দক্ষিণে জোট-মহাজোট

প্রার্থী নিয়ে টেনশনে নেতাকর্মীরা

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো

ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতার মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণের ১২টি নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এসব এলাকায় দুই জোটের প্রায় সব শরিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে তা নিয়ে নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন (টেনশন) হয়ে পড়েছেন। অবশ্য এসবের ধার না ধেরে তারা যে যার মতো প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তাদের বিশ্বাস আসনগুলোতে নিজের দলই শেষ পর্যন্ত প্রার্থী দেবে।

বরিশাল অঞ্চলের ২১টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে বর্তমানে ১৬টিতে আওয়ামী লীগ, তিনটিতে জাতীয় পার্টি, একটিতে ওয়ার্কার্স পার্টি ও একটিতে জেপির (মঞ্জু) এমপি রয়েছেন। এই চিত্র ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে মহাজোটের আসন ভাগাভাগি সমীকরণের। এক্ষেত্রে খানিকটা ব্যত্যয়ও রয়েছে। শুরুতে জাতীয় পার্টির আসন ছিল দুটি।

কিছুদিন আগে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের স্বতন্ত্র এমপি ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়ায় জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা বেড়ে তিনটি হয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টিকে কোনো আসন দেয়া না হলেও বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপুকে হারিয়ে এমপি হয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ টিপু সুলতান। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও রয়েছে আসন ভাগাভাগির ইতিহাস।

২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বা তার আগে এখানে মোটামুটি দুটি আসন জামায়াতে ইসলামী ও বিজেপিকে (নাজিউর) ছেড়ে দিত বিএনপি। ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ছেড়েছে বিএনপি।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে দুই জোটের কাছ থেকে শরিক দলগুলো অন্তত পাঁচটি আসন বেশি চাইবে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেই টার্গেটে মাঠ পর্যায়ে পুরোদমে কাজ শুরুও করেছেন দলগুলোর নেতাকর্মীরা। এ রকম হিসেবে দক্ষিণের ২১ আসনের মধ্যে অন্তত ১২টিতে ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

১২টি আসনের মধ্যে দু-একটি আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই জটিলতার মুখে পড়তে পারে। যেমন- পিরোজপুর-১ ও পিরোজপুর-২ আসন। এই দুই আসনে বিএনপি জোট থেকে চাইবে জামায়াত; ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ জোট থেকে চাইবে জাতীয় পার্টি ও জেপি (মঞ্জু)।

এসব আসনে নির্বাচন করার কথা শোনা যাচ্ছে কারান্তরীণ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দুই ছেলে জিয়ানগরের উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুম সাঈদী ও শামীম সাঈদীর নাম। আওয়ামী লীগের কাছে পিরোজপুর-২ আসনের বর্তমান এমপি পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পাওয়া জাতীয় পার্টি নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার মনোনয়ন চাইবেন। পিরোজপুর-৩ আসনটিও আওয়ামী লীগের কাছে চাইবে জাতীয় পার্টি ও জাসদ (আম্বিয়া-প্রধান)।

বর্তমান এমপি রুস্তুম আলী ফরাজী জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে যেমন মনোনয়ন নিশ্চিত করতে চাইছেন; তেমনি একই আশায় মাঠে আছেন জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা করিম সিকদার। বিষয়টি সম্পর্কে আলাপকালে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পিরোজপুর-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রার্থী মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, যার কথা বলা হচ্ছে (রুস্তুম আলী) তিনি এক সময় বিএনপির এমপি ছিলেন।

মনোনয়ন টার্গেটে এখানে-ওখানে ছোটাছুটি করা মানুষটির রাজনৈতিক আদর্শ কি বোঝা মুশকিল। ঐতিহাসিকভাবে এটি আওয়ামী লীগের আসন। আমার বিশ্বাস জননেত্রী শেখ হাসিনা সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবেন।

বরিশাল ও পটুয়াখালীতে মহাজোটের কাছে তিনটি আসন চাইতে পারে শরিকরা। এগুলো হল- বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া), বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)। বরিশাল-২ এ বর্তমান এমপি ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ টিপু সুলতান। আগে এখানে এমপি ছিলেন জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু।

জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট বাঁধা কিংবা মহাজোট গঠন পুরো সময়টিতেই এখানে ছাড় দিয়ে এসেছে আওয়ামী লীগ। যদিও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে উল্টে যায় সব। মহাজোট থেকে মনোনয়ন পেলেও টিপুর কাছে হেরে যান গোলাম কিবরিয়া। এবার জাতীয় পার্টির পাশাপাশি ওয়ার্কার্স পার্টিও প্রস্তুতি নিচ্ছে মহাজোটের কাছ থেকে আসনটি বাগিয়ে নেয়ার।

বর্তমান এমপি টিপুর পাশাপাশি যুব মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ঢাকাস্থ বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মনোনয়নের আশায় বছরের পর বছর ধরে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আতিকুর রহমান বলেন, এখানে বর্তমান এমপি আমাদের দলের। প্রতিদ্বন্দ্বিতার কঠিন লড়াইয়ে লড়ে জিতেছি আমরা। তাই সহজ হিসাব, আসনটি আমাদের। আর সেজন্যই মাঠে কাজ করছি।

বরিশাল-২ আসনে মনোনয়নের আশায় মাঠে আছেন জাসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বাদল, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনিচুজ্জামান আনিচ এবং ওয়ার্কার্স পার্টির রফিকুল ইসলাম সুজন।

মহাজোটের অংশীদার হিসেবে আসন দাবি বিষয়ে জানতে চাইলে আনিচুজ্জামান বলেন, এখানে আমাদের অবস্থান অনেক শক্ত। এ কারণে এটি আমরা চাইছি। জাসদ নেতার এই বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বানারীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা বলেন, চাইতে তো কোনো বাধা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল যৌক্তিকতার। এখানে বারবার জিতেছে আওয়ামী লীগ। ঐতিহাসিকভাবে আসনটি নৌকার। সেই নৌকা সরিয়ে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে এমনটা আশা করার কোনো কারণ নেই।

পটুয়াখালী-১ ও বরিশাল-৬ আসনে বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার ও দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার নাসরিন জাহান রত্না আমীন। এবারও জোট থেকে তাদের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তেমন সংশয় না থাকলেও দুটি আসনেই মনোনয়নের আশায় মাঠে আছেন আওয়ামী লীগের প্রায় এক ডজন নেতা।

গণসংযোগের পাশাপাশি মনোনয়নের জন্য লবিং তদবিরও করছেন তারা। বরিশাল-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল হক মঞ্জু বলেন, দলীয় কর্মসূচিতে যখনই তৃণমূলে যাই তখনই হতাশার কথা শুনি। এখানে আমাদের দল থেকে বহুবার এমপি হলেও প্রায় ১০ বছর ধরে আমাদের এমপি নেই। ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মঞ্জু আরও বলেন, আশা করি জননেত্রী এই বিষয় খেয়াল করবেন।

প্রায় একই সুরে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী পটুয়াখালী সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান আহম্মেদ মৃধা বলেন, আমরা চাই পটুয়াখালী সদর আসনটি এবার নৌকার ঘরে আসুক। এটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এমপি না থাকায় দলের নেতাকর্মীরা কেবল হতাশই নয়, অসন্তুষ্টও হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অধ্যাপক মহসীন উল ইসলাম হাবুল বলেন, কেবল মহাসচিব ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার পদে থাকাই নয়, নির্বাচনী এলাকা বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে ব্যাপক জনপ্রিয় তারা।

মহাজোটে থাকায় যে তারা মনোনয়ন পাবেন তা নয়, নিজেদের জনসমর্থন আর যোগ্যতার কারণেই তারা যে কোনো পরিস্থিতিতে বিজয়ী হবেন। দলের কাছে আওয়ামী লীগ নেতারা মনোনয়ন চাইতেই পারেন। কিন্তু একক কিংবা মহাজোট, যেভাবেই নির্বাচনে যাওয়া হোক না কেন, আমাদের এই দুই নেতা ওই দুই আসনে প্রার্থী হবেন। জাতীয় পার্টি মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার একাধিক আসনেও প্রার্থী হতে পারেন। তাই এ নিয়ে আলাদা কোনো চিন্তাভাবনার সুযোগ নেই।