একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

সংকট ও সংঘাতের আশঙ্কা

সংকট নিরসনে দুটি দল ‘ওয়ান টু ওয়ান’ আলাপ করতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধানে আসতে হবে-অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান * আগে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সংলাপ, প্রয়োজনে ইসি পুনর্গঠনসহ সবই করতে হবে -অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী * সমস্যার সমাধান না হলে দেশ আবার গভীর সংকটে পড়বে। সমাধানের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে -অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ

  হাবিবুর রহমান খান ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ছবি: সংগৃহীত

সংবিধান অনুযায়ী বছরের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপরীত মেরুতে অবস্থান সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। এ ইস্যুতে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতি। দুই দলের মধ্যে সংলাপ বা সমঝোতার সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে।

কেউ ছাড় দিতে নারাজ। চলছে কথার লড়াই। বিএনপি রাজপথে আন্দোলন এবং ক্ষমতাসীনরা তা প্রতিহতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দল দুটির এমন মুখোমুখি অবস্থানে সামনের দিনগুলোতে আবারও সংঘাত ও সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তারা মনে করেন, সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এবার নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা না হলে ২০১৩ সালের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই দুই দলকে তাদের বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। আলাপ-আলোচনা বা সংলাপের মধ্য দিয়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।

নির্বাচনে জনগণ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে সব পক্ষকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। আলোচনায় বসলে একটা সমাধান হবেই।

বিশ্লেষকদের আরও অভিমত, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি ছিল খুবই সংঘাতপূর্ণ। ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ অন্য মন্ত্রীদের বক্তব্যও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ছিল।

সে সময় প্রধান দুই দলের কঠোর মনোভাবের কারণে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের মতো সেনাসমর্থিত সরকার আসতে বাধ্য হয়েছিল। একই কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

জানতে চাইলে লেখক, গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, প্রতিরোধ করতে গেলে তো পরিস্থিতি সংঘাতময় হবেই। তবে আশা করা যায় যে তা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এমন কিছু হবে না যা সমাজকে বিপর্যস্ত করবে।

তিনি বলেন, এ সংকট উত্তরণে একটা সংলাপ হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ সংলাপ হতে পারে। হতে পারে নির্বাচন কমিশনের মধ্যেও। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুটি রাজনৈতিক দল ওয়ান টু ওয়ান আলাপ করতে পারে। আবার যদি সম্ভব হয় তারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধানে আসতে হবে।

জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সাংঘর্ষিক কর্মসূচির বদলে সমঝোতামূলক কর্মসূচিকে প্রাধান্য দিয়ে তারা রাজপথে নামতে চায়। ধীরে ধীরে তা কঠোর হতে পারে।

তফসিল ঘোষণার আগে সরকারকে শেষবারের মতো আলটিমেটাম দেয়া হতে পারে। তাতেও সরকার পাত্তা না দিলে তফসিল ঘোষণার পরই পূর্ণশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করা হবে- এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

অন্যদিকে বিএনপির এ আন্দোলন হুমকি-ধমকিতে পাত্তাই দিচ্ছে না সরকার। সংলাপ দূরে থাক আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ‘সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠনের তোড়জোড় শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র জোটের এমপিদের সমন্বয়ে এ সরকার গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে।

বর্তমান সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নির্বাচনকালীন সরকারেও তাদের রাখার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপে বসবে না বলেও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, দুই দলের মুখোমুখি অবস্থানে সংঘাতের আশঙ্কা তো আছেই। আমরা সেটা আশা করব না। আমরা আশা করব এমন একটা নির্বাচন হওয়া যাতে মানুষ ভোট দিতে পারে।

সম্প্রতি শেষ হওয়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তাই এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারে। এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের, এ মুহূর্তে যারা সরকারে আছে।

তিনি বলেন, অংশগ্রহণমূলকের চেয়েও ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছে কিনা- তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে ধরনের কথা বলছেন তাতে কিন্তু মানুষ আশাবাদী হতে পারছে না।

নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করাটাই হচ্ছে এখন জনগণের চাহিদা। এটা কিভাবে হবে তা মীমাংসা করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

সিরাজুল ইসলামের মতে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরের কথা, আগে ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য যা যা করা প্রয়োজন, সব পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে সংলাপ একটা পদক্ষেপ হতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা। তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারে প্রয়োজনে তা পুনর্গঠন করা- এসবই করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের এই সময়টাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিএনপি একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। সে ক্ষেত্রে তারা এই সময়ে কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারে।

ক্ষমতাসীনরাও তা মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজপথে সহিংসতা করা হলে তা মোকাবেলায় সারা দেশে লক্ষাধিক কমিটি গঠনের কাজ চলছে। যে কোনো মূল্যে রাজপথ দখলে রাখবে তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে আবারও বিপরীতমুখী অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা কাম্য নয়। নির্বাচন নিয়ে তাদের অবশ্যই ঐকমত্যে আসতে হবে।

কিন্তু সরকারের সে রকম উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন হবে কিনা, হলে কেমন নির্বাচন হবে তা নির্ভর করছে সরকারের ওপর।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কর্মকর্তাদের যদি কোনো দলের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হয় তবে এখানে কি নির্বাচন হবে। রাষ্ট্র সরকার ও দলের মধ্যে যদি কোনো পার্থক্য করা না হয় তাহলে কি সেই নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে। তাই এসব বিষয় আগে সরকারকে ঠিক করতে হবে।

তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কেমন নির্বাচন চান। আর বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়া অনেকটা সরকারের ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচনে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হলে বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে যাবে বলে আশা করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

এমাজউদ্দীন বলেন, নির্বাচন কিভাবে করবে সেটা প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে বিরোধী দলকে আস্থায় আনতে হবে। তাদের বলতে হবে- আমরা এভাবে নির্বাচন করতে চাচ্ছি। আমরা ৫ জানুয়ারির মতো আর নির্বাচন করব না।

তিনি বলেন, টিভিতে একটা বক্তব্য দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। এজন্য সংলাপ হতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণই হচ্ছে সংলাপ। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের একটি সমাধান বের করতে হবে। এজন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সমাধানে না এলে দেশ আবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্য পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বড় দুই দল এক টেবিলে বসলে একটি সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনকালে একটি সহায়ক সরকার থাকতে হবে। যে সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করবে।

তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারবে না জেনেই আলোচনা-সমঝোতার সব প্রস্তাব এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা আবারও ৫ জানুয়ারির মতো একটা একতরফা নির্বাচন করতে চাচ্ছে। এজন্য আমাদের চেয়ারপারসনকে বিনা দোষে কারা অন্তরীণ করে রেখেছে।

কিন্তু আমাদের অবস্থান স্পষ্ট চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না এবং জনগণ সেই ধরনের নির্বাচন এবারও হতে দেবে না।

সংকট উত্তরণে সরকারকে ফের সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনরা যাই বলুক না কেন, তাদের সমঝোতায় আসতেই হবে। আমরা বিশ্বাস করি আলোচনা-সমঝোতা ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সংবিধানসম্মতভাবে যথাসময়ে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। সরকার সহায়তা করবে মাত্র।

নির্বাচনে হস্তক্ষেপ বা প্রভাবিত করার প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, নির্বাচনে কোন দল এলো বা না এলো সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। এটা নিজ নিজ দলের বিষয়। কিন্তু নির্বাচনে না এসে কোনো দল যদি অরাজকতা বা সহিংসতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করে সরকার তা শক্তহাতে প্রতিরোধ করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। তাই বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter