রোহিঙ্গা সংকটের ১ বছর

প্রত্যাবাসনে টালবাহানা মিয়ানমারের

আশ্রয় দিয়ে নানা সমস্যায় বাংলাদেশ * উল্টো বাংলাদেশের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা * সীমান্তে নতুন করে সতর্কতা জারি মিয়ানমারের * নির্যাতনে জড়িতদের বিচার দাবি আসিয়ানের ১৩২ এমপির

  শফিক আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি ২৫ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তের শূন্য রেখার বেড়ার কাছে জড়ো হয়েছে রোহিঙ্গা শিশুরা-এএফপি
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তের শূন্য রেখার বেড়ার কাছে জড়ো হয়েছে রোহিঙ্গা শিশুরা-এএফপি

মিয়ানমারে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি অস্থায়ী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। গত বছর ২৫ আগস্ট দেশটির রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসব শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এদের ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের কোনো আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং নানা রকম কুটকৌশল অবলম্বন করে চলেছে দেশটি। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও এভাবে অনিশ্চিত ভাসমান অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকতে চান না তারা। শুক্রবার কুতুপালং লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, বালুখালী, ময়নারঘোনা, তাজনিমারখোলা ও শফিউল্লাহকাটা আশ্রয় শিবির ঘুরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আরসা নামক একটি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের সেনা ছাউনিতে হামলার ঘটনার অজুহাতে গত বছর ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমার বাহিনী। দেশটির সেনা, বিজিপি ও উগ্রবাদী রাখাইন যুবকরা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে রোহিঙ্গা নর-নারী, শিশুর ওপর বর্বরোচিত নৃশংসতা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে বানের পানির মতো বাংলাদেশের দিকে ছুটতে থাকে রোহিঙ্গারা। বর্তমানে নতুন-পুরনো মিলে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বলে (রোহিঙ্গা নিবন্ধনে নিয়োজিত) বাংলাদেশ পাসপোর্ট অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে।

ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারী হামিদ হোসেন, আবু তাহের, আবুল ফয়েজ, ডা. জাফর আলম নামের কয়েকজন শিক্ষিত রোহিঙ্গা যুগান্তরকে জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আটকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করে মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে অং সান সু চি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা হতাশাজনক। তারা বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়ে যে মহানুভবতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বে বিরল। যার কারণে আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মিয়ানমার সরকার এখন প্রত্যাবাসন নিয়ে টালবাহানা করছে।

আদৌ আমাদের ফেরত নেয়ার কোনো উদ্যোগ মিয়ানমার সরকারের মধ্যে দেখছি না। গত নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়। এরপর দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। কিন্তু চুক্তি সইয়ের পর ১০ মাসেও সেই চুক্তির প্রধান কোনো শর্তই মিয়ানমার বাস্তবায়ন করেনি।

মূল সমঝোতা চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসিত হবে তাদের নিজ নিজ গ্রামে। সম্ভব হলে স্বগৃহে। কোনো কারণে যদি সেটি সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের এমন স্থানে নিতে হবে, যেটি তাদের গ্রামের নিকটবর্তী। কিন্তু মিয়ানমার শুধু দুটি অভ্যর্থনা ক্যাম্প এবং একটি ট্রানজিট ক্যাম্প ছাড়া আর কোনো কাজই করেনি। জমিজমা বা নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত না করে ফিরে গেলে আবারও আমাদের নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে।’

ইতঃপূর্বে জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা রোহিঙ্গাদের লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা সরাসরি শুনেছেন। মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কিছুটা নমনীয় হলেও বিভিন্ন অজুহাত তুলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঝুলিয়ে রেখেছে। সর্বশেষ ১১ এপ্রিল মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী ড. উইন মিয়ান আয়ে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন এবং রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন।

এ সময় মিয়ানমারমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু কীভাবে, কখন নেয়া হবে, সে কাজটা মিয়ানমার সরকার করছে না। এদিকে বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। আশ্রয় নেয়া এলাকাগুলোর পরিবেশ-প্রতিবেশ এরই মধ্যে হুমকির মধ্যে পড়েছে। স্থানীয়রা নানা ধরনের সংকটে পড়েছেন।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি সিঙ্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘মিয়ানমার শরণার্থীদের নিতে প্রস্তুত। তাদের পুনর্বাসনের জন্য জায়গাও ঠিক হয়েছে। কিন্তু তাদের পাঠানোর দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশের। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।’ তবে অং সান সু চি’র এ বক্তব্যকে দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের নেত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তার বক্তব্য বাস্তব অবস্থা থেকে শত যোজন দূরে। এ ধরনের মন্তব্য সত্যিই খুব বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, ১৬ ফেব্রুয়ারি দু’দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ৬৭৩ পরিবারে ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে হস্তান্তর করা হয়েছে। মিয়ানমার ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে ৩৭৪ জন রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হলেও কখন, কীভাবে প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি এখনও।

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের যেন মিয়ানমার ফিরিয়ে নেয়, সেজন্য সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কতিপয় এনজিও কর্মী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে না ফেরার জন্য ইন্ধন জোগাচ্ছে। এর কারণ হল- রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে গেলে বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি টাকা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন।

মিয়ানমার সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবস্থা জারি করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে এ ব্যবস্থা নিয়েছে তারা। নিরাপত্তা রক্ষার নামে সীমান্ত বরাবর বসিয়েছে ১৬০টিরও বেশি পুলিশ আউটপোস্ট। এ খবর দিয়েছে মিয়ানমারের অনলাইন ইরাবতী। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্র“ কোনারপাড়া ঘুরে দেখা যায়, সীমান্তে কাঁটাতার ঘেঁষে অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমার সেনারা। হঠাৎ সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা উপস্থিতির কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে নোম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রিত ৫ হাজার রোহিঙ্গা ও সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয়রা।

মিয়ানমারের বিচার দাবি আসিয়ানের ১৩২ এমপি’র : রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নিধনযজ্ঞের জন্য দায়ীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচ দেশের ১৩২ জন আইনপ্রণেতা। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে মিয়ানমার সরকার এবং দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বাড়াতে হবে।’

বিবৃতিদাতা আইনপ্রণেতারা ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও পূর্ব তিমুরের পার্লামেন্ট সমস্য। তাদের মধ্যে ২২ জন আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (এপিএইচআর) সদস্য। রোহিঙ্গা সংকটের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগের দিন ২৪ আগস্ট এপিএইচআরের ওয়েবসাইটে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

সেখানে বলা হয়, ‘মিয়ানমার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর না করায় রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনায় তাদের বিচারের মুখোমুখি করার এখতিয়ার হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নেই। এ অবস্থায় কেবল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদই পারে আইসিসির মাধ্যমে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত শুরুর ব্যবস্থা করতে।’

এপিএইচআরের চেয়ারপারসন মালয়েশিয়ার এমপি চার্লস সান্তিয়াগো বিবৃতিতে বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে হত্যাযজ্ঞ শুরু করার পর এক বছর পেরিয়ে গেল। ওই ঘটনায় দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার কোনো লক্ষণ আমরা এ পর্যন্ত দেখিনি। মিয়ানমার যেহেতু নিজেরা বিষয়টির তদন্ত করতে অনিচ্ছুক, সেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এখন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে হবে।’

চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, ‘এ অঞ্চলের আরও ১৩১ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আমি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানাই, মিয়ানমারের বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব আইসিসিতে পাঠান।’ মিয়ানমারে যারাই ওই ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকুক না কেন, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’

বিবৃতিদাতা এমপিরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানকেও এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়ার তগিদ দিয়েছেন।

১৩২ এমপির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘মিয়ানমারে সুবিচারের অভাব কেবল রোহিঙ্গাদের নয়, কাচিন ও শান প্রদেশে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপরও প্রভাব ফেলছে, যেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের কারণে হাজারও মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।’

এপিএইচআরের পর্ষদ সদস্য ইন্দোনেশিয়ার এমপি ইভা কুসুমা সুন্দরি বলেন, ‘মিয়ানমারের ভেতরে এর বিচার হবে, সেই আশায় বসে থাকার সময় পেরিয়ে গেছে। সত্যিকারের সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার ম্যানডেট তাদের আর নেই। আসিয়ানকে এখন তাদের হস্তক্ষেপ না করার নীতি থেকে অবশ্যই সরে আসতে হবে। এ সংকট এখন মানবতার সংকট। জোটের সদস্য একটি দেশে নির্বিচারে এ ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড আমরা চলতে দিতে পারি না।’

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter