রংপুর মেটালের ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি

তথ্য গোপন করল প্রাণ-আরএফএল

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রায় ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। কাঁচামাল আমদানির তথ্য গোপন করাসহ অনুমোদন ছাড়া রফতানি দেখিয়ে ও অবৈধভাবে রেয়াত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে।

গত বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনস্থ সিলেট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের নিরীক্ষায় এ চাঞ্চল্যকর ভ্যাট ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এভাবে প্রাণ-আরএফআল গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এজন্য গ্রুপটির প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের এ সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনাসহ অধিকতর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

জানা গেছে, হবিগঞ্জের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে রয়েছে গ্রুপটির রংপুর মেটালের কারখানা। এখানে দুটি ইউনিটে বাইসাইকেল, টায়ার, রিম, স্পোক, ক্যাবলওয়্যার, এমএস পাইপ, জিআই পাইপ ও টিউব তৈরি করা হয়। এর মধ্যে একটি ইউনিটের বন্ড লাইসেন্স নেয়া আছে। অন্য ইউনিটের বন্ড লাইসেন্স নেই। অথচ দুটি ইউনিট পণ্য উৎপাদনে একই কাঁচামাল ব্যবহার করে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ইউনিট দুটোর আলাদা ব্যবসা নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন) থাকলেও আয়কর অফিসে ইউনিট দুটোর টিআইএন একটিই, যা কোনোভাবে হওয়ার সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনকারী দুটি ইউনিট পাশাপাশি হওয়ায় রাজস্ব ফাঁকির যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির মাধ্যমে তা দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করা সম্ভব। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে। এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদেরও রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটনে বেগ পেতে হবে। এভাবে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে এনবিআরের প্রতিবেদনে। সেখানে বন্ডেড প্রতিষ্ঠান ও লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান আলাদা জায়গায় স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা যায়, নিরীক্ষার জন্য তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে রংপুর মেটালকে ৯ বার চিঠি দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত দলকে কোনো সহযোগিতা করেনি। পরে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (কাস্টমসের ডাটাবেজ সফটওয়্যার) হতে আমদানি তথ্য, কর অঞ্চল-৬ চিঠির মাধ্যমে বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ও আয়কর রিটার্ন থেকে তথ্যের মাধ্যমে নিরীক্ষা করা হয়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রংপুর মেটালের ইউনিট-৩ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকার ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২২৯ কোটি ২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে। এ দুই অর্থবছরে ২৪২ কোটি ২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি দেখিয়ে মূসক-১৯ চালানের মাধ্যমে ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার ভ্যাট দেয়। কিন্তু নিরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল আমদানির তথ্য গোপন করে, রফতানির অনুমোদন ছাড়া রফতানি দেখিয়ে ও অবৈধভাবে রেয়াত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। যেমন ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি দেখানো হয়। কিন্তু অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি মূল্য প্রায় ২১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা কমিয়ে দেখিয়েছে। এই মূল্যের কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদনের পর তা বিক্রি করা হয়।

এভাবে কত টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হয়েছে, তার একটি হিসাব করে নিরীক্ষা দল। উৎপাদন পর্যায়ে ২৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন ধরে হিসাব করে দেখা যায়, প্রায় ২৭ কোটি ৪ লাখ টাকার উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়নি। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। একই কায়দায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা অবৈধ রেয়াত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

রংপুর মেটালের ইউনিট-৩ সাপ্লায়ার ও আমদানিকারক হিসেবে ভ্যাট অফিসে নিবন্ধিত আছে। কিন্তু তারপরও রফতানি অনুমোদন ছাড়া বন্ডেড প্রতিষ্ঠান ইউনিট-২ এর কাছে শূন্য হারে পণ্য সরবরাহ করে ৪ কোটি ২১ লাখ ৩২৬ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেয়। এভাবে সব মিলিয়ে ইউনিট-৩ মোট ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

অন্যদিকে ইউনিট-২ নিরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি সাপ্লায়ার, আমদানি-রফতানিকারক হিসেবে নিবন্ধিত। ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ডের কার্যক্রম শুরু করে। এ ইউনিটের দলিলাদি ২০১২-১৩ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত নিরীক্ষা করা হয়।

নিরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯৮১ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। এর বিপরীতে ভ্যাট দিয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ইউনিট-৩ এর মতোই কাঁচামাল আমদানির তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩১ লাখ ৮৭ হাজার, ২০১৪-১৫-তে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে।

ইউনিট-২ প্রতিষ্ঠানটি আমদানি পর্যায়ে মূসক-৭ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনকারী হিসেবে এটিভি (অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট) সুবিধা গ্রহণ করেছে। কিন্তু আমদানি পণ্যের পরিবর্তন ছাড়াই স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ করে। পণ্য আমদানি মূল্যভিত্তিক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ২৬টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে আমদানি পণ্য বিক্রি করায় প্রকৃত রাজস্ব পরিশোধের চেয়ে কম রাজস্ব পরিশোধ করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ২১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৯ টাকা।

এছাড়া বন্ডের আওতায় উৎপাদিত পণ্যের বিপরীতে আমদানি-রফতানি এবং অপচয় দলিলাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডেডো (শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদফতর) অনুমোদিত অপচয়ের হারের মোট মূল্য ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর ওপর ১৫% হারে মূসকের পরিমাণ ২২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা যা প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া ইউনিট-২ ইউনিট-৩ এর কাছ থেকে চালানপত্রের (মূসক-১১) মাধ্যমে কাঁচামাল ক্রয় করে। কিন্তু ইউনিট-৩ এর কোনো প্রকার রফতানি অনুমোদন নেই। রফতানি অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ইউনিট-২ কাঁচামাল কিনে ৪ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

এর বাইরে ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পণ্য বা সেবা ক্রয়ের বিপরীতে কোনো ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এতে প্রায় উৎসে মূসক ১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সুদসহ মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৪ টাকা। সব মিলিয়ে ইউনিট-২ বিভিন্ন খাত সুদসহ ৩১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

অর্থাৎ রংপুর মেটালের ইউনিট-৩ ও ইউনিট-২ যথাক্রমে ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ও ৩১ কোটি ২৪ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। সব মিলিয়ে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এ ফাঁকি দেয়া ভ্যাট পরিশোধে তাগাদা দেয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের আপিল ট্রাইব্যুনালে যায়। বর্তমানে সেখানে মামলাটি বিচারাধীন আছে।

এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য দিতে রাজি হননি।