা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ১৯৭৪ সালে তার বাবা জমিটি লিজ নিয়েছেন। তখন থেকেই জমিটির দখল তাদের রয়েছে। ১৯৯১ সালে তার বাবা মারা যান। তিনি জমিটি লিজের বিষয়ে তেমন কিছু জানতেন না। ২০১৭ সালে তাকে খাজনা দেয়ার জন্য একটি লাল নোটিশ (চূড়ান্ত নোটিশ) দেয়া হয়। তা থেকেই তিনি জেনেছেন জমিটি তার বাবার লিজ নেয়া।

এরপর তিনি স্থানীয় কাউন্সিলর ও আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে খাজনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি ভাইবোনদের মাঝে সবার বড় ছিলাম। বাবা মারা যাওয়ার সময় আমারও বয়স কম ছিল। তাই তেমন কোনো কাগজপত্র আমার কাছে ছিল না। আমি তেমন কিছু জানতামও না জমিটির বিষয়ে। এখন আমি সব কাগজ জোগাড় করেছি।

তারা যে মাদ্রাসা, মন্দির দেখিয়েছে তার কোনো অস্তিত্বই বাস্তবে নেই। তারা জমিটি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে এমনটি করেছে। তাও আমি দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০ শতাংশ জমি ছেড়ে দিয়েছি।

সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কবরস্থান ও শ্মশান বিরোধীয় ওই জমির বাইরে খোয়াই নদীর তীরে। মাদ্রাসাটি ৪-৫ বছর আগে করা হয়েছে। একটি পরিত্যক্ত টিনের ঘর। এখানে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী নেই। মন্দিরের স্থানে শুধু কয়েকটি পিলার ছাড়া আর কিছুই নেই। এছাড়া যার যার বাড়ির পেছনের অংশ দাবি করে অনেকেই ওই সরকারি জমি দখল করছেন। কেউ আবার ঘরও নির্মাণ করেছেন। যেন সরকারি সম্পত্তি লুটপাট চলছে। এ নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিসেরও যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।

স্থানীয় মায়া দাশ, ধীরেন্দ্র দাশ ও মাখন পাল জানান, তাদের বাড়ির পেছনে জমিটি রয়েছে বলেই তারা দখলে নিয়েছেন। অনেকেই নিয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter