তৎপর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো

ঋণের সুদহার কমাতে বৈদেশিক তহবিলে নজর

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অলস অর্থের পাহাড় * বৈদেশিক তহবিল থেকে ঋণে ঝুঁকির মাত্রা বেশি-ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ * সুদহার না কমালে ঋণের বাজার বিদেশিদের হাতে চলে যাবে -আবদুস সালাম মুর্শেদী

  দেলোয়ার হুসেন ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুদহার কমাতে হবে

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদহার কমাতে এবার বহুজাতিক সংস্থাগুলোর বৈদেশিক তহবিলের দিকে নজর দিয়েছে সরকার। বহুজাতিক সংস্থা থেকে কম সুদে তহবিল এনে এসব অর্থ উদ্যোক্তাদের মাঝে ৯ শতাংশ সুদেই বিতরণ করা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে বৈদেশিক সংস্থা থেকে তহবিল সংগ্রহের নীতিমালাও শিথিল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে।

সূত্র বলছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘আইডিএলসি’তে অনেক আগেই বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। শেয়ারের বাজারমূল্যে এর পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি বেসরকারি সিটি ব্যাংকের ৪ কোটি ৬১ লাখ শেয়ার কিনে নিয়েছে আইএফসি। এ খাতে তাদের বিনিয়োগ ১৩১ কোটি টাকা। ফলে সিটি ব্যাংকের তহবিল বেড়েছে।

এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি), চীনের বিভিন্ন ঋণ দাতা সংস্থা, জার্মানির ঋণ দাতা সংস্থা, জাইকাসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেও তারা এ ঋণ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় তহবিল নিয়ে তারল্য প্রবাহ বাড়িয়েছে ব্যাংক এশিয়া, ইস্টার্ন ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক। এ ছাড়া ব্র্যাক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তহবিল নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বন্ড ছেড়ে বা বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তারা তহবিল বাড়াবে। সরকারও ওইসব সংস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়ার নীতিমালা জারি করেছে। তবে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনোভাবও ইতিবাচক। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সুদের হার কমাতে তহবিলের জোগান বাড়াতে হবে। বিদেশ থেকে কম সুদে তহবিল পাওয়া গেলে তা কাজে লাগানো হবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা মেনেই সব করা হবে।

সরকার আগে থেকেই বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক অর্থের প্রবাহ বাড়ছে। এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের হিসাবে সমপরিমাণ টাকা ছাড়ছে। যে কারণে ব্যাংকগুলোতে রাখা সরকারের আমানত বাড়ছে। এভাবে তারল্যও বাড়ছে। বিদেশি সংস্থা থেকে বেসরকারি ও সরকারি কোম্পানিগুলোর ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এসব ঋণের বৈদেশিক মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেখে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সমপরিমাণ টাকা দিচ্ছে। এর মাধ্যমেও ব্যাংকগুলোতে টাকার প্রবাহ বাড়ছে।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিদেশি সংস্থা থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। সরকারি কোম্পানিগুলোর বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি ডলার। সরকার বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও ১০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে। এ ব্যাপারে চীন, রাশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর ফলে এ বছরই বাজারে তহবিলের পরিমাণ অনেক বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ নিয়ে কথা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বৈদেশিক তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে কম সুদে ঋণ বিতরণ করা যাবে। তবে এতে ঝুঁকির মাত্রা বেশি। ঋণের অর্র্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে বা খেলাপি হয়ে গেলে সংকট আরও বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে বহুজাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোতে এখন অলস অর্থের পাহাড়। বিশ্বব্যাপী ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া, কঠিন শর্তের কারণে ঋণ নিতে অনাগ্রহী অনেক দেশ। ফলে ওইসব অলস অর্থ সহজ শর্তে ও কম সুদে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের দৃষ্টি এখন ওইসব তহবিলের দিকে। কেননা দেশীয় আমানতকারীদের কাছ থেকে এখন কম সুদে আমানত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বেশি হওয়ায় তাদের ঝোঁক এখন সেদিকে।

সূত্র জানায়, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ কমে গেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিনিয়োগযোগ্য অনেক তহবিল পড়ে আছে। এডিবি বিনিয়োগ বাড়ালেও তাদের হাতেও প্রচুর অলস অর্থ আছে। বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন আসা এশিয়ান অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) সহজ শর্তে বিনিয়োগ করছে। তাদের হাতেও অলস অর্থের পরিমাণ অনেক। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ তাদের কোটা বাড়িয়েছে। ওইসব সংস্থা থেকে সরকার ঋণ পাচ্ছে ০.৭৫ থেকে ২ শতাংশ সুদে।

বাণিজ্যিক ঋণ পাচ্ছে ২ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোও ওইসব সংস্থা থেকে ৪-৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছে। ব্যাংকগুলো তহবিল পাচ্ছে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে। এসব সুদের সঙ্গে ব্যাংকের ‘প্রেড’ ৪ শতাংশ যোগ করেও ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঋণ দেয়া সম্ভব। অথচ দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে সুদ দিতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। সার্ভিস চার্জসহ এই হার আরও বেশি পড়ছে।

আইএমএফের সদস্য দেশগুলোর জন্য ঋণের কোটা রয়েছে ৬৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। তাদের হাতে জমা রয়েছে আরও ২৯ হাজার কোটি ডলার। তারা কোটার বিপরীতে ছাড় করেছে মাত্র ২৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। ফলে তাদের হাতেও অলস অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড়ও কমে গেছে। ২০১৬ সালে সদস্য দেশগুলোকে ৬ হাজার ৪১৮ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ছাড় করে ৪ হাজার ৯০৪ কোটি ডলার। গত বছরও প্রতিশ্রুতি ছিল ৬ হাজার ১৭৮ কোটি ডলারের। ছাড় হয়েছিল ৪ হাজার ৩৫৮ কোটি ডলার। এ সংস্থায়ও অলস অর্থের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

সূত্র বলছে, এডিবি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সংস্থাটির বিনিয়োগযোগ্য ১৪ হাজার ২৬০ কোটি ডলারের তহবিলের মধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে ১১ হাজার কোটি ডলার। ৩ হাজার ২৬০ কোটি ডলার রয়ে গেছে। চীনের নেতৃত্বাধীন এআইআইবির কাছে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল রয়েছে ১ হাজার ৮৫২ কোটি ডলার। তারা ৩৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাকি অর্থ পড়ে আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশকে ১৫০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া জাইকা, ডিএফআইডি, সিডা, নোরাড এসব প্রতিষ্ঠানের কাছেও অলস অর্থের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

আইডিবির হাতেও অনেক অলস অর্থ। এগুলো তারা বিনিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছে। আইডিবি বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানি ও বেসরকারি খাতে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। এ খাতে আগে বছরে ১০০ কোটি ডলার দিলেও এখন তা বাড়িয়ে ১৫০ কোটি ডলার করেছে।

কথা হয় বাংলাদেশ রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, দেশি ব্যাংকে ঋণের সুদহার বেশি হওয়ায় অনেক কোম্পানিই এখন বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ নিচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার না কমালে ঋণের বাজার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাবে।

জানা গেছে, কয়েকটি ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে তারা নতুন ঋণ দিতে পারছে না। স্থানীয় আমানতকারীদের কাছ থেকেও আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না। এই তারল্য সংকট ঘোচাতে তারা এখন বৈদেশিক উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter