অগ্রগতি জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি

সুদহার কার্যকরে কঠোর নজরদারি

প্রকৃত চিত্র যাচাইয়ে পরিদর্শনের উদ্যোগ * ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার লঙ্ঘিত প্রমাণ হলে ব্যবস্থা

  হামিদ বিশ্বাস ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকরে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি বাস্তবায়নের প্রতিবেদন চেয়ে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া ঘোষিত সুদহার ব্যাংকগুলো মানছে কি-না তা যাচাইয়ে পরিদর্শনে নেমেছেন কর্মকর্তারা।

ঘোষণার আলোকে বেসরকারি খাতের প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক (পরিদর্শন বিভাগ-১) থেকে ১০টি টিম গঠন করে প্রাথমিকভাবে প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকে পরিদর্শক দল পাঠানো হচ্ছে।

শিগগিরই ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্যও পরিদর্শক দল পাঠানো হবে। পরিদর্শনে ঘোষিত সুদহার লঙ্ঘিত হয়েছে প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পরিদর্শনের কাজ চলছে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক গুরুত্বসহকারে দেখছে। কারণ ব্যাংকগুলো নিজেরা ঘোষণা দিয়ে তা আবার লঙ্ঘন করবে কেন? এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের নির্দেশনার আলোকে প্রাথমিকভাবে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোতে পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরিদর্শক দলের মূল লক্ষ্য ঋণে ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিট সুদ কার্যকর করছে কি-না তা যাচাই করা। আবার এক রকম ঘোষণা দিয়ে আরেক রকম সুদ নিচ্ছে কি-না তাও দেখা হচ্ছে।

এ জন্য শাখা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলছে পরিদর্শক দল। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঋণ যাচাই বা ক্রেডিট কমিটিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।

একই সঙ্গে আমানতে কী পরিমাণ সুদ দিচ্ছে তাও যাচাই করা হচ্ছে। কোনো ক্ষেত্রে ঋণের তুলনায় আমানতে বেশি সুদ ঘোষিত থাকলে ওই ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে তার কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে। সার্বিক বিষয় তুলে ধরে শিগগিরই গভর্নরের কাছে এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। সে আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরিদর্শন-সংশ্নিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ ব্যাংক এখনও সব ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ শুরু করেনি। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদের ঘোষণা হঠাৎ করে আসায় তা কার্যকরে সময় লাগছে।

কেননা মাঝে দুই অঙ্ক সুদে ৬ মাস, ৯ মাস, এক বছর বা এ রকম বিভিন্ন মেয়াদের আমানত নিয়েছে অনেক ব্যাংক। এসব আমানতের মেয়াদপূর্তি না হওয়ায় প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো এখনই সুদহার কমাতে পারছে না। তবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মুনাফার বিষয়টি বাজারভিত্তিক হওয়ায় রাতারাতি এসব ব্যাংকের সুদহার কমাতে কোনো বাধা নেই। এসব কারণে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো কিছুটা সময় নিয়ে এক অঙ্ক সুদে ঋণ বিতরণ কার্যকর করতে চাইছে। তা না করলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, গত ২০ জুন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) এক বৈঠকে ১ জুলাই থেকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয়া হয়। পরে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিরা আলাদাভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানান, অধিকাংশ ব্যাংক জুলাই থেকে উৎপাদনশীল খাতে এক অঙ্ক সুদে ঋণ বিতরণ শুরু করেছে।

তবে বাস্তবে অধিকাংশ ব্যাংক তা কার্যকর না করায় পরে ২ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানেও জানানো হয়, অধিকাংশ ব্যাংক উৎপাদনশীল খাতে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক জুলাইয়ে শিল্পের মেয়াদি ঋণে সুদ নিয়েছে ১২ দশমিক ২৫ থেকে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে। শিল্প খাতের চলতি মূলধন ঋণ বিতরণ করেছে ১৩ শতাংশ সুদে।

আর বাণিজ্যিক (ট্রেড ফাইন্যান্স) ঋণে ১৩ শতাংশ সুদ নিয়েছে। শুধু বেসিক ব্যাংক নয়, বিডিবিএল শিল্প ঋণ বিতরণ করেছে ১২ শতাংশ সুদে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর চিত্র এর চেয়ে আরও খারাপ।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, জুলাইয়ে ব্যাংক এশিয়া বড় ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি এবং চলতি মূলধন ঋণে সুদ নিয়েছে সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশ। এ ছাড়া বাণিজ্যিক (ট্রেড ফাইন্যান্স) ঋণে সুদ নিয়েছে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ। একইভাবে এবি ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণে সুদ নিয়েছে ৯ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। ব্র্যাক ব্যাংক শিল্পে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, ডাচ্-বাংলা ৯ থেকে ১২ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, ফারমার্স ব্যাংক ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ, আইসিবি ইসলামিক ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ, যমুনা ব্যাংক সাড়ে ১৩ শতাংশ, মিডল্যান্ড ব্যাংক ১১ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ নিয়েছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণে সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংক ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংক ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংক সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংক ১১ থেকে ১৪ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংক সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৫ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, পূবালী ব্যাংক সাড়ে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ, সাউথ বাংলা ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড বাণিজ্যিক ঋণে ৯ থেকে ১২ শতাংশ, সিটি ব্যাংক ১২.২৫ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংক সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশ ও উত্তরা ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ নিয়েছে। বিদেশি ৯টি ব্যাংকও শিল্প ও বাণিজ্যের কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই অঙ্কের সুদ নিয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter