ফারমার্স ব্যাংকের কাছে পাওনা ১৮০ কোটি টাকা

ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পথে বন্দর

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠি

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিজান চৌধুরী

বারবার তাগিদ দেয়ার পরও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) স্থায়ী আমানতের ১৮০ কোটি টাকা দিতে পারছে না ফারমার্স ব্যাংক।

টাকা না পেয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়ে চবক সম্প্রতি ফারমার্স ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নৌ মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে।

চিঠিতে চবক তাদের আর্থিক ক্ষতির কথাও উল্লেখ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

চটগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান অর্থ ও হিসাব কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান চিঠিতে বলেছেন, ফারমার্স ব্যাংক বন্দর কর্তৃপক্ষের ১৮০ কোটি টাকা তাদের নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা করেনি। এটি চবকের বিনিয়োগের পরিপন্থী। ফলে ফারমার্স ব্যাংকের চট্টগ্রাম খাতুনগঞ্জ শাখায় রক্ষিত চবকের সব স্থায়ী আমানত (১৮০ কোটি টাকা) নগদায়নের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুরোধ করা হল।

জরুরি ভিত্তিতে এসব অর্থ নগদায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে। জানতে চাইলে ফারমার্স ব্যাংকের উপদেষ্টা প্রদীপ কুমার দত্ত যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠি প্রসঙ্গে আমার জানা নেই। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এছাড়া ৫টি সরকারি ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের মালিকানায় আসছে। ব্যাংকের বোর্ডে সরকারি ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও আছেন। সঠিক সিদ্ধান্তগুলো তারা দিচ্ছেন। জনগণের আস্থার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জনগণের অর্থ যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে সচেতন আছে সরকার।

এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১৩১তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বন্দরের পর্ষদ সদস্য (ফিন্যান্স) কামরুল আমিন বলেছিলেন, ফারমার্স ব্যাংকে সঞ্চিত তাদের স্থায়ী আমানতের টাকা তোলার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককেও অবহিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা রিকভারি করে দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

এ নিয়ে কথা হয় বন্দরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ফারমার্স ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের পরও সুফল আসেনি। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন খাত থেকে অর্জিত টাকা নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে জমা করা হয়। ফারমার্সের সুদহার ছিল আকর্ষণীয়। ফলে এই অর্থ ওই ব্যাংকেই জমা করা হয়েছিল।

চবক ১০টি এফডিআরের অনুকূলে খাতুনগঞ্জ শাখায় ১৮০ কোটি টাকা আমানত রাখে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ৫ কোটি টাকার এফডিআর মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। ৭ ডিসেম্বর এফডিআরটি নগদায়ন করতে চিঠি দেয়া হয়। ব্যাংক প্রথমে ১০ দিন এবং পরে আরও ৩০ দিন সময় চেয়ে আবেদন করে চবক। বন্দর কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি। পরে ৪ জানুয়ারি সুদসহ ৫ কোটি ৪২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা তিনটি পে-অর্ডার (পে-অর্ডার নম্বর-০১৩২১৬৬, ০১৩২১৬৭ ও ০১৩২১৬৮) বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রদান করে ব্যাংক। পরে সবগুলো পে-অর্ডারই ডিজঅনার হয়। ২২ জানুয়ারি ৩০ কোটি টাকার আরেকটি এফডিআর মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। সেই টাকাও নগদায়ন হয়নি। এ অবস্থায় মেয়াদোত্তীর্ণ ৩৫ কোটি টাকাসহ মোট ১৮০ কোটি টাকা দ্রুত নগদায়নের নির্দেশ দেয়া হলেও তাতে কাজ হয়নি।

জানা গেছে, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফারমার্স ব্যাংকের আমানতের সুদহার ছিল আকর্ষণীয়। এতে প্রলুব্ধ হয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৮০ কোটি টাকা জমা রাখে ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখায়। বন্দরের টাকা ছাড়াও জলবায়ু ফান্ডের ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা দিতে পারছে না ফারমার্স ব্যাংক। এর বাইরে তিতাস গ্যাস, রাজউক, ডেসা, ডেসকো, ওয়াসা ও ডিপিডিসিসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকটা জোর করেই ডিপোজিট নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

ফারমার্স ব্যাংকের তারল্য সংকট প্রসঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্যাংকটি নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। ব্যাংকের নীতি-নিয়ম পরিপালন না করে বেপরোয়াভাবে ঋণ প্রদান করে। অনুসরণ করা হয়নি ঋণ ও আমানতের অনুপাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও পালন করা হয়নি। ফলে ব্যাংকে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেয়, এখনও সেই সংকট চলছে।

২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নয়টি ব্যাংকের একটি দ্য ফারমার্স ব্যাংক। ৪০০ কোটি টাকা নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয় ব্যাংকটির। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ফারমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭২৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ছিল ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকার বেশি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ফারমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৭১ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫৫২ কোটি টাকা বা ৩২২ শতাংশ। কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আ’লীগের এমপি মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।