মাওয়ায় ফেরি বিপর্যয় পাটুরিয়ায় গাড়ির জট

গরুবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস পারাপারে দুশ্চিন্তা * মাওয়া-কাঁঠালবাড়ীতে চলছে কয়েকটি ছোট ফেরি * ঈদে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগে ধস নামার আশঙ্কা

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাড়ির জট
ছবি: সংগৃহীত

নাব্য সংকটের কারণে মাওয়া (শিমুলতলী)-কাঁঠালবাড়ী রুটে ফেরি চলাচলে বিপর্যয় নেমে এসেছে। রোববার ভোররাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত এ রুটে ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল। পরে ছোট ফেরি চলাচল শুরু করে।

এসব ফেরিতে ভারী যানবাহন যেমন বাস ও ট্রাক পারাপার করা হচ্ছে না। শুধু প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের মতো ছোট ছোট যানবাহন পার করা হচ্ছে। এর ফলে পদ্মা নদীর দুই পাড় মাওয়া ও কাঁঠালবাড়ী এলাকায় নদী পারাপারের জন্য শত শত বাস ও ট্রাক অপেক্ষমাণ রয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি রুটে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব বাস ও ট্রাক মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি পারাপার হয়ে চলাচল করত ওইসব যানবাহন বিকল্প পথ হিসেবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ভিড় জমাচ্ছে।

এতে খুলনা ও বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তবে দুই রুটেই লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ভারতের কলকাতা রুটে কয়েকটি বাস কোম্পানির গাড়ি চলাচল করে। এছাড়া খুলনা, যশোর, বরিশালসহ কয়েকটি জেলার বিলাসবহুল গাড়িও পার হয় এ ফেরি রুটে। কিন্তু ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় এসব বাসের অনেকগুলো বন্ধ রয়েছে।

কিছু কিছু বাস পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে চলাচল করছে। তবে বেশি সমস্যা হচ্ছে গরুবাহী ট্রাক পারাপারে। প্রচণ্ড গরমে মৃত্যুঝুঁকি থাকায় গরুবাহী ট্রাক ফেরিঘাটে বেশি সময় অপেক্ষমাণ রাখা যাচ্ছে না। এ কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলার খামারিরা গরু পাঠাচ্ছেন না।

ঈদ সামনে রেখে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের।

তবে আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি রুট পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। সোমবার বিকালে মুঠোফোনে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করছি। মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটের লৌহজং চ্যানেলে চর ভেঙে ফেরি রুটে নাব্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া উজান থেকে আসা পলিও সেখানে জমছে। পদ্মা নদীতে প্রচণ্ড স্রোতও রয়েছে। এসব কারণে বিআইডব্লিউটিএর সাতটি ড্রেজার দিয়ে খনন করেও ওই নৌপথে নাব্য ধরে রাখা যাচ্ছে না। নৌমন্ত্রী আরও বলেন, আমি আশা করছি ঈদের আগে এ রুট চালু করা সম্ভব হবে।

যাত্রী দুর্ভোগের বিষয়ে বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, মাওয়া হয়ে আমাদের বেশ কিছু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চলাচল করত। ফেরি বন্ধ হয়ে হয়ে যাওয়ায় কিছু বাস পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে চলাচল করছে।

আর কিছু বাস বন্ধ করে রেখেছি। অপরদিকে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তুম আলী খান বলেন, কাঁঠালবাড়ীতে শত শত পণ্যবাহী গাড়ি আটকে আছে। এগুলো আসতে পারছে না। এর মধ্যে পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের গাড়িও আছে।

তিনি জানান, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এ রুটে প্রচুর গরুবাহী গাড়ি পারাপার হয়, যা আসতে পারছে না। অপরদিকে বেনাপোল থেকে আসা পেঁয়াজও ঢাকায় ঢুকতে পারছে না। তিনি বলেন, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি রুটের একটি বন্ধ হলেই সারা দেশে এর প্রভাব পড়ে, যা মাওয়ার কারণে হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) যাত্রী ও ফেরি সার্ভিস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। সর্বশেষ রোববার ভোররাত ৩টা থেকে সোমবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

এরপর ছোট আকারের ফেরি চলাচল করছে। সাধারণ সময়ে এ রুটে দৈনিক আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার গাড়ি পারাপার হয়। সেখানে রোববার মাত্র ৯০০টি ছোট গাড়ি পার করা সম্ভব হয়েছে। বড় যানবাহন পাটুরিয়া হয়ে পারাপার করতে বলা হয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে ছোট-বড় ১৮টি ফেরি রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি ছোট আকারের ফেরি চলছে। বাকি ফেরি বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ২০টি ফেরি রয়েছে। সূত্র আরও জানায়, পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়ায় গাড়ির চাপ প্রচণ্ড বেড়েছে।

এ অবস্থার সামাল দিতে মাওয়া থেকে দুটি রো রো ফেরি ও একটি কে টাইপ ফেরি সরিয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় পাঠানো হয়েছে। রোববার এ রুটে ছয় হাজার যানবাহন পারাপার করা হয়, যা সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি।

বিআইডব্লিউটিসির জেনারেল ম্যানেজার (যাত্রী ও ফেরি) এসএম আশিকুজ্জামান বলেন, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে নাব্য সংকট থাকায় ফেরি চলতে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে গাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

নাব্য সংকটের কারণ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ছাইদুর রহমান বলেন, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটের শুধু লৌহজং চ্যানেলে নাব্য সংকট থাকায় বড় ফেরি চলতে পারছে না। নাব্য সংকট দূর করতে ৭টি ড্রেজার রাত-দিন কাজ করছে।

আরও দুটি ড্রেজার এসেছে। তিনি বলেন, তীব্র সে াতের কারণে ড্রেজার ও এর সংলগ্ন পাইপ এক স্থানে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে সময় লাগছে। তবে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ফেরি পারাপারে সমস্যা হচ্ছে না।

উভয় পাড়ে আটকে আছে ৫ শতাধিক গাড়ি : লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সোমবার বেলা ১২টা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চলছে ছোট ৫টি ফেরি। এগুলো হচ্ছে- কুমিল্লা, কাকলী, কেতকী, ফরিদপুর ও ঢাকা। তবে লঞ্চ ও সি- বোট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এ নৌ-রুটে।

আর রো রো ও ড্রাম ফেরি বন্ধ থাকায় শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী প্রান্তে আটকে আছে ৫ শতাধিক যানবাহন। এ কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। বিআইডব্লিউটিসির এজিএম খন্দকার শাহ খালেদ নেওয়াজ জানান, বেশ কিছু দিন ধরে নৌরুটের লৌহজং টার্নিং পয়েন্টের মুখে ডুবোচরের সৃষ্টি হয়।

উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে ক্রমাগত পলি পড়ে ডুবোচরটি দিন দিন বড় হতে থাকে। এ কারণে ফেরি চালকরা প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেন। ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই থাকত। ডুবোচরে আটকে ফেরির প্রপেলারসহ ইঞ্জিনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল। বিআইডব্লিউটিএকে বিষয়টি অবহিত করা হলেও তারা চ্যানেলটি কিছুতেই চালু করতে পারেনি।

মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. আরমান হোসেন জানান, নাব্য সংকটের কারণে ফেরিগুলো সীমিত পরিসরে চলাচল করছে। তবে লঞ্চ ও সি-বোটে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter