সিঙ্গাপুরে সামিটের বৈধভাবে বিনিয়োগের অনুমোদন নেই

তদন্ত করছে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট * বৈধভাবে টাকা নেয়ার সুযোগ নেই, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে -ডেপুটি গভর্নর রাজী হাসান

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মনির হোসেন

ফাইল ছবি

সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কোম্পানি সামিট গ্রুপকে বিনিয়োগের জন্য বৈধভাবে দেশ থেকে টাকা নেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়নি। এমনকি বিদেশে এ ধরনের বড় বিনিয়োগের জন্য গ্রুপটির কোনো আবেদনও নেই। ফলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিঙ্গাপুরে সামিটের বিপুল পরিমাণ সম্পদের যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা এখন নানা যৌক্তিক প্রশ্নের মুখোমুখি।

বিশেষ করে এই সম্পদের উৎস্য সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব পাওয়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের প্রভাবশালী অর্থ বাণিজ্যের সাময়িকী ফোর্বস ম্যাগাজিন সিঙ্গাপুরের ধনীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। ওই তালিকায় সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের নাম উঠে এসেছে। দেশটির শীর্ষ ৫০ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে এ গ্রুপের নাম রয়েছে ৩৪ নম্বরে।

দেশটিতে এই গ্রুপটির সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৯১ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় যা ৭ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ চলতি অর্থবছরের বিদেশি অনুদানের দ্বিগুণ এবং পদ্মা সেতুর ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

জানতে চাইলে বিএফআইইউ দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাউকে এ ধরনের অনুমোদন দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, সামিট গ্রুপের ব্যাপারে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের উন্মুক্ত উৎস (ওপেন সোর্স) থেকে সংবাদ এলে অবশ্যই তা খতিয়ে দেখা হয়। তাই আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এটি আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ।

এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যমান আইনে এ ধরনের ঘটনা আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত করে। এছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও (সিআইডি) বিষয়টি তদন্ত করতে পারে। আর এই দুই সংস্থা থেকে কোনো ধরনের সুপারিশ এলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে দুদক। তিনি বলেন, এর বাইরে দুদকের কিছু করার নেই।

জানা গেছে, বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তির বিদেশে বিনিয়োগ বা সম্পদ থাকলে তা অবশ্যই আয়কর ফাইলে উল্লেখ করতে হবে। এক্ষেত্রে সামিটের আয়কর ফাইলে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সামিট গ্রুপ থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হয়নি। তারা বলেছে, তারা বৈধভাবে সেখানে বিনিয়োগ করেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআরকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে কেউ বিদেশে বিনিয়োগ করলে অবশ্যই তা আয়কর ফাইলে উল্লেখ করতে হবে। এই আয়, করযোগ্য না হলেও সম্পদ বিবরণীতে তা উল্লেখ করতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে দ্বৈতকর পরিহার চুক্তির (ডাবল ট্যাক্সেশন অ্যাভয়ডেন্স এগ্রিমেন্ট) সুযোগ রয়েছে।

সামিটের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই চুক্তি থাকলেও আয়কর ফাইলে বলতে হবে। এখানে স্পষ্ট করে বলতে হবে আমি ওই দেশে কর দিয়েছি। যে কারণে বাংলাদেশে আমার এই সম্পদ করযোগ্য নয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (বিডা) নাভাস চন্দ্র মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ নেই। তবে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা নিয়ে কাজ চলছে। এখনও তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে কেস টু কেস ভিত্তিতে বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সামিট অনুমোদন দেয়া হয়েছে কিনা তা বাংলাদেশ ব্যাংক বলতে পারবে।

এ ব্যাপারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে সব ধরনের সম্পদ আয়কর ফাইলে দেখাতে হয়। তা না হলে ফাইল পূর্ণাঙ্গ হয় না। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিদেশে সম্পদ থাকতে পারে। তবে সেটি অবশ্যই আয়কর ফাইলে দেখাতে হবে।

এ ব্যাপারে জানতে সামিট গ্রুপের কর্ণধার আজিজ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সব বিনিয়োগ বাংলাদেশে। ফোর্বস ম্যাগাজিন এই বিনিয়োগের ভ্যালু উল্লেখ করেছে। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে এলএনজি আমদানিও অন্যান্য খাতে ২৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।’

৬৩ বছর বয়সী আজিজ খান গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সিঙ্গাপুরে স্থায়ী বাসিন্দা। গ্রুপটি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে অন্যতম। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে সামিট গ্রুপ বাজার থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেছে।