জাতিসংঘ বলছে গণহত্যা পরাশক্তিরা নীরব

  যুগান্তর ডেস্ক ২৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘ বলছে গণহত্যা পরাশক্তিরা নীরব
নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা নারীরা। ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে এই গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের জন্য অনুমোদন করেছে সংস্থা। মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দেশটির সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ শীর্ষ ছয়জন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত এবং বিচার হওয়া দরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘের এ রিপোর্টটি আগের রিপোর্টগুলোর চেয়ে অনেক শক্ত। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে সেটির জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু অপরাধীদের আদৌ বিচারের মুখোমুখি করা হবে কিনা সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। গণহত্যার অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি এখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো শক্তিধর পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্সের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তবে এ ব্যাপারে এখনও নীরব রয়েছে বিশ্বের এ পরাশক্তিগুলো।

মিয়ানমারের আর্মি জেনারেলদের বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিজে) পাঠানোর জন্য অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা। বিকল্প হিসেবে তদন্তকারীরা পরামর্শ দিয়েছেন, রুয়ান্ডা এবং সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধের বিচার যেভাবে হয়েছে সে রকম স্বাধীন একটি অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অনুমোদনের প্রয়োজন। কিন্তু পরিষদের বেশির ভাগ সদস্যই এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকায় রয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর নিজ নিজ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে।

দ্য গার্ডিয়ানের মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ, ব্যবসা ও বাণিজ্য স্বার্থ রয়েছে ভেটো শক্তিধর চীনের। এ কারণেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে শুরু থেকেই মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং। রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি শিগগিরই আন্তর্জাতিক আদালতে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে চীন আবারও ভেটো দিতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। চীনের মতো রাশিয়াও মিয়ানমারের পক্ষেই কথা বলে আসছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশ দুটির বক্তব্য অনেকটা একই রকম। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের চাপ বা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান তাদের।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে গত এক বছরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর কয়েকটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বড় আকারের মানবতাবিরোধী অপরাধ করা সত্ত্বেও ইয়েমেন, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের মতো মিয়ানমার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতো দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তেমন আগ্রহ দেখাননি ট্রাম্প। অন্যদিকে জাতিসংঘের কর্মপ্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থাকে শুরু থেকেই সমালোচনা করে আসছেন তিনি। চীন ও রাশিয়ার মতো আন্তর্জাতিক আদালতের সদস্য দেশ নয়ও যুক্তরাষ্ট্র। ফলে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিচার নিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা কি হবে তা সহজেই অনুমেয়।

আন্তর্জাতিক আদালতের অন্যতম প্রতিষ্ঠা দেশ যুক্তরাজ্য। রোহিঙ্গা ইস্যুতে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটাই তৎপরতা দেখিয়েছে দেশটি। রোহিঙ্গাদের প্রকৃত অবস্থা জানতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি রাখাইন সফর করেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন।

তবে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে তোলার ডাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছে দেশটি। যুক্তি হিসেবে দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় তুলতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মতির অভাব রয়েছে। অন্যদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক ভিত্তিহীন তদন্ত প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ব্রিটিশ প্রশাসন। তবে জাতিসংঘ রিপোর্টে সরকারের এই অবস্থান বদলাতে পারে বলে মনে করছে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষকরা। এমন প্রেক্ষিতে মিয়ানমারের কঠোর অ্যাকশন নিতে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকারকর্মী ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীরা।

অধিকার সংগঠন বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকের সংগঠক মার্ক ফার্মানার বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুটি গণহত্যার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্যই আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।’ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ব্যাপক তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। দেশটিকে এখন বিচারের আওতায় আনাই আন্তর্জাতিক আইনের জন্য বড় একটি পরীক্ষা। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের নেতৃস্থানীয় দেশগুলো ব্যর্থ হলে রোহিঙ্গা গণহত্যার অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যাবে। সেটা আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter