বিশ্বমানে পিছিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত

বেড়ে যাচ্ছে ব্যবসার সার্বিক খরচ

মূলধন ঘাটতি, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সুদ ও মুদ্রা বিনিময় হার ব্যাপক ওঠানামায় ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাই ফুটে ওঠে। এতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আস্থা কমে যায়। তখন বাড়তি চার্জ আরোপ করে- ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

  দেলোয়ার হুসেন ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বমানে পিছিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত

আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের হার, মূলধনের জোগান, সুদের হার, তারল্য পরিস্থিতি, মুদ্রার বিনিময় হার- এই পাঁচটি সূচকে দেশের ব্যাংকগুলোর অবস্থান আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেকটা দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য বাড়তি ফি দিতে হচ্ছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে ব্যবসার সার্বিক খরচ। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে ব্যবসায়ীরা।

সম্প্রতি প্রণীত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সুদের হারে ও মুদ্রা বিনিময় হারে ব্যাপক ওঠানামায় সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাই ফুটে ওঠে। এর ফলে শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আস্থা কমে যায়। তখন তারা বাড়তি চার্জ আরোপ করে। এতে ব্যবসা খরচ বেড়ে যায়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানের মাত্রায় নিয়ে যেতে বিভিন্ন সূচকের ঘাটতিগুলো মেটানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য ২০১৫ সালে রোডম্যাপ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংকগুলোকে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। যেসব ব্যাংক লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না তাদের রেটিং নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো চাপে পড়ে সূচকগুলোর নির্ধারিত মানে নিতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার থাকতে হবে কমপক্ষে সাড়ে ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোর জন্য এই হার চলতি বছরের মধ্যে সাড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু গত মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংরক্ষণ করেছে মাত্র ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরে ওই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয় বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৯টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে।

এদিকে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার ভারতে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৫ দশমিক ২ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।

আন্তর্জাতিকভাবে খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে হলে ঝুঁকিপূর্ণ আওতার বাইরে ধরা হয়। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার গড়ে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই হার ব্যাংকভেদে ৫ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। তবে ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১১টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি ব্যাংক ৫টি (ওরি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এন এ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ব্যাংক আল ফালাহ এবং এইচএসবিসি) এবং বেসরকারি ব্যাংক ৬টি (ইস্টার্ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক)। তবে কোনো সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশের নিচে নেই।

আন্তর্জাতিকভাবে সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিকতা রাখতে হয়। খুব সামান্য হারে কমাতে বা বাড়াতে হয়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমস, যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এই হার সাম্প্রতিক সময়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির অন্যতম উপকরণ ট্রেজারি বিল কেনার চুক্তির (রেপো) সুদহার গত এপ্রিলে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ০.৭৫ শতাংশ কমিয়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এ বছরের শুরুর দিকে তারল্য সংকট বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদহার এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দেয় ৩ থেকে ৪ শতাংশ।

আমানতের সুদহার বাড়ায় ২ থেকে ৪ শতাংশ। এতে সুদের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে চার মাসের মধ্যেই আবার সুদের হার কমানোর জোর তৎপরতা শুরু হয়।

ঋণ ও আমানত ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হয়, যাতে তারল্য পরিস্থিতি সব সময় স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বেশির ভাগ সময়ই এটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকছে না। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ব্যাংকিং খাত অতিরিক্ত তারল্যের ভারে আক্রান্ত ছিল।

গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য ছিল। তখন ঋণের সুদের হারের চেয়ে আমানতের সুদের হার বেশি কমেছিল। এতে সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকে আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হয়। এদিকে সুদের হার কম থাকার কারণে ঋণ প্রবাহও বেড়েছিল।

ফলে একদিকে ব্যাংকের অলস অর্থ ফুরিয়ে যায়, অন্যদিকে আমানত আসছিল কম। এই দুইয়ে মিলে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। তখন ঋণ ও আমানতের সুদের হার আবার বেড়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা ফের সংকটে পড়ে। ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনার এই প্রবণতাকে বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করা হয়।

কোনো কারণে তারল্য সংকটের মুখে পড়ে একটি ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর। ফার্মার্স ব্যাংক তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং খাতের ওপর।

মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রফতানি আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা, রেমিটেন্স প্রবাহের গতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়, যা পুরো অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য রক্ষিত হয়। গত কয়েক বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার অতিরিক্ত মাত্রায় ওঠানামা করছে। এর প্রভাবে ডলারের দাম কখনও বেশি বেড়ে যাচ্ছে। আবার কমে যাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

উল্লেখ্য, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নিরূপণে আন্তর্জাতিক মনদণ্ডেই এই সূচকটি (মুদ্রা বিনিময় হার) ব্যবহৃত হয়। অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে এটি ব্যবহৃত হয় না। কেননা মুদ্রার বিনিময় হার নিরূপণের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর কোনো হাত নেই। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও রাষ্ট্রের নীতি পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়।

এসব ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীন হলে ব্যাংকের সম্পদের বিপরীতে আয় কমে যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মুনাফায়। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা কমে যায়। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিদেশি ব্যাংকগুলো যে কোনো দেশের ব্যাংকের এলসি গ্রহণের ক্ষেত্রে বা বৈদেশিক কোনো লেনদেনের বিষয়ে গ্যারান্টি দিতে গেলে এসব বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলো কোনো খাতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে বিদেশি ব্যাংকগুলো এলসি গ্রহণ করতে চায় না, কোনো ব্যাংক গ্রহণ করলেও তৃতীয় কোনো ব্যাংকের গ্যারান্টি চায়। এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক ঋণ ও সার্ভিস চার্জের সুদের কারণে তো খরচ বাড়ছেই। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে নানা ধরনের চার্জ। এসব কারণেও খরচ বাড়ছে।

সূত্র জানায়, সরকারি একটি ব্যাংকে হলমার্ক জালিয়াতি, বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি, ফার্মার্স ব্যাংকে তারল্য সংকটের খবর প্রকাশিত হলে এসব ব্যাংকের এলসি গ্রহণে বিদেশি ব্যাংকগুলো আপত্তি তোলে। কিছু ক্ষেত্রে এলসি গ্রহণ করা হলেও এর বিপরীতে তৃতীয় কোনো ব্যাংকের গ্যারান্টি নেয়া হয়। এ জন্য প্রতি তিন মাসের জন্য ০.২০ থেকে ০.৪০ হারে দিতে হয় চার্জ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৪টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ করে। সূচকগুলো হচ্ছে, ঋণ, সুদ হার, মূলধন পর্যাপ্ততা ও তারল্য ব্যবস্থাপনা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এর ভিত্তিতে তৈরি ঝুঁকির মাত্রায় ৫টি প্রতিষ্ঠান ছিল গ্রিন জোনে, ইয়েলো জোনে ছিল ২১টি এবং লাল জোনে ৭টি প্রতিষ্ঠান। গত মার্চে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিন জোনে ৫টি, ইয়েলো জোনে ১৭টি এবং রেড জোনে ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাৎ ৪টি প্রতিষ্ঠান ইয়েলো জোন থেকে রেড জোনে এসেছে। একই সঙ্গে নতুন আরও একটি প্রতিষ্ঠান নতুন করে রেড জোনে যুক্ত হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter