প্রভাবশালীর ফোনকলে বন্ধ হয়ে যায় মাদকবিরোধী অভিযান

মামলা ও গ্রেফতারের পরিবর্তে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও বিয়ার ‘হোটেল আমারি’র যথাস্থানে রেখে আসতে বাধ্য হন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা * অভিযানে অংশ নেয়া কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হতাশ

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তোহুর আহমদ

মাদকবিরোধী অভিযান। ফাইল ছবি

১৬ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা। গুলশান এলাকার একটি বড় মাদকের আস্তানায় অভিযানের জোর প্রস্তুতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের। ঘটনাস্থলের আশপাশে মোতায়েন করা বিপুলসংখ্যক আর্মড পুলিশ। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার গাড়ির বহরও আসতে শুরু করে।

সব প্রস্তুতি শেষে শুরু হয় অভিযান। প্রায় এক ঘণ্টার অভিযানে আমদানি নিষিদ্ধ বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও বিয়ারের ক্যান জব্দ করা হয়। কিন্তু মামলা দায়েরসহ যখন জড়িতদের গ্রেফতার করার প্রস্তুতি চলছিল ঠিক তখনই একটি ফোন কল সব ওলট-পালট করে দেয়।

অভিযান পরিচালনায় নেতৃত্ব দেয়া কর্মকর্তা সবার উদ্দেশে বলে ওঠেন ‘স্টপ’। বলা হয়, অভিযান বন্ধ এবং জব্দ করা মদ-বিয়ারের বোতল যেখানে যে অবস্থায় ছিল সেভাবে রেখে আসতে হবে। এমন কথা শুনে সবার চক্ষু চড়কগাছ অবস্থা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাই করতে বাধ্য হন তারা।

শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছে। তারকা খচিত অতি সৌভাগ্যবান হোটেলটির নাম ‘হোটেল আমারি’। গুলশান-১ ও ২-এর মাঝামাঝি ৪১ নম্বর রোডের ৪৭ নম্বর প্লটে হোটেলটির অবস্থান।

এদিকে এ ঘটনায় অভিযানে অংশ নেয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এভাবে যদি বড় অভিযান বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর সাহসী কোনো ভূমিকা রাখতে চাইবেন না।

অবৈধ মাদকের আখড়া আরও বাড়তে থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, অনেক চেষ্টা করেও তারা অভিযান বন্ধ করে দেয়া প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারেননি।

অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানান, হোটেলটির ১৪ ও ১৫ তলায় অবস্থিত মদের বারে ঢুকে তারা রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। দেখতে পান, থরে থরে সাজানো শত শত বোতল আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি মদের বোতল ও বিয়ারের ক্যান। অথচ এ হোটেলে বিদেশি মদ আমদানির কোনো ধরনের লাইসেন্সই নেই।

সে কারণে হোটেলের বারে এক বোতল বিদেশি মদও থাকার কথা নয়। একপর্যায়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে আনা এসব বাহারি ব্র্যান্ডের মদ-বিয়ার জব্দ করা হয়। একে একে বারের সেলফ থেকে বিদেশি মদ-বিয়ার ভর্তি কার্টন নামিয়ে গাড়িতে তোলা হয়।

একই সঙ্গে হোটেলের লবি, গুদামসহ আরও কয়েকটি জায়গায় তল্লাশি চালাতে শুরু করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। হোটেলের একটি জায়গায় পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ সিসা ও সিসা সেবনের হুক্কা। এরপর পুরো হোটেলে চিরুনি অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু রাত ৯টার দিকে প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোন আসার পর হঠাৎ করে সিনেমার শুটিং বন্ধ করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। আগুনে বরফ ঢেলে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটে। তারা প্রতিবেদককে বলেন, যে কর্মকর্তার কাছে ফোনটি এসেছিল তার কাছে তখন মনে হচ্ছিল যেন এখানে অভিযানে এসেই তারা বড় অপরাধ করে ফেলেছেন।

সূত্র জানায়, এ অভিযানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ মন্ত্রণালয়ের একটি টিমও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। সম্ভবত, তারাও একই সূত্রে ফোন পেয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে যায়।

উপস্থিত কর্মকর্তাদের কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, শুধু অভিযান বন্ধ করা নয়, জব্দ করা সবকিছু আগের জায়গায় রেখে সবাইকে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে নির্দেশ দেয়া হয়। ওই সময় তারা খুবই বিব্রত ও অপমানবোধ করেন।

সূত্র জানায়, জব্দকৃত মদ ও বিয়ার আগের অবস্থানে রেখে আসতে তাদের রাত ১০টা বেজে যায়। তবে খুবই মর্যাদাহানিকর এমন অভিযানের কথা তারা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। বিশেষ করে অভিযান দলে থাকা যেসব কর্মকর্তা অপেক্ষাকৃত সাহসী এবং এ ধরনের অভিযান করার পক্ষে তারা মানসিকভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছেন।

তাদের সবচেয়ে বড় পরাজয় হল- সংবাদমাধ্যমে পাঠানো অভিযানের ছবি ও প্রেস রিলিজ প্রত্যাহারের ঘটনা। রাত ১১টায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক খোরশিদ আলম পাঠানো সংবাদ প্রত্যাহার করে নেন।

জানা যায়, অভিযানের সময় হোটেল আমারিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার অন্তত ২০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

এরা হলেন- ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুর রহমান, ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা, ঢাকা উত্তরের সহকারী পরিচালক খোরশিদ আলম, ঢাকা দক্ষিণের সহকারী পরিচালক সামসুল ইসলাম, গুলশান সার্কেলের পরিদর্শক সামসুল কবির, সূত্রাপুর সার্কেলের পরিদর্শক হেলাল উদ্দীন ভূঁইয়া, সবুজবাগ সার্কেলের পরিদর্শক ইব্রাহিম খান, তেজগাঁও সার্কেলের পরিদর্শক রায়হান আহমেদ খান, রমনা সার্কেলের পরিদর্শক কামরুল ইসলাম, মিরপুর সার্কেলের পরিদর্শক ইলিয়াস হোসেন, উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক মাসুদুর রহমান প্রমুখ।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে স্ব স্ব সার্কেলের জনবল ও যানবাহন নিয়ে যৌথ এ অভিযানে অংশ নেন তারা।

শনিবার এ বিষয়ে অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘একটা মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলব।’ এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অভিযান দলের নেতৃত্বে থাকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। কিছু বিদেশি মদ-বিয়ার জব্দও করা হয়েছিল। কিন্তু পরে কাগজপত্র দেখে আমরা ছেড়ে দিয়েছি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, হোটেলটিতে দীর্ঘদিন ধরে আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি মদের জমজমাট ব্যবসা চলছে। ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে আমরা অভিযান শুরু করেছিলাম। কিন্তু একটা ফোন কল সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে।

অধিদফতরের একজন অতিরিক্ত পরিচালক যুগান্তরকে বলেন, শুধু ‘হোটেল আমারি’ নয় সম্প্রতি আরও কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালাতে গিয়ে তাদের এমন ‘ফোন বিড়ম্বনার’ মধ্যে পড়তে হয়েছে।

এর মধ্যে পল্টন এলাকার একটি জুয়ার আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে নারকোটিক্সের কর্মকর্তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলির হুমকি দেয়া হয়। কারণ ওই জুয়ার আস্তানা পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন যুবলীগের এক নেতা। সেখান থেকেও গভীর রাতে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচেন নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী যথাযথ অনুমোদন ছাড়া কোনো জায়গায় বিদেশি মদের মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। হোটেল আমারিতে বিদেশি মদ আমদানির কোনো ধরনের লাইসেন্স নেই।

অথচ হোটেলের বারে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদের মজুদ পাওয়ায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এত মদ তারা কোথায় পেলেন। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে আনা ছাড়া এত বড় মজুদ গড়ে তোলা অসম্ভব।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে এ হোটেলটিতে দুটি বার লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। গোপনে সব রীতি-রেওয়াজ ও আইনকে পাশ কাটিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে বার লাইসেন্স বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।

লাইসেন্স ইস্যুর আগে বাধ্যতামূলক পরিদর্শন প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক লেখেন- ‘হোটেলটি দুই তারকা মানের হওয়ায় এখানে কোনোভাবেই বার লাইসেন্স ইস্যু করা যাবে না।’ কিন্তু পরিদর্শন প্রতিবেদন বিপক্ষে থাকলেও লাইসেন্স পেতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্রের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি বার লাইসেন্স ইস্যু করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এ লাইসেন্স ইস্যু নিয়ে অধিদফতরজুড়ে এখনও নানা ধরনের কথাবার্তা চালু আছে।