কাকরাইলে মা-ছেলে হত্যা

চার্জশিটে আসামিদের আড়াল করার চেষ্টা!

নিহত শামসুন্নাহারের দুই ছেলের দাবি তদন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত * ২ মাসেও আদালতে গৃহীত হয়নি চার্জশিট

  সিরাজুল ইসলাম ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাকরাইলে মা-ছেলে হত্যা
কাকরাইরে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত মা শামসুন্নাহার ও সাজ্জাদুর করিম শাওন (ফাইল ছবি)

রাজধানীর কাকরাইলে মা-ছেলে হত্যার ঘটনায় যে চার্জশিট দেয়া হয়েছে তা ত্রুটিপূর্ণ। এতে আসামিদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত তিনজনের নামে চার্জশিট দেয়া হলেও পলাতক আসামিদের কারও নাম চার্জশিটে নেই।

এমনকি পলাতক আসামিদের চিহ্নিত করার কোনো চেষ্টাও করেনি পুলিশ। অথচ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর অজ্ঞাতনামা কয়েকজন আসামিকে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে।

ডিএনএ রিপোর্টেও ঘটনাস্থলে একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। নিহত শামসুন্নাহারের দুই ছেলে মশিউর করিম মুন্না ও আশিকুর রহমান অনিক এবং বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী মোস্তাফিজুর রহমান এসব অভিযোগ করেছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, মশিউর করিম মুন্না এবং আশিকুর রহমান অনিক ছাড়া শামসুন্নাহারের আর কোনো সন্তান নেই। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এজাহারে তাদের সাক্ষী করা হয়নি। যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই অপরিচত। সাক্ষী হিসেবে যাদের শামসুন্নাহারের বাড়ির ভাড়াটিয়া উল্লেখ করা হয়েছে তারা কখনও ওই বাড়িতে ভাড়া থাকেননি। এছাড়া চার্জশিটে আরও অনেক ত্রুটি রয়েছে। এসব কারণে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটের ওপর নরাজি আবেদনের প্রক্রিয়া চলছে।

ইতিমধ্যে আবেদনের একটি খসড়াও তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু মামলার বাদী (নিহত শামসুন্নাহারের ভাই আশরাফ আলী খোকন) নারাজি আবেদনে স্বাক্ষর করতে রাজি হচ্ছেন না। এ কারণে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে দাখিল করা যাচ্ছে না। তারপরও বিষয়টি নিয়ে এখন আদালতে শুনানি চলছে। শুনানি শেষ না হওয়ার কারণে দাখিলের ২ মাসেও চার্জশিট প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেননি আদালত। একই কারণে এখনও মামলাটির পুনর্তদন্তের নির্দেশও দেয়া হয়নি।

১ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাকরাইলের তমা সেন্টার গলির কাছে ৭৯/১ বাড়ির পাঁচ তলার ফ্ল্যাট থেকে মা শামসুন্নাহার ও চার তলার সিঁড়ি থেকে ছেলে সাজ্জাদুর করিম শাওনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ওই দিন রাতে শামসুন্নাহারের স্বামী আবদুল করিম, করিমের তৃতীয় স্ত্রী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী মুক্তা, বাসার কাজের বুয়া রাশিদা বেগম এবং বাড়ির দারোয়ান নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আটক করে রমনা থানায় নেয়া হয়।

পরদিন শামসুন্নাহারের ভাই আশরাফ আলী খোকন বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় শামসুন্নাহারের স্বামী আবদুল করিম, সতিন মুক্তা ও মুক্তার ভাই আল আমিন জনিকে আসামি করা হয়। পরে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জনি এবং মুক্তা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ৩০ জুন করিম, মুক্তা এবং জনির নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার পরিদর্শক (নিরস্ত্র) আলী হোসেন।

নিহত শামসুন্নাহারের ছেলে এবং শাওনের ভাই মুন্না ও অনিক যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, মামলার বাদীর (তাদের মামা আশরাফ আলী খোকন) সঙ্গে যোগসাজশ করে পুলিশ অজ্ঞাতনামা খুনিদের আড়াল করার চেষ্টা চালিয়েছে। মামলাটির অধিকতর তদন্ত হলে পুরো রহস্য বেরিয়ে আসবে। ধরা পড়বে পলাতক খুনিরাও।

মুন্না বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা আলী হোসেনের প্রতি আমাদের আস্থা নেই। আমরা দুই ভাইসহ অন্য স্বজনরা চাই সিআইডির মাধ্যমে মামলাটির পুনরায় তদন্ত হোক। কিন্তু বাদী আশরাফ আলী খোকন এর বিরোধিতা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘গ্রেফতারকৃত ২ আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আমার বাবা আবদুল করিম। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা আমার বাবার স্বীকারোক্তি নেয়ার কোনো চেষ্টা করেননি।’

মুন্না আরও বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আলী হোসেন একটি ত্র“টিপূর্ণ চার্জশিট প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছেন। লাশের ডিএনএ প্রতিবেদনে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলেও তদন্ত কর্মকর্তা তাদের শনাক্ত করার কোনো চেষ্টা করেননি। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য চার্জশিট তথা তদন্তের বিরুদ্ধে নারাজি দরখাস্ত দাখিল জরুরি। কিন্তু মামলার বাদী আশরাফ আলী খোকন অজ্ঞাত কারণে নারাজি দরখাস্ত দাখিলে উৎসাহ প্রকাশ করছেন না।’

নিহত শামসুন্নাহারের আরেক ছেলে অনিক বলেন, ‘এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি রহস্যজনক। এর তদন্ত হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছক অনুযায়ী।

ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের বরাত দিয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় একাধিক ব্যক্তি উপস্থিতি ছিলেন। কিন্তু চার্জশিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-আমিন জনি একাই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। চার্জশিটে পরিকল্পনাকারী হিসেবে আবদুল করিম এবং মুক্তাকে আসামি করা হয়েছে। চার্জশিটে যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের বাদী, নিহত শামসুন্নাহের ছেলেরা এমনকি নিকটাত্মীয়রা চেনেন না। মামলার তদন্ত চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তা বাদী, নিহত শামসুন্নাহারের ছেলে বা কোনো স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তাদের প্রতিবেদনের বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কাজের বুয়া রাশিদাকে রিমান্ডে নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যেত। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাকে রিমান্ডে নেয়নি।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নিহত শামসুন্নাহারের দুই ছেলে এবং অন্য স্বজনরা ঘটনার পুনর্তদন্ত চান। কিন্তু বাদী রাজি না থাকায় আদালত এখনও কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। মামলাটি যেন পুলিশের কোনো সংস্থা দিয়ে তদন্ত করানো হয়, সে বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরে আদালতে বক্তব্য দিয়েছি। ইতিমধ্যে ৩টি তারিখ পেরিয়ে গেছে। আদালত শামসুন্নাহারের দুই ছেলে এবং তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য শুনেছেন। সবশেষ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার। ওই দিন সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকারী কর্মকর্তা আতোয়ার হোসেনকেও ডেকেছিলেন আদালত। কিন্তু তিনি হাজির হননি।

তিনি আরও বলেন, ‘বাদী রাজি না থাকলেও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আদালত মামলা পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। আশা করা যাচ্ছে, পরবর্তী তারিখে এ সংক্রান্ত আদেশ পাওয়া যাবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রমনা থানার ওসি কাজী মাইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করে যা পেয়েছে সে অনুযায়ী আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। চার্জশিট দাখিলের পর পুলিশের কার্যত কোনো কাজ থাকে না। তারপরও আদালত যদি কোনো নির্দেশনা দেন পুলিশ সে অনুযায়ী কাজ করবে।’

অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী আশরাফ আলী খোকন বলেন, যে চার্জশিট দেয়া হয়েছে তাতে আমি সন্তুষ্ট। চার্জশিটের বিরদ্ধে নারাজি আবেদনে স্বাক্ষর করতে আমাকে আসামি করিমের দুই ছেলে, ভাই এবং স্বজনরা অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। কিন্তু আমি মরে গেলেও নারাজি আবেদনে সই করব না।’

বিষয়টি নিয়ে থানায় জিডি করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করিম হল এ হত্যাকাণ্ডের হুকুমের আসামি। সম্পত্তির লোভে তার দুই ছেলে ও স্বজনরা করিমকে জেলখানা থেকে বের করে আনতে চায়। আমি চাই, করিমের ফাঁসি হোক। কিন্তু পুনরায় তদন্তের নামে কিছু খুচরা আসামিকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে তারা করিমকে বাঁচাতে চায়।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যেহেতু মূল আসামিদের নামে চার্জশিট দেয়া হয়েছে, তাই আমি খুচরা আসামিদের (হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া অজ্ঞাত ব্যক্তিরা) খুঁজতে চাই না।’

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter