জালিয়াতি রোধে ব্যাংকের বড় শাখাগুলোতে তদন্ত হবে

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দেলোয়ার হুসেন

ফাইল ছবি

জাল-জালিয়াতি রোধে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের বড় শাখাগুলো তদন্তের আওতায় আনা হবে। প্রতি বছর ওইসব শাখায় তদন্ত করা হবে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটির এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সার্বিক ঝুঁকি মোকাবেলা করতেই মূলত এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সার্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রক ও নীতি বাস্তবায়ন বিভাগগুলোর সংশ্লিষ্ট টিম সর্বোচ্চ সমন্বয় রক্ষা করে ব্যাংকিং সুপারভিশন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এই শাখাগুলোর ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যেসব শাখায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বেশি ওইসব শাখাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতে হবে। এর মধ্যে সব ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখা, কর্পোরেট শাখা ও স্থানীয় কার্যালয় শাখাকেই বড় শাখা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। এর বাইরে বাণিজ্যিকভাবে যেসব শাখা গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোকেও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের যেসব জাল-জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে, তার সবগুলোই হচ্ছে বড় শাখাগুলোতে। এই শাখাগুলোতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে জাল-জালিয়াতির প্রবণতা অনেক কমে আসবে। কেননা বড় শাখাগুলো থেকেই বড় অঙ্কের ঋণ বেশি দেয়া হয়। আর বড় অঙ্কের ঋণেই বেশি জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। ছোট শাখাগুলোতে তুলনামূলকভাবে ঋণের পরিমাণ কম। এগুলো থেকে আমানত সংগ্রহ হয় বেশি। এ কারণে ছোট শাখাগুলোতে জালিয়াতির প্রবণতাও কম।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি ব্যাংকের গড়ে ৮০ শতাংশ ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শনের আওতায় নিয়ে আসে। এটি করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বড় শাখাগুলো তদন্তের আওতায় আসে। এই বিবেচনা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় শাখাগুলোকে নিয়মিত তদন্তের আওতায় এনে থাকে।

সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এখন পর্যন্ত যেসব বড় জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে তার সবগুলোই হয়েছে বড় বড় শাখায়। এর মধ্যে হলমার্ক কেলেঙ্কারি ঘটেছে একটি সরকারি ব্যাংকের শেরাটন শাখায়। ওই শাখাকে ব্যবহার করে হলমার্ক ২৬টি ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতি ঘটেছে ৫টি ব্যাংকের বড় শাখায়। ওইসব শাখা থেকে তারা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পুরো অর্থই বিদেশে পাচার করেছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের জনতা ভবন কর্পোরেট শাখা, মগবাজার শাখা ও এলিফেন্ট রোড শাখা থেকে ৫২৭ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৩২৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৬১ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ১৫৪ কোটি টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ইস্কাটন শাখা থেকে ১১০ কোটি টাকা অর্থ আত্মসাৎ করে। ক্রিসেন্ট গ্রুপ জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ ও স্থানীয় কার্যালয় শাখা থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। আরও একটি সরকারি ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ও লালদীঘির পাড় শাখা থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে।

ওই ব্যাংকের ঢাকার রমনা শাখায়ও ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকের জালিয়াতির বড় অংশই ঘটেছে তাদের বড় কর্পোরেট শাখাগুলোতে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, জাল-জালিয়াতির যেসব ঘটনা ঘটে, তার সবই হয় গুটিকয়েক বড় শাখায়। এর মধ্যে স্থানীয় কার্যালয়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের কর্পোরেট শাখা ও বৈদেশিক বাণিজ্য শাখাগুলো নিবিড় তদারকিতে আনলেই এসব ঘটনা ধরা পড়ে।

আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা গোপন সূত্রে জাল-জালিয়াতির তথ্য আগাম পেয়েও থাকেন। সেগুলো আমলে নিয়ে তদন্ত করলেই সব বেরিয়ে আসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়ন করলে একদিকে জালিয়াতি করার সাহস পাবে না কেউ। আবার করলেও শুরুতেই ধরা পড়বে। কেননা কোনো জালিয়াতিই একদিনে বা এক মাসে কিংবা এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন হয় না। এটি চূড়ান্ত রূপ দিতে ২ থেকে ৩ বছর লেগে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন থেকে আরও বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের শ্রেণীকরণ সঠিকভাবে করা হচ্ছে কিনা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব নিরূপণ, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও অসততার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত বিধিবিধান সুনির্দিষ্টভাবে প্রণয়ন করতে হবে। এর প্রয়োগের বিষয়টিও তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দেয়া হয়।

যেসব ব্যাংকের পর্ষদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক আছে, সেসব ব্যাংকের ঝুঁকি বা অনিয়মের বিষয়ে পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষকদের ব্যাংকের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করবেন।

এর আলোকে পর্যবেক্ষকরা ব্যাংকের পর্ষদে আলোচনা করবেন। পর্ষদ সদস্য এসব আলোচনা আমলে না নিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এ বিষয়ে জানানোর কথা বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যংকের প্রতিবেদনে।