নির্বাচনী জোট নিয়ে ভাবনা

ভিন্ন কৌশল আওয়ামী লীগের

বিএনপি নির্বাচনে এলে মহাজোট না এলে আ’লীগ-জাপা পৃথক জোট : নাসিম * চলছে বাম ও ইসলামী ঘরানার দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা

  মাহবুব হাসান ও রেজাউল করিম প্লাবন ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে ভিন্ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনী জোট গঠন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে তারা প্রায় একই পথ অনুসরণ করবে।

কৌশলের অংশ হিসেবে ভোটে বড় দলগুলোর অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট বা মহাজোট গঠনের বিষয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে মহাজোট নিয়ে অগ্রসর হবে ক্ষমতাসীনরা। আর না নিলে হিসাব হবে অন্যরকম। বাম এবং ইসলামী ঘরানার দলগুলোর সঙ্গেও ক্ষমতাসীনদের ঐক্য হতে পারে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নেয়া হবে নানা ধরনের পদক্ষেপ। বোঝাপড়ার মাধ্যমে এসব দল আওয়ামী লীগের কাছে ‘নির্বাচনী’ ছাড়ও পেতে পারে। সেপ্টেম্বরজুড়েই চলবে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যুগান্তরকে বলেন, আগামী নির্বাচন প্রশ্নে অনেক দলের সঙ্গেই আলোচনা হচ্ছে। আরও অনেকের সঙ্গে হবে। এদের কেউ জোটে আসবে, কেউ আসবে না। আমরা আশা করি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।

দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি যদি অংশ নেয় তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের আকার যতটা সম্ভব বড় করার কৌশল নেবে ক্ষমতাসীনরা। সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের সব শরিকসহ আরও বেশ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে মহাজোট। আর বিএনপি ভোটে না এলে আওয়ামী লীগ শুধু ১৪ দলগতভাবে নির্বাচন করবে। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে একটি জোট এবং অন্যান্য দল আলাদাভাবে নির্বাচন করবে। ছোট ছোট দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে উৎসাহ দেয়া হবে।

বিএনপি নির্বাচনে এলে জোটের হিসাব পাল্টে যাবে বলে জানান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম। শনিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, জোটের পরিধি বাড়বে তবে সেটা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের দু’ভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি আছে। বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টিসহ একটি বৃহৎ জোট গঠন করব। এখানে জোটের বাইরে আলোচনা চলছে এমন দলও থাকবে। আর বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না এলে আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেবে। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে আরেকটি জোট পৃথকভাবে নির্বাচন করবে। একাদশ জাতীয় নির্বাচন সবার অংশগ্রহণেই হবে বলেও আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জয় নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জিং নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে একটি বৃহৎ জোট গঠনের পথে হাঁটছেন তারা। এই জোটে সমমনা দল ছাড়াও বাম ও ইসলামী ধারার দলগুলোও থাকতে পারে। জোট সম্প্রসারণে এরই মধ্যে একাধিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বসে নেই দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। গত জুলাই মাসে তিনি বেশ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সশরীরে সাক্ষাৎ ও টেলিফোনে আলাপ করেছেন। আলাপের বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। তবে আগামী নির্বাচনে মিত্রের সন্ধানে তিনি টেলিফোন করেছেন তা সংশ্লিষ্ট দলগুলোর একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

শাসক দলের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র বলছে, বিএনপি নির্বাচনে আসবে ধরে নিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে। তবে বিকল্প ভাবনাও আছে দলটির। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে একটি বৃহৎ মোর্চা গঠন করবে তারা, যা মহাজোট নামে ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। তবে এবার এই মোর্চায় ২০ দলের বেশ কয়েকটি দলও অংশ নেবে বলে যুগান্তরকে জানায় সূত্রটি। আর বিকল্প প্রস্তুতি হল- বিএনপি ছাড়া নির্বাচন। সে নির্বাচন অধিকতর গ্রহণযোগ্য করতে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে পৃথক একটি জোট গঠন করা হতে পারে। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকবে ১৪ দলীয় জোট। এখানেই শেষ নয়। দুই জোটের বাইরে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত জোটকেও কাছে টানতে নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে।

পাশাপাশি ইসলামিক ফ্রন্ট, তৃণমূল বিএনপি এবং ইসলামভিত্তিক সাতটি দলের একটি জোট আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। সব মিলে আগামী নির্বাচনে বিএনপি না এলে যত বেশি সম্ভব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতিই থাকছে ক্ষমতাসীনদের। বিএনপিবিহীন নির্বাচনে অংশ নিতে ছোট ছোট অনেক দলকে নানাভাবে উৎসাহিত করা হবে।

জানা যায়, ইতিমধ্যে ১৪ দলীয় জোটে ভিড়তে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন ৭ দলীয় ইসলামী গণতান্ত্রিক জোট। দলটির মহাসচিব আবদুল মজিদ পঞ্চগড়ী যুগান্তরকে বলেন, জোটে যোগ দেয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে। এই জোটের দুটি দল নিবন্ধিত।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী ১৫ দলীয় আরেকটি জোট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে ভিড়তে যোগাযোগ করছে। এ জোটের সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন গণতান্ত্রিক ইসলামিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম খান। এ জোটের নেতারা ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের অফিসে গিয়েও আলোচনা করে এসেছেন।

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। ৩১ দলীয় এই জোটকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হয়েছে। প্রয়াত শওকত হোসেন নিলুর জোট ‘ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ও ঝুঁকছে ক্ষমতাসীন জোটের দিকে। এছাড়া জোটে আসার বিষয়ে আগে থেকেই চূড়ান্ত করা হয়েছে সৈয়দ বাহাদুর শাহর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ফ্রন্টকে।

জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে তৃণমূল বিএনপি এবং বাংলাদেশ জাতীয় জোটের (বিএনএ) চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জোটে থাকার বিষয়ে ইতিবাচক কথা হয়েছে। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ১৪ দলে না থাকলেও নির্বাচনী জোটে থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়েছে। তিনি বলেন, তার দল ও জোট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে থাকছে এটা নিশ্চিত। তবে নির্বাচনের গতিবিধির ওপর নির্ভর করবে কোন রূপরেখায় তারা জোটে থাকবেন। সেটা পরবর্তীকালে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, বাম প্রগতিশীল ধারার বেশ কয়েকটি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে মৌখিক কথা হয়ে আছে। নির্ধারিত সময়ে তারাও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে অংশ নেবে।

অন্যদিকে গত মাসে বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৪ জুলাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ এবং সিপিবির সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সিপিবির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ওবায়দুল কাদের। এরপর ২৬ জুলাই সাধারণ সম্পাদক বৈঠক করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও রাজনৈতিক জোট বিএনএ’র সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার সঙ্গে। এর দু’দিন পরই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের পরিধি বাড়াতেই এসব পদক্ষেপ। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখেই এসব কার্যক্রম। দলগুলোকে জোটে টানতে না পারলেও যাতে তারা নির্বাচনে অংশ নেয় সে রকমই ছিল আলোচনার গতিপ্রকৃতি। সূত্র জানায়, এর বাইরে নিবন্ধিত বিভিন্ন দলের সঙ্গেও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter