বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া

চূড়ান্ত হচ্ছে অভিন্ন রূপরেখা

একাধিক ইস্যুতে চলছে দরকষাকষি * আজ যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনের বৈঠক * বৃহত্তর ঐক্যই নির্বাচনী ঐক্যে রূপ নিতে পারে * আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার পরিচালনায় ঐকমত্য

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শেখ মামুনূর রশীদ ও হাবিবুর রহমান খান

দেশের চলমান রাজনৈতিক ইস্যুকে অন্তর্ভুক্ত করে বৃহত্তর ঐক্যের রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে এ রূপরেখায়।

সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী মাসেই রাজধানীতে সমাবেশের মাধ্যমে এ ঐক্যের ঘোষণা আসতে পারে। বিএনপি, গণফোরাম, তিন দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্টসহ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে দেখা যেতে পারে একই মঞ্চে। তবে এ ঐক্য প্রক্রিয়ায় রাখা হচ্ছে না স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে। বৃহত্তর ঐক্য চূড়ান্ত হলে জাতীয় ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলনে নামবে দলগুলো। পরে এ ঐক্য রূপ নিতে পারে নির্বাচনী ঐক্যে।

একসঙ্গে আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পারলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুরুত্ব পাবে অভিন্ন রূপরেখায়।

ইতিমধ্যে ইস্যুভিত্তিক দলীয় রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে সংশ্লিষ্ট দলগুলো। বিএনপির পক্ষ থেকে ১১টি ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি রূপরেখার খসড়া অন্যান্য দলের কাছে পাঠানো হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামও অভিন্ন রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে।

আজ রাতে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসভবনে অনুষ্ঠিতব্য এক বৈঠকে দু’পক্ষের মধ্যে এ রূপরেখা স্বাক্ষর হতে পারে। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে এর চেয়ারম্যান বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং গণফোরাম ও ঐক্য প্রক্রিয়ার সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ রূপরেখায় স্বাক্ষর করবেন।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় দেশ চলছে।

আইনের শাসন নেই, গণতন্ত্র নেই, কথা বলার স্বাধীনতা নেই। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। এ অবস্থার অবসান জরুরি। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে অবশ্যই এ অবস্থার অবসান ঘটবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের মালিক জনগণ। সেই জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া ক্ষমতা আবার জনগণকে ফিরিয়ে দিতে চাই।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই। আমরা ইতিমধ্যে সেই উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেছি। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।

সূত্র জানায়, দলীয়ভাবে ও ফ্রন্টের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত হওয়া রূপরেখার কয়েকটি ইস্যু নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির কয়েকটি ইস্যুর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে সংশ্লিষ্ট দলগুলো।

বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি, তারেক রহমানসহ অন্য নেতাদের মুক্তির বিষয়টি বৃহত্তর ঐক্যের রূপরেখায় রাখার পক্ষে নন তারা। তবে বিএনপির দাবি, খালেদা জিয়ার মুক্তি এখন দলীয় নয় জাতীয় ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। এছাড়া আরও একটি ইস্যুও সামনে চলে এসেছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো, নাকি সমগ্র রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন, সে ব্যাপারে তারা এখনও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি।

ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকা দলগুলো বলছে, বিএনপি চাইছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়টি প্রধান হোক। অন্যদিকে যুক্তফ্রন্ট, গণফোরামসহ অন্যরা চাইছে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে। তবে বিএনপি বলছে, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চাওয়ার সঙ্গে তাদের মতবিরোধ নেই। কেননা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সরাতে না পারলে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃহত্তর ঐক্যের রূপরেখায় যেসব বিষয় থাকছে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সব দলের অংশগ্রহণে আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচনের সময় সব ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে সাজানো। রূপরেখা অনুযায়ী এসব দাবি আদায়ে অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজপথে সক্রিয় থাকতে একমত পোষণ করেছে দলগুলো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ড. কামাল হোসেন যার যার অবস্থানে থেকে সরকারবিরোধী একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে এগিয়ে আসে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রবের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সরকারবিরোধী একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

সূত্র জানায়, আজকের বৈঠকে গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টের অভিন্ন এ রূপরেখায় চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার ব্যপারে গুরুত্ব পাবে। তবে আপাতত আন্দোলন, নির্বাচন এবং সরকার পরিচালনা- এ তিন ধাপে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের মধ্যে ন্যূনতম এবং অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দু’পক্ষ। পর্যায়ক্রমে এটি যাতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে রূপ নিতে পারে। জামায়াতে ইসলামী বাদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক সব রাজনৈতিক দল, জোট ও ব্যক্তি যাতে এ ঐক্যে সমবেত হতে পারে সেজন্য পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, রূপরেখায় আন্দোলন সম্পর্কে বলা হয়েছে- সব দলের অংশগ্রহণে আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচনের দাবিতে একসঙ্গে রাজপথে থাকবে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম। রূপরেখা অনুযায়ী এসব দাবি আদায়ে বৃহত্তরও ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা এবং অভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজপথে সক্রিয় থাকতে একমত পোষণ করেছে যুক্তফ্রন্ট এবং গণফোরাম। রূপরেখায় ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়েও দু’পক্ষ একমত পোষণ করেছে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে আসন সমাঝোতার কথা বলা হয়েছে। তবে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে নির্বাচন পরবর্তী সরকার পরিচালনার বিষয়ে। রূপরেখায় নির্বাচয়ে জয়ী হলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা, রাষ্ট্র ও সমাজে যে কোনো মূল্যে আইনের শাসন, সুশাসন, গণতন্ত্র এবং মানুষের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, অর্থ পাচার ও লুটপাট বন্ধ, পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনা, শেয়ারবাজার ও ব্যাংক লুটেরাদের চিহ্নিত করা, দুর্নীতিবাজদের বিচার করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে ন্যায়পাল নিয়োগ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়া স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।

বিচার বিভাগ, পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসনকে দল নিরপেক্ষ রাখা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ৫৭ ধারাসহ সব ধরনের কালাকানুন বাতিল করা হবে। মাদক নির্মূল, বেকারত্ব দূর করতে শিল্পায়নের উদ্যোগ, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিসহ বেশকিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার কথা বলা হয়েছে এ রূপরেখায়।

এদিকে বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে দলীয় রূপরেখা চূড়ান্ত করতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সিরিজ বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে ১১ ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে তারা একটি রূপরেখা প্রস্তুত করেন। ইসু্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, তার আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এছাড়া নির্বাচনের সময়ে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে নতুন মামলা ও গ্রেফতার অভিযান বন্ধসহ আরও বেশ কয়েকটি ইস্যুতে এ রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীকে এ ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। এখন সব দলের রূপ রেখাগুলো নিয়ে একসঙ্গে বসবেন নেতারা। সেখানে পর্যালোচনার পর অভিন্ন একটি রূপরেখা তৈরি হবে। এজন্য একাধিক বৈঠকের প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। বিএনপি, গণফোরামসহ অন্যরাও জাতীয় ঐক্য চায়। ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে এ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এ চিন্তাধারা থেকেই সবাইকে একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে। আশা করছি অচিরেই আমরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব।’